হাবিবুল বাশার
জুলাই আন্দোলনে মিরপুরে গুলিতে নিহত শহীদ মনিরুল ইসলামের পরিবার এক বছর পরও বিচার ও নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে। নিহতের ছেলে মঞ্জুরুল ইসলাম রিফাতের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রকৃত ঘটনার ভিত্তিতে মামলা করতে গিয়ে তারা একাধিকবার বাধার মুখে পড়েছেন। পরিবারের দাবি, রাজনৈতিক বিবেচনা নয়, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিচারের আওতায় আনা হোক।
মঞ্জুরুল ইসলাম রিফাত জানান, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই মিরপুর-১৩ এলাকায় পুলিশের ছোড়া গুলিতে তার বাবা মনিরুল ইসলাম নিহত হন। তার ভাষ্য, সেদিন জমিজমা-সংক্রান্ত একটি কাজে বের হয়ে তিনি মিরপুর-১৩-এর ব্লক-বি এলাকায় অবস্থান করছিলেন। সন্ধ্যার দিকে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর মাগরিবের নামাজের সময় ব্লক-বি-এর ৮ নম্বর সড়কের সামনে মাথায় গুলি লাগে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে রিফাত বলেন, ঘটনাস্থলেই তার বাবার মৃত্যু হয়।
তিনি জানান, আগের দিন ১৮ জুলাই মিরপুর-১০ এলাকায় আন্দোলনের সময় বাবা-ছেলের দেখা হয়েছিল। তখন শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছররা গুলির চিহ্ন দেখিয়ে মনিরুল ইসলাম বলেছিলেন, “আমি ছাত্রদের অভিভাবক হয়ে নেমেছি। আমার ছেলেও আন্দোলনে আছে, তাই ঘরে বসে থাকতে পারিনি।”
রিফাত বলেন, আন্দোলনকারীরা লাশ উদ্ধার করে প্রথমে বাসায় নিয়ে আসেন। পরে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। সে সময় হাসপাতালে কিছু সশস্ত্র ব্যক্তি এসে নিহতরা আন্দোলনকারী কি না জানতে চাইলে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। পরে দ্রুত লাশ বাসায় নেয়া হয়। বরিশালের গ্রামের বাড়িতে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় মনিরুলের লাশ।
হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে মামলা করতে গিয়ে নানা জটিলতার মুখে পড়েছেন বলেও দাবি করেন রিফাত। তার অভিযোগ, কাফরুল থানায় অভিযোগ দিতে গেলে ঘটনাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়। পরে একজন আইনজীবীর মাধ্যমে মামলা করার উদ্যোগ নিলেও একই ধরনের চাপে পড়েন। পরে তাদের অজান্তেই অন্য একজনের মাধ্যমে একটি হত্যা মামলা দায়ের হয়। কয়েক মাস পর পুলিশ যোগাযোগ করলে পরিবার জানায়, মামলাটি তারা করেনি।
তদন্ত নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করে রিফাত বলেন, ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ আলামত শুরুতেই যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি। পরে পরিবার তথ্য দিলেও সেগুলো তদন্তে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায়নি। তার দাবি, “প্রকৃত ঘটনা যেমন ঘটেছে, ঠিক সেভাবেই তদন্ত হোক। রাজনৈতিক প্রভাব নয়, সত্যের ভিত্তিতে বিচার হোক।”
বর্তমানে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে পড়াশোনার পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্বও পালন করছেন রিফাত। তার দুই ছোট বোনের একজন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছেন, অন্যজন স্কুলে পড়ছে। পরিবারের মা ২০১৪ সাল থেকে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। রিফাত বলেন, “সবচেয়ে বড় বিষয় নিরাপত্তা। মা অসুস্থ, দুই ছোট বোন রয়েছে। যদি কোনোদিন আমাদের ওপর হামলা হয়, আমাদের রক্ষা করার মতো অবস্থায় আমরা নেই। এই ভয় সবসময় কাজ করে।”
তিনি আরো বলেন, পরিবার কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বিচার চায় না। তাদের প্রত্যাশা, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে এবং সব শহীদ পরিবারের প্রতি সমান মর্যাদা প্রদর্শন করা হবে।
রিফাত জানান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে জামায়াতে ইসলামী নিয়মিতভাবে তাদের পরিবারের খোঁজখবর নিয়েছে। বিএনপির নেতারা একবার তাদের বাসায় গিয়েছিলেন বলে তিনি জানান। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকেও মাঝেমধ্যে পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা হয়। তবে এ ছাড়া অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো সহযোগিতা বা খোঁজখবর পাননি বলে দাবি করেন তিনি।



