স্থিতির আড়ালে বিদেশী দায়ের চাপ বাড়ছে

২০২৫ শেষে বৈদেশিক ঋণ

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

বাংলাদেশের অর্থনীতি গত এক দশকে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও আমদানি-নির্ভর প্রবৃদ্ধির ওপর দাঁড়িয়ে এগিয়েছে। এই যাত্রায় বৈদেশিক ঋণ একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। কিন্তু ২০২৫ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়থঋণ শুধু প্রবৃদ্ধির জ্বালানি নয় বরং ভবিষ্যতের ঝুঁকির ইঙ্গিতও বহন করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণ দাঁড়িয়েছে ১১৩.৫২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশের অর্থনীতিকে এক নতুন বাস্তবতায় নিয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ঋণের পরিমাণ নয় বরং ঋণের গুণগত মান, ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ পরিশোধ সক্ষমতা নিশ্চিত করা।

ধীর বৃদ্ধি, কিন্তু গভীর বার্তা

২০২৫ সালের চারটি সময়বিন্দুর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় : মার্চে মোট বৈদেশিক ঋণ ছিল-১০৫.৮১ বিলিয়ন ডলার, জুনে দাঁড়ায় ১১৩.৫৮ বিলিয়ন ডলারে, সেপ্টেম্বরে তা কমে আসে ১১২.২১ বিলিয়ন ডলারে, ডিসেম্বরে সামান্য বেড়ে দাঁড়ায় ১১৩.৫২ বিলিয়ন ডলারে। বিশ্লেষণে দেখা যায়- বছরের মাঝামাঝি সময়ে দ্রুত বিদেশী ঋণ বৃদ্ধি পায়, পরবর্তী সময়ে স্থিতিশীলতা আসে। তবে ঋণের স্তর উচ্চেই রয়ে গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে পরিস্থিতির মূল বার্তা হলো- ঋণের গতি কমেছে, কিন্তু চাপ কমেনি।

সরকারের কাঁধে সবচেয়ে বড় দায়

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে সরকারের কাঁধে বিদেশী ঋণের সবচেয়ে বড় দায়। ডিসেম্বর ’২৫ নাগাদ পাবলিক সেক্টর ঋণ ছিল ৯৩.৪৬ বিলিয়ন ডলার যা মোট ঋণের প্রায় ৮২%। এর মধ্যে সাধারণ সরকারি ঋণ হলো ৮০.৯৪ বিলিয়ন ডলার আর অন্যান্য সরকারি করপোরেশনের ঋণ ১২.৫২ বিলিয়ন ডলার।

সরকারি ঋণের বড় অংশ দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় তাৎক্ষণিক চাপ কম। তবে- ভবিষ্যতে সুদ ও কিস্তি পরিশোধ বাড়বে এবং বাজেট ঘাটতির ওপর চাপ সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ, আজকের স্বস্তি আগামী দিনের দায়ে পরিণত হতে পারে।

বেসরকারি খাত- নীরব রূপান্তর

বেসরকারি খাতে ঋণের অঙ্ক ছোট, কিন্তু সংকেত শক্তিশালী। এখানে মোট ঋণ ২০.০৬ বিলিয়ন ডলার যা মোট ঋণের-১৮%। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ঋণ রয়েছে ১০.১৮ বিলিয়ন ডলার এবং দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ৯.৮৭ বিলিয়ন ডলার। এখানে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো- ট্রেড ক্রেডিট কমছে; সরবরাহকারীর ঋণ বড়ভাবে কমেছে; স্বল্পমেয়াদি ঋণ বাড়ছে আর অফশোর ব্যাঙ্কিং ইউনিট (ওবিইউ) ঋণনির্ভরতা বাড়ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রাইভেট সেক্টর এখন “সহজলভ্য কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ” অর্থায়নের দিকে ঝুঁকছে।

ঋণের উৎস- কারা দিচ্ছে অর্থ?

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে দেখা যায়, দীর্ঘমেয়াদি ঋণ মোটের ৮৭.৬২%। এর প্রধান উৎস বহুপক্ষীয় (বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক) ৪১.৩৯%, দ্বিপক্ষীয় (চীন, জাপান ও ভারত) ২৮.৮২%, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ৫.৩৩% এবং বাণিজ্যিক ঋণ ৯.৭৯%।

সাধারণভাবে বহুপক্ষীয় ঋণে সুদ কম এবং পরিশোধে দীর্ঘ সময় থাকে। আর বাণিজ্যিক ঋণে উচ্চ সুদ ও বেশি ঝুঁকি থাকে। বাস্তবতা হলো- বাংলাদেশ ধীরে ধীরে “সহজ ঋণ” থেকে “বাজারভিত্তিক ঋণ”-এর দিকে যাচ্ছে।

স্বল্পমেয়াদি ঋণের চাপ এখন বাড়ছে। ডিসেম্বর’২৫ নাগাদ দাঁড়িয়েছে ১৪.০৬ বিলিয়ন ডলার যা মোট ঋণের ১২.৩৮% । এটি গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে এ ঋণ দ্রুত পরিশোধ করতে হয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ সৃষ্টি করে এবং আমদানি সঙ্কটে ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে স্বল্প মেয়াদি ঋণ বাড়ছে আর ট্রেড ঋণ কমছে- মানে হলো অর্থনীতির তারল্য ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা বাড়ছে।

কাঠামোগত ঝুঁকির বিশ্লেষণ

বিদেশী ঋণের প্রবণতা অনুসারে বাণিজ্যিক ঋণ বৃদ্ধি মানে উচ্চ সুদে ঋণ নেয়ার প্রবণতা বাড়ছে। আর ওবিইউ নির্ভরতায় বিশেষত অফশোর উৎসের ওপর নির্ভরতা অর্থনীতিকে অস্থির করে তুলে।

ঋণের গুণগত পরিবর্তন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ব্যবসার ঋণ কমে গিয়ে সাধারণ ঋণ বাড়া মানে ঝুঁকি বৃদ্ধি পাওয়া। এ ছাড়া স্বল্পমেয়াদি দায় বাড়লে রিজার্ভ দ্রুত কমতে পারে।

এতকিছুর পরও আশার জায়গা হলো- সার্বিত দায়ে এখনো দীর্ঘমেয়াদি ঋণের আধিক্য রয়েছে, বহুপক্ষীয় উৎসের শক্ত অবস্থান বজায় রয়েছে, ঋণ বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রিত রয়েছে এবং সরকারি খাতে পরিকল্পিত ঋণ ব্যবস্থাপনা রয়েছে।

ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও নীতিগত করণীয়

বাংলাদেশের সামনে এখন তিনটি বড় প্রশ্ন- প্রথমত, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা অর্থাৎ রফতানি আয় ও রেমিট্যান্স কি যথেষ্ট বাড়বে কিনা? দ্বিতীয়ত স্বল্পমেয়াদি ঋণ কি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে চাপে ফেলবে কিনা? তৃতীয়ত ঋণের গুণগত মান কেমন অর্থাৎ সস্তা ঋণ থেকে ব্যয়বহুল ঋণে রূপান্তর কতটা টেকসই হচ্ছে?

বিশেষজ্ঞদের মতে বিদ্যমান অবস্থায় কিছু নীতিগত করণীয় রয়েছে। এর মধ্যে রফতানি বৈচিত্র্য বৃদ্ধি তথা গার্মেন্ট নির্ভরতা কমানো, বাণিজ্যিক ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং উচ্চ সুদের ঋণ সীমিত করার প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে। এছাড়া স্বল্পমেয়াদি ঋণ কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে ঝোঁক এবং ওবিইউ নির্ভরতা হ্রাস করে দেশীয় আর্থিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে ডেটা প্রকাশ ও পর্যবেক্ষণ বাড়ানো প্রয়োজন। বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে- যেখানে এটি না সম্পূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ, না সম্পূর্ণ স্বস্তিদায়ক। বরং এটি একটি “সংবেদনশীল ভারসাম্য”। যেখানে- সঠিক নীতি নেয়া হলে এটি প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন আর ভুল সিদ্ধান্ত হলে এটি অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণ হতে পারে।