কারা সামাজিক নিরাপত্তা খাতের সুবিধাভোগী?

আবদুল হাফিজ (ছদ্মনাম) একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। থাকেন কলাবাগানে নিজস্ব ফ্ল্যাটে। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলেমেয়ে দু’জনই প্রবাসী। অনেকটা বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন এই আবদুল হাফিজ সাহেব। মজার ব্যাপার হচ্ছে বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে যে বরাদ্দ দেয়া হয় তার আওতায় আছেন তিনি। কারণ মাসের শেষে তিনি যে পেনশন পান তার অর্থ কিন্তু এই সামাজিক নিরাপত্তা খাত থেকেই দেয়া হয়। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে যেমন আবদুল হাফিজের মতো ধনী ব্যক্তিরা আছেন, ঠিক তেমনি গ্রামের হতদরিত্র মানুষও রয়েছেন। এই খাতে আবদুল হাফিজদের থাকার কথা ছিল না। কিন্তু ‘সিস্টেম’ই তাদের এ খাতে নিয়ে এসেছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

আবদুল হাফিজ (ছদ্মনাম) একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। থাকেন কলাবাগানে নিজস্ব ফ্ল্যাটে। তার এক ছেলে ও এক মেয়ে। ছেলেমেয়ে দু’জনই প্রবাসী। অনেকটা বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন এই আবদুল হাফিজ সাহেব। মজার ব্যাপার হচ্ছে বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে যে বরাদ্দ দেয়া হয় তার আওতায় আছেন তিনি। কারণ মাসের শেষে তিনি যে পেনশন পান তার অর্থ কিন্তু এই সামাজিক নিরাপত্তা খাত থেকেই দেয়া হয়। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে যেমন আবদুল হাফিজের মতো ধনী ব্যক্তিরা আছেন, ঠিক তেমনি গ্রামের হতদরিত্র মানুষও রয়েছেন। এই খাতে আবদুল হাফিজদের থাকার কথা ছিল না। কিন্তু ‘সিস্টেম’ই তাদের এ খাতে নিয়ে এসেছে।

চলতি ২০২৫-২০২৬ জাতীয় বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বাজেট বরাদ্দ রয়েছে এক লাখ ১৬ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন হিসেবে ধরা আছে ২৫ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা। শুধু পেনশনই নয়, সামাজিক সুরক্ষা খাতে সঞ্চয়পত্রের সুদ, মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝাড়ি শিল্প উদ্যোক্তাদের ভর্র্তুকির অর্থও এ খাতে ধরা আছে, যা সামাজিক সুরক্ষা বা নিরাপত্তা খাতে বাজেটে বরাদ্দ সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করা হয়।

এমন ২১টি খাতকে গরিব মানুষের সুরক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করছিল বিগত অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্নির্ধারণে গঠিত টাস্কফোর্স। এই টাস্কফোর্সের বৈষম্যহীন টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে অর্থনৈতিক কৌশল পুনর্নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় সম্পদ আহরণবিষয়ক পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে উল্লেখ্য করা হয়েছে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের দেয়া চলতি অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ রাখা অর্থের ৫৩ শতাংশই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সরকারের জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলপত্রের (এনএসএসএস) সাথে এই খাতগুলো মিলছে না।

এই প্রতিবেদনে আওয়ামী লীগের সময় নেয়া আলোচিত জয়িতা ফাউন্ডেশনের ভবন নির্মাণ, ভূমিকম্পসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় যন্ত্রপাতি কেনা, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কল্যাণে অনুদান, ইলিশ মাছ সম্পদ উন্নয়নে প্রযুক্তি কর্মসূচি, বাংলাদেশ কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড, গ্রামীণ যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনা মূল্যে বই ছাপা ও বিতরণের মতো খরচও সামাজিক সুরক্ষা খাতের খরচ হিসেবে দেখানো হয়েছে। সামাজিক সুরক্ষা বাজেটের নামে বরাদ্দ রাখা হলেও এসব টাকা শেষ পর্যন্ত দরিদ্র ও আর্থিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী পায় না।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল-সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য তেমন কার্যকর হচ্ছে না বরং এটি ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। সরকারের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ৫৩.৯% দরিদ্র মানুষ এসব কর্মসূচির আওতায় আসতে পারেননি। বরাদ্দ করা অর্থের একটি বড় অংশ ক্ষমতাসীন সুবিধাভোগীদের হাতে চলে গেছে, যা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। তাই চলমান সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর সুপারিশ করা হয়েছিল টাস্কফোর্স প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছিল, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুবিধাভোগী নির্ধারণে অনিয়ম, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে প্রকৃত দরিদ্ররা এসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে এই কর্মসূচিগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এসব কর্মসূচির সংখ্যা ১৩৮টি থাকলেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমিয়ে ১১৫টিতে নামিয়ে আনা হয়। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আবার ১৪০টিতে উন্নীত করা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় ৩০টি সরকারি সংস্থা এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে, কিন্তু কার্যকর সমন্বয়ের অভাবে প্রকৃত উপকারভোগীরা অনেক ক্ষেত্রেই বঞ্চিত হচ্ছেন।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় দেয়া বিভিন্ন ভাতা মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ উল্লেখ করে টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব ভাতা প্রকৃত গরিব জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে কোনো কার্যকর পরিবর্তন আনতে পারছে না। টাস্কফোর্সের সুপারিশে বলা হয়েছে, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য একটি নির্ভুল ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে, যাতে প্রকৃত উপকারভোগীদের চিহ্নিত করা যায়। পাশাপাশি সামাজিক বীমাভিত্তিক প্রকল্প চালু করা, শহরের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন কর্মসূচি গ্রহণ করা, জলবায়ু অভিযোজন সংযুক্ত করা এবং এনজিওগুলোর অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, সরকারি হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় মোট জিডিপির ২.৫% এবং জাতীয় বাজেটের ১৭%। তবে পেনশনসহ প্রায় ২১টি অপ্রাসঙ্গিক কর্মসূচি বাদ দিলে এই ব্যয় জিডিপির ১.২% এবং বাজেটের মাত্র ৭%-এ নেমে আসে।