ব্যবসায়ীদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক

কর ছাড়, অবকাঠামো উন্নয়ন ও জ্বালানি সহায়তার ইঙ্গিত

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের উত্তরাঞ্চলকে একটি প্রধান অ্যাগ্রো-প্রসেসিং শিল্পকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সাথে ধারাবাহিক বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল সোমবার বেলা ১১টা থেকে শুরু হওয়া তিন ধাপের বৈঠকে ফল, দুগ্ধ, খাদ্য ও পানীয় এবং পোলট্রি খাতের ১৬ জন শীর্ষ উদ্যোক্তা অংশ নেন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বৈঠকে অ্যাগ্রো-প্রসেসিং খাতের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা, বিনিয়োগ বাড়াতে প্রয়োজনীয় নীতিগত সহায়তা এবং রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে শিল্প স্থাপনের সুযোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর উপস্থিত ছিলেন। ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও সিইও আহসান খান চৌধুরী, ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান, নাবিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিনুল ইসলাম, টিকে গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার, স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজের সিইও পারভেজ সাইফুল ইসলাম, কাজী ফার্মসের এমডি কাজী জাহেদুল হাসান, ব্র্যাক এন্টারপ্রাইজেসের এমডি তামারা হাসান আবেদ, আকিজ গ্রুপের চেয়ারম্যান শেখ শামীম উদ্দিনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বৈঠক শেষে স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজের সিইও পারভেজ সাইফুল ইসলাম জানান, প্রধানমন্ত্রী উত্তরাঞ্চলে অ্যাগ্রো-প্রসেসিং শিল্পে বিনিয়োগ বাড়ানোর উপায় জানতে চান। তিনি বলেন, “আমরা প্রায় ২৫ বছর ধরে এই খাতে কাজ করছি, যার ৮০ শতাংশ কাঁচামাল স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা হয়। পাবনায় একটি কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা থাকলেও গ্যাসসংযোগের অভাবে তা এগোচ্ছে না।’

তিনি আরো বলেন, কৃষিপণ্যের রেডিয়েশন টেস্টিং সুবিধার অভাব এবং কোল্ডস্টোরেজ ও কোল্ড চেইনব্যবস্থার ঘাটতির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এসব বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান আহসান খান চৌধুরী জানান, প্রধানমন্ত্রী উত্তরাঞ্চলে পতিত জমির প্রাপ্যতার বিষয়টি তুলে ধরে বিনিয়োগে উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগ আকর্ষণে কর অবকাশ, ইউটিলিটি সহায়তা ও অবকাঠামো উন্নয়নের প্রস্তাব দিয়েছি।’

তিনি আরো জানান, প্রধানমন্ত্রী অ্যাগ্রো-প্রসেসিং খাতে বিনিয়োগে কর অবকাশ বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। পাশাপাশি কৃষিপণ্যের মান যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষাগার স্থাপন এবং কোল্ডস্টোরেজ সুবিধা সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। অগ্রগতি পর্যালোচনায় ছয় মাসের মধ্যে আরেক দফা বৈঠকের আগ্রহও প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।

বৈঠকে জ্বালানি সঙ্কট ও বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়েও ব্যবসায়ীরা উদ্বেগ তুলে ধরেন। ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান বৈঠককে ‘খুবই আন্তরিক ও ফলপ্রসূ’ উল্লেখ করে বলেন, বর্তমান ব্যবসায়িক পরিবেশ, বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে আমরা খোলামেলা আলোচনা করেছি। বিশেষ করে অ্যাগ্রো-প্রসেসিং খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং রপ্তানি বৈচিত্র্য নিয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।”

তিনি জানান, ব্যবসা নিবন্ধন প্রক্রিয়া সহজ করা, ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নত করা এবং জ্বালানি সঙ্কট নিরসনে সরকার-বেসরকারি সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। ‘আমরা একে একে সমস্যাগুলো তুলে ধরেছি এবং প্রধানমন্ত্রী তার উপদেষ্টাকে বেশ কিছু বিষয়ে তাৎক্ষণিক উদ্যোগ নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন,’-যোগ করেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, সরকার ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে এই সংলাপ বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হবে এবং উত্তরাঞ্চলে অ্যাগ্রো-প্রসেসিং শিল্পের বিকাশ ত্বরান্বিত করবে।

পহেলা বৈশাখে শুরু হচ্ছে ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পহেলা বৈশাখ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ কর্মসূচি। দেশের কৃষকদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন এবং কৃষি খাতকে আধুনিক প্রযুক্তির সাথে সংযুক্ত করার লক্ষ্যে এই উদ্যোগটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।

গতকাল সোমবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে কৃষি ও কৃষিজাত শিল্পে বিনিয়োগকারীদের সাথে মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে এ তথ্য নিশ্চিত করেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও প্রবাসী কল্যাণবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন।

তিনি জানান, নির্বাচনে বিজয়ের অল্প সময়ের মধ্যেই সরকার তার ইশতেহারে ঘোষিত প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের কার্যক্রম শুরু করেছে। ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো কৃষকদের অধিকার সুরক্ষা, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতকরণ এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন।

প্রথম পর্যায়ে দেশের ১০টি জেলার ১১টি উপজেলায় এই কর্মসূচি চালু করা হবে। পর্যায়ক্রমে প্রায় ৩০ লাখ কৃষককে এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। উদ্বোধনী দিনে টাঙ্গাইলে ১,৫০০ কৃষকের হাতে সরাসরি এই কার্ড তুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এই কার্ডের মাধ্যমে কৃষকরা সরাসরি রাষ্ট্রীয় সহায়তা পাবেন। প্রতিটি কার্ডধারী কৃষককে ২,৫০০ টাকা করে আর্থিক অনুদান প্রদান করা হবে। পাশাপাশি সার, উন্নত বীজ, সেচ সুবিধা ও কীটনাশক সুলভ মূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। এ ছাড়া স্বল্প সুদে ঋণ সুবিধা, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিপূরণ পেতে কৃষিবীমা, আধুনিক কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণও এই কর্মসূচির আওতায় থাকবে। মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই ভর্তুকি সরাসরি কৃষকের কাছে পৌঁছানো এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও এর অন্যতম লক্ষ্য।

কর্মসূচির পরিধি শুধু ফসল উৎপাদনকারী কৃষকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি খামারিদেরও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষকদের আবহাওয়ার পূর্বাভাসসহ প্রয়োজনীয় কৃষি তথ্য সরবরাহ করা হবে।

ব্রিফিংয়ে মাহদী আমিন আরো জানান, এটি মূলত সরকারের ঘোষিত ৩১ দফা সংস্কার পরিকল্পনার একটি অংশ। এর আগে নারীদের ক্ষমতায়নে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে ইমাম, মুয়াজ্জিন ও রিকশা শ্রমিকদের জন্যও বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, কৃষকদের উন্নয়নের মধ্য দিয়েই দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি আরো শক্তিশালী হবে এবং বাংলাদেশ একটি স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

টেলিনর গ্রুপের সিইওর সাক্ষাৎ

বাসস জানায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন টেলিনর গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বেনেডিক্টে শিলব্রেড ফাসমার। গতকাল সকালে সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে এ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এ কথা জানান।

সাক্ষাৎকালে টেলিনর গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তা বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতের উন্নয়ন এবং ডিজিটাল অবকাঠামো নির্মাণে তাদের সংস্থার আগ্রহ ও চলমান কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করেন। এ সময়ে টেলিনরের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে তাদের বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা-সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরা হয়।

বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং টেলিনর গ্রুপের প্রতিনিধিদলের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।