ক্রিকেটে কি অশনি সঙ্কেত!

জসিম উদ্দিন রানা
Printed Edition

দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ক্রীড়াঙ্গনে প্রভাব ফেলবে, এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই প্রভাব কি হবে সংস্কারের প্রেরণা, নাকি অস্থিরতার অশনি সঙ্কেত? সাম্প্রতিক সময়ে ক্রিকেট প্রশাসন ঘিরে যে আলোচনা তীব্র হয়েছে, তা কেবল ব্যক্তিগত মন্তব্য বা পাল্টা বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর ভেতরে লুকিয়ে আছে নীতিগত সঙ্ঘাত, আন্তর্জাতিক বাস্তবতা এবং শাসন ব্যবস্থার প্রশ্ন।

টেকনোক্র্যাট কোটায় যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়া সাবেক জাতীয় ফুটবল অধিনায়ক আমিনুল হক অতীতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। দায়িত্ব গ্রহণের পরও তার বক্তব্যে সমালোচনার প্রতিধ্বনি শোনা গেছে, তবে একই সাথে আলোচনার পথ খোলা রাখার বার্তাও দিয়েছেন। এটাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সঙ্ঘাত নয়, সংলাপ। দূর থেকে বক্তব্য দেয়া, আর আলোচনায় বসে অনেক কিছুরই সমাধান সম্ভব।

ক্রিকেট প্রশাসনে সরাসরি হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জটিলতা তৈরি করতে পারে। এ বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। বিসিবি কোনো একক সত্তা নয়; এটি আন্তর্জাতিক কাঠামোর অংশ। আইসিসির নীতিমালা সদস্য বোর্ডগুলোর স্বায়ত্তশাসন রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়। ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত যদি রাজনৈতিক প্রভাবের ইঙ্গিত বহন করে, তা হলে আইসিসির সংশ্লিষ্ট ধারা প্রয়োগের সুযোগ থাকে। এ কথাই ইঙ্গিতে জানিয়েছেন বিসিবির সহ-সভাপতি ফারুক আহমেদ। তিনি সরাসরি নিষেধাজ্ঞার কথা বলেননি, তবে সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দেননি। এ সতর্ক সংকেতকে হালকাভাবে নেয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

এ দিকে বিসিবি পরিচালক এম নাজমুল ইসলাম মনে করছেন, বোর্ড ভেঙে দেয়ার মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। তার বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে, বর্তমান বোর্ড যেমন নির্বাচিত, সরকারও তেমনি নির্বাচিত। উভয়েরই সাংগঠনিক কাঠামো ও নীতিমালা আছে। সেগুলোর ভেতর থেকেই সমাধান খুঁজতে হবে। নইলে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের নজির ভবিষ্যতে আরও বড় সঙ্কট ডেকে আনতে পারে।

বাস্তবতা হলো, ক্রিকেট এখন কেবল খেলা নয়। এটি অর্থনীতি, কূটনীতি এবং জাতীয় ভাবমূর্তির অংশ। একটি ভুল পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে। একই সঙ্গে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্নও উপেক্ষা করা যায় না। যদি নির্বাচনী প্রক্রিয়া বা প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি থাকে, তা সংস্কারের পথেই সমাধান করতে হবে, সংঘর্ষের মাধ্যমে নয়।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে প্রয়োজন পরিমিতি, প্রজ্ঞা ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্মান। রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে উত্তাপ বাড়ানো সহজ কিন্তু তার দায় বহন করতে হয় ক্রিকেটার, সমর্থক ও দেশের ভাবমূর্তিকে। তাই এখন সময় হুশে ফেরার। ব্যক্তিগত অবস্থান নয়, জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়ার।

ক্রিকেটে সংস্কারের সম্ভাবনার সংকেত আছে। তবে তা যদি অবিবেচক সিদ্ধান্তে রূপ নেয়, তখনই তা অশনি সংকেতে পরিণত হবে। সিদ্ধান্ত যাদের হাতে, তাদের মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি।