অতিথি পাখিদের পাহারায় বিষখালীবাসী

দূর-দূরান্ত থেকে আসা শীতকালীন অতিথি পাখির কিচিরমিচিরে মুখর হয়ে ওঠে নদীতীরের বিস্তীর্ণ এলাকা। বিষখালীর পশ্চিম পাড়ের গাবখান ধানসিঁড়ি ইউনিয়নের ভাটারাকান্দা এবং পোনাবালিয়া ইউনিয়নের দিয়াকূল গ্রামের নদীতীরবর্তী চর ও হোগল বনে এসব পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল গড়ে উঠেছে। সকাল আর পড়ন্ত বিকেলে দল বেঁধে উড়ে বেড়ানোর দৃশ্য যেন প্রকৃতির ক্যানভাসে আঁকা চলমান চিত্র, যা মুগ্ধ করছে এলাকাবাসী ও আগন্তুক পর্যটকদের।

Printed Edition

আতিকুর রহমান ঝালকাঠি

ঝালকাঠির বিষখালী নদীর মোহনায় শীত এলেই নেমে আসে এক অনন্য প্রাকৃতিক উৎসব। দূর-দূরান্ত থেকে আসা শীতকালীন অতিথি পাখির কিচিরমিচিরে মুখর হয়ে ওঠে নদীতীরের বিস্তীর্ণ এলাকা। বিষখালীর পশ্চিম পাড়ের গাবখান ধানসিঁড়ি ইউনিয়নের ভাটারাকান্দা এবং পোনাবালিয়া ইউনিয়নের দিয়াকূল গ্রামের নদীতীরবর্তী চর ও হোগল বনে এসব পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল গড়ে উঠেছে। সকাল আর পড়ন্ত বিকেলে দল বেঁধে উড়ে বেড়ানোর দৃশ্য যেন প্রকৃতির ক্যানভাসে আঁকা চলমান চিত্র, যা মুগ্ধ করছে এলাকাবাসী ও আগন্তুক পর্যটকদের।

ঝালকাঠি সদর উপজেলার বুক চিরে বয়ে গেছে সুগন্ধা, বিষখালী, গাবখান, বাসন্ডা ও ধানসিঁড়ি নদী। এসব নদীর মোহনার পশ্চিম দিকে গাবখান ধানসিঁড়ি ইউনিয়ন, দক্ষিণ-পূর্বে পোনাবালিয়া ইউনিয়ন এবং উত্তর-পূর্বে ঝালকাঠি পৌর এলাকা। নদী, চর আর জলাভূমির এই প্রাকৃতিক পরিবেশ অতিথি পাখিদের জন্য আদর্শ আশ্রয় হিসেবে কাজ করছে।

প্রকৃতি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি বছর শীত মৌসুমে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বাংলাদেশে আসে। আমাদের দেশে আবাসিক ও অতিথি মিলিয়ে প্রায় ৬৫০ প্রজাতির পাখি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৬০ প্রজাতি আবাসিক এবং বাকি ৩০০ প্রজাতি অতিথি পাখি। এসব অতিথি পাখির মধ্যে প্রায় ২৯০ প্রজাতি শীত মৌসুমে আসে, আর অল্প কয়েকটি প্রজাতি সারা বছর অবস্থান করে। নদীতীরের কলকল ধ্বনি আর পাখির কলকাকলি মিলেমিশে প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়িয়ে তোলে বহু গুণ।

পাখিপ্রেমী ও ব্যবসায়ী শামসুল হক মনু বলেন, শীত এলেই নদী, খাল, বিল ও জলাশয়ের ধারে চোখে পড়ে নানা রঙের নাম জানা-অজানা পাখি। অথচ দুঃখজনকভাবে এখনো বেআইনিভাবে এসব অতিথি পাখি শিকার করা হয়। তার মতে, অতিথি পাখি আমাদের বন্ধু ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বন উজাড়, জলাভূমি ধ্বংস, অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে পাখিদের নিরাপদ আশ্রয় দিন দিন সঙ্কুচিত হয়ে যাচ্ছে।

বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী পরিযায়ী পাখি শিকার করলে সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। একইভাবে পাখির গোশত বা দেহাংশ সংরক্ষণ, বিক্রি কিংবা পরিবহন করাও দণ্ডনীয় অপরাধ। আইন থাকা সত্ত্বেও এক শ্রেণীর পেশাদার শিকারি সুযোগের ফাঁক গলে অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।

তবে আশার কথা, বিষখালী নদীতীরের মানুষ এখন পাখি রক্ষায় সচেতন। সাচিলাপুর এলাকার লিটু গোমস্তা, রবিন ও আফছার জানান, প্রতি বছর শীতে এখানে পাখির আগমন ঘটে। হোগল বনের ভেতর তারা নিরাপদে থাকে। আগে শিকারিরা বন্দুক নিয়ে আসত, এখন এলাকাবাসীর প্রতিরোধে তারা আর আসে না। দল বেঁধে পাখিদের উড়ান কখনো ‘লাভ’, কখনো ‘লকেট’ কিংবা ‘বিমান’ আকৃতি নেয়, যা সত্যিই শৈল্পিক।

বরিশাল সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোসাম্মাৎ জেবুন্নেছা বলেন, পাখির আবাসস্থল সঙ্কট, শিকার ও বিষটোপ ব্যবহারের কারণে অতিথি পাখির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা জরুরি। ঝালকাঠি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেগুফতা মেহনাজ বলেন, অতিথি পাখি আমাদের পরিবেশের অমূল্য সম্পদ। কেউ বিরক্ত করলে বা শিকার করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। মানুষের সচেতন পাহারাই পারে বিষখালীর এই ডানা মেলা উৎসবকে বাঁচিয়ে রাখতে।