নিখোঁজ স্বজনরা ‘জীবিত না মৃত?’ জানার অপেক্ষায় গাজার হাজারো পরিবার

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
Printed Edition
  • গাজায় দখলকে স্থায়ী করার প্রকাশ্য আহ্বান ইসরাইলি আইনপ্রণেতাদের
  • গাজায় শীতে জমে ছয় ফিলিস্তিনি শিশুর মৃত্যু : ইউনিসেফ
  • পূর্ব জেরুসালেমে বিদ্যুৎ-পানি বন্ধের উদ্যোগ ইসরাইলের

গাজায় ইসরাইলের চলমান গণহত্যামূলক যুদ্ধ শুধু ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসই নয়, হাজারো ফিলিস্তিনি পরিবারের জন্য সৃষ্টি করেছে এক ভয়াবহ অনিশ্চয়তা-নিখোঁজ স্বজনরা জীবিত নাকি মৃত, সেই তথ্যের সম্পূর্ণ শূন্যতা।

আলজাজিরাকে এক নিখোঁজ তরুণের স্ত্রী বলেন, ‘আমরা জানি না, ও আটক আছে নাকি শহীদ। অনেক ফরম পূরণ করেছি, তবু আশাটুকু এখনো আছে।’ জানুয়ারিতে নিখোঁজ হন তার স্বামী আবদুর রহমান।

এই মানসিক যন্ত্রণার চিত্র আরো স্পষ্ট হয় ৬৭ বছর বয়সী হামজা আদওয়ানের ঘটনায়। মৃত্যুর চার মাস পর তার পরিবারকে জানানো হয়, তিনি মারা গেছেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ইসরাইলি হেফাজতে মারা যান। আদওয়ান ছিলেন ৯ সন্তানের জনক, যিনি যুদ্ধ শুরুর আগেই দুই ছেলেকে হারিয়ে ছিলেন। গুরুতর হৃদরোগসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগলেও ২০২৪ সালের ১২ নভেম্বর তাকে একটি চেকপয়েন্ট থেকে আটক করা হয়। বন্দিবিষয়ক কমিশন ও ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স সোসাইটি বলছে, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি ‘জোরপূর্বক গুম’ নীতির অংশ, যা চলমান গণহত্যামূলক যুদ্ধের একটি অবিচ্ছেদ্য উপাদান।

আলজাজিরার সংগৃহীত সাক্ষ্যপ্রমাণে দেখা যায়, অনেক পরিবার পরস্পরবিরোধী তথ্যে বিভ্রান্ত। ডিসেম্বর ২০২৪-এ আটক আমরোর বাবাকে প্রথমে জানানো হয়, তার ছেলে হেফাজতেই মারা গেছে। কিন্তু পরে মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দীরা জানান, তারা আমরোকে জীবিত দেখেছেন। ‘আমরা আশায় বেঁচে আছি’- বলেন তিনি, যদিও ভয় পাচ্ছেন অকল্পনীয় নির্যাতনের শিকার হতে পারে তার ছেলে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইসরাইলের বিরুদ্ধে ‘ধীরগতির মৃত্যুদণ্ড’ নীতির অভিযোগ তুলেছে। তারা বলছে, অনাহার, চিকিৎসায় অবহেলা ও নির্যাতনের মাধ্যমে বন্দীদের হত্যা করা হচ্ছে। একই সাথে ফিলিস্তিনি বন্দীদের মৃত্যুদণ্ড বৈধ করার আইন প্রণয়নের উদ্যোগকেও তারা ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকে আইনি রূপ দেয়ার চেষ্টা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ইসরাইলি কারাগারে বন্দী ফিলিস্তিনির সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৯ হাজার ৩০০। এর মধ্যে তিন হাজার ৩৮৫ জন প্রশাসনিক বন্দী, যাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা বিচার নেই। আরো এক হাজার ২৩৭ জনকে ‘অবৈধ যোদ্ধা’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে, যাদের কোনো আইনি সুরক্ষা নেই। যুদ্ধ শুরুর পর ইসরাইলি হেফাজতে মৃত্যুবরণকারী বন্দীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৭ জনে, যার মধ্যে ৫১ জন গাজার।

পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তুলেছে আন্তর্জাতিক নজরদারির অনুপস্থিতি। আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটি (আইসিআরসি) নিশ্চিত করেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে তারা ইসরাইলি আটক কেন্দ্রগুলোতে প্রবেশের অনুমতি পায়নি।

এ দিকে সোমবার গাজায় চিকিৎসক ও প্যারামেডিকরা বিক্ষোভ করে কামাল আদওয়ান হাসপাতাল থেকে আটক ৩০ চিকিৎসাকর্মীর মুক্তির দাবি জানান। ব্যানারে উঠে আসে হাসপাতাল পরিচালক ডা: হুসাম আবু সাফিয়ার ছবি, যাকে রোগীদের চিকিৎসা দেয়ার সময় আটক করা হয়। বক্তারা সতর্ক করেন, বন্দীদের জন্য ঝুঁকি মারাত্মক- যেমনটি ঘটেছিল ডা: ইয়াদ আল-রানতিসির ক্ষেত্রে, যিনি জিজ্ঞাসাবাদের সময় মৃত্যুবরণ করেন।

গাজা দখলকে স্থায়ী করার প্রকাশ্য আহ্বান ইসরাইলি আইনপ্রণেতাদের

গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর থাকলেও ইসরাইলের বারবার হামলায় কার্যত তা ‘ভঙ্গুর’ অবস্থায় রয়েছে। এবার গাজা উপত্যকায় স্থায়ী দখলের পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন ইসরাইলের শীর্ষ কর্মকর্তারা। এতে যুক্তরাষ্ট্রসমর্থিত পরিকল্পনাকেও তারা কার্যত অগ্রাহ্য করেছেন, যেখানে গাজায় ইসরাইলের সামরিক উপস্থিতি বা ভূখণ্ডটি নিজেদের সাথে যুক্ত করার বিষয়টি স্পষ্টভাবে নাকচ করা হয়েছে। খবর আনাদোলুর।

ইসরাইলের ডানপন্থী চ্যানেল ৭-এর খবরে বলা হয়, সোমবার এসব বক্তব্য আসে ইসরাইলি পার্লামেন্ট (নেসেট)-এ আয়োজিত ‘গাজা দ্য ডে আফটার’ শীর্ষক এক সম্মেলনে। সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে উপপ্রধানমন্ত্রী ইয়ারিভ লেভিন বলেন, গাজায় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা ইসরাইলের বৃহত্তর ভূখণ্ডগত দাবির অংশ। তিনি বলেন, আমাদের গাজায় এবং পুরো ‘ল্যান্ড অব ইসরাইল’-জুড়ে নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। এটি প্রথম ও প্রধানত, আমাদের দেশ। একই সম্মেলনে কট্টর ডানপন্থী আইনপ্রণেতা সিমচা রথম্যানও বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, গাজার ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব ইসরাইলের হাতেই থাকা উচিত। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চালানো ইসরাইলি আগ্রাসনে ৭১ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। এ সময়ে আরো এক লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। আর গাজা উপত্যকা কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। গত ১০ অক্টোবর একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ইসরাইলি সেনাবাহিনী হামলা অব্যাহত রেখেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এর পর থেকে অন্তত ৪৪২ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক হাজার ২৩৬ জন আহত হয়েছেন।

গাজায় শীতে জমে ছয় ফিলিস্তিনি শিশুর মৃত্যু : ইউনিসেফ

গাজায় চলতি শীত মৌসুমে অন্তত ছয় ফিলিস্তিনি শিশু হাইপোথারমিয়ায় মারা গেছে বলে জানিয়েছে জাতিসঙ্ঘের শিশু সংস্থা ইউনিসেফ। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গাজায় শিশুদের জীবন ‘শ্বাসরুদ্ধকর’ অবস্থায় রয়েছে। খবর মিডল ইস্ট মনিটরের।

গতকাল মঙ্গলবার জেনেভায় সাংবাদিকদের সাথে ভিডিও ব্রিফিংয়ে গাজা থেকে ইউনিসেফের মুখপাত্র জেমস এল্ডার বলেন, ‘গত কয়েক দিনে আবারো শিশুরা ঠাণ্ডায় মারা গেছে। এ শীতে মৃত শিশুর সংখ্যা এখন ছয়।’ তিনি জানান, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে কার্যকর যুদ্ধবিরতির পরও ১০০টির বেশি শিশু নিহত হয়েছে, অর্থাৎ যুদ্ধবিরতির সময়েও প্রতিদিন গড়ে একটি শিশু প্রাণ হারাচ্ছে। ইউনিসেফের তথ্যমতে, নিশ্চিত হিসাব অনুযায়ী নিহত শিশুদের মধ্যে ৬০ জন ছেলে ও ৪০ জন মেয়ে। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এল্ডার বলেন, অধিকাংশ শিশুই বিমান হামলা, ড্রোন হামলা, ট্যাংক গোলাবর্ষণ ও গুলিতে নিহত হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বোমার গতি কমানো যুদ্ধবিরতি যথেষ্ট নয়, যদি তা শিশুদের কবর দেয়াই অব্যাহত রাখে। গাজার শিশুদের জন্য প্রকৃত নিরাপত্তা, মানবিক সহায়তা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।

পূর্ব জেরুসালেমে বিদ্যুৎ-পানি বন্ধের উদ্যোগ ইসরাইলের

দখলকৃত পূর্ব জেরুসালেমে জাতিসঙ্ঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ পরিচালিত ভবনগুলোতে বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ বিচ্ছিন্নের কার্যক্রম শুরু করেছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ একে ইউএনআরডব্লিউএ’র বিরুদ্ধে ‘নতুন মাত্রার আগ্রাসন’ হিসেবে বর্ণনা করেছে বলে জানিয়েছে মিডল ইস্ট মনিটর।

জেরুসালেম গভর্নরেটের এক বিবৃতিতে বলা হয়, ইসরাইলি বিদ্যুৎ কোম্পানি ইতোমধ্যে বিচ্ছিন্নকরণের নোটিশ পাঠিয়েছে, যা ১৫ দিনের মধ্যে কার্যকর হবে। একই সাথে ইসরাইলি পানি কোম্পানি গিহোন ইউএনআরডব্লিউএ ব্যবহৃত ভবনগুলোতে পানি সরবরাহ বন্ধের নোটিশ দিয়েছে। এ পদক্ষেপ ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর ইসরাইলি পার্লামেন্ট নেসেটে অনুমোদিত একটি আইনের ভিত্তিতে নেয়া হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে ১০টি ইউএনআরডব্লিউএ ভবন-স্কুল, ক্লিনিক, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও প্রশাসনিক দফতরের আওতায় পড়েছে, যার মধ্যে শেখ জাররাহ এলাকার প্রধান কার্যালয়ও রয়েছে।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে, এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে পূর্ব জেরুসালেমে শরণার্থীদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ত্রাণসেবা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বর্তমানে দখলকৃত পশ্চিমতীরে ইউএনআরডব্লিউএ পরিচালিত স্কুলে প্রায় ৪৮ হাজার শিশু পড়াশোনা করছে। ইউএনআরডব্লিউএ জানিয়েছে, তারা নিরপেক্ষতার কঠোর নীতি অনুসরণ করে। সংস্থাটি ৭০ বছরেরও বেশি সময় আগে ফিলিস্তিনিদের সহায়তার জন্য জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়।

যুদ্ধবিরতির পরও গাজায় ২,৫০০ ভবন ধ্বংস

মার্কিন সংবাদপত্র নিউ ইয়র্ক টাইমস প্রকাশিত স্যাটেলাইট ছবির বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও গাজা উপত্যকায় ব্যাপক ধ্বংসলীলা ঘটেছে। ছবিতে দেখা যায়, ইসরাইলি সেনাদের পরিচালিত বৃহৎ ধ্বংস অভিযানেই দুই হাজার ৫০০টির বেশি ভবন ধ্বংস হয়েছে। খবর মিডল ইস্ট মনিটরের।

ছবিতে পুরোপুরি সমতল হয়ে যাওয়া কয়েকটি আবাসিক এলাকা এবং গাজার বিভিন্ন স্থানে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি ধ্বংস হতে দেখা যায়। এতে স্পষ্ট হয়েছে, যুদ্ধবিরতির পরও অবকাঠামো, আবাসিক এলাকা ও কৃষিজমি ভয়াবহ ক্ষতির শিকার হয়েছে। এই বিশ্লেষণ ইসরাইলি সেনাদের হামলার ব্যাপক প্রভাবের চাক্ষুষ প্রমাণ দিয়েছে। এতে গাজার বাসিন্দাদের সামনে দাঁড়ানো গুরুতর মানবিক সঙ্কটের বিষয়টি উঠে এসেছে, বিশেষ করে পুনর্গঠন ও স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা ভয়াবহ ধ্বংস আর সীমিত সম্পদের কারণে কঠিন হয়ে পড়েছে।