আহমেদ ইফতেখার
দীর্ঘ ১৯ বছরের পথচলায় নিজেদের সবচেয়ে জনপ্রিয় পণ্যটিতে এবার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন নিয়ে এসেছে মার্কিন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান অ্যাপল। দীর্ঘদিনের জল্পনা ও গুঞ্জনের অবসান ঘটিয়ে গত ৯ সেপ্টেম্বর ক্যালিফোর্নিয়ার কুপারটিনোয় অ্যাপল পার্কে অনুষ্ঠিত ‘সারপ্রাইজ অ্যান্ড শাইন’ নামক জমকালো ইভেন্টে উন্মোচিত হয়েছে বহুল প্রতীক্ষিত ফোল্ডেবল স্মার্টফোন ‘আইফোন ডুও’। নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জন টার্নাসের নেতৃত্বে এটিই অ্যাপলের প্রথম কোনো বড় লঞ্চিং ইভেন্ট। বাজারে টিকে থাকা অন্যান্য ফোল্ডেবল ফোনের কড়া সমালোচনা করে জন টার্নাস দাবি করেছেন, এই ডিভাইস ফোল্ডেবল ফোন ব্যবহারের পুরো ধারণাকে একেবারে বদলে দেবে।
পাসপোর্টের মতো দেখতে এই ফোল্ডেবল ফোনটি একটি বইয়ের মতো সহজে খোলা ও বন্ধ করা যায়। এটি পুরোপুরি খোলার পর হবে অ্যাপলের তৈরি এ যাবৎকালের সবচেয়ে পাতলা আইফোন। ফোনটির বাইরের দিকে রয়েছে ৫.৪ ইঞ্চির সুপার রেটিনা এক্সডিআর পর্দা, যা আইফোন ১৮ প্রো-এর পর্দার প্রায় ৯০ শতাংশ জায়গার সমান। আর ফোনটি মেলে ধরলে ভেতরের দিকে ভেসে ওঠে ৭.৬ ইঞ্চির একটি বিশাল স্ক্রিন। মুভি দেখা, গেম খেলা কিংবা একসঙ্গে দুটি অ্যাপ চালিয়ে মাল্টিটাস্কিংয়ের জন্য এই স্ক্রিন দারুণ উপযোগী।
ফোল্ডেবল ফোনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করা হয় মাঝখানের ক্রিজকে। অ্যাপল এই সমস্যার সমাধানে বিশেষ ন্যানো-টেক্সচার ফিনিশ ব্যবহার করেছে। এছাড়া ফোনের ভেতরে থাকা শতাধিক যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি বিশেষ হিঞ্জ বা কবজা পর্দাটি সবসময় সমান রাখতে সাহায্য করে। গ্রেড-৫ টাইটানিয়াম দিয়ে তৈরি এর মিরর-পলিশড কাঠামো বেশ প্রিমিয়াম লুক দেয়। পর্দার সুরক্ষায় ব্যবহৃত হয়েছে ‘সিরামিক শিল্ড-২’, যার ফলে ডিভাইসটি আগের প্রজন্মের তুলনায় তিন গুণ বেশি দাগপ্রতিরোধী ও টেকসই। ফোল্ডেবল ফোনের স্থায়িত্ব নিয়ে ক্রেতাদের মনে থাকা সংশয় দূর করতে লাইভস্ট্রিমে দেখানো হয়েছে যে, এই ফোন প্রায় দুই লাখবার অনায়াসে ভাঁজ করা যায়। এতে পানি ও ধুলাবালু প্রতিরোধক আইপি-৬৮ প্রযুক্তিও রয়েছে। ডিভাইসটি ‘স্টার হোয়াইট’ ও ‘নাইট স্কাই’ এই দুটি রঙে বাজারে মিলবে।
আইফোন ডুওতে কোনো সিম স্লট বা ফেস আইডি রাখা হয়নি। এর পরিবর্তে রয়েছে সাইড বাটনে যুক্ত টাচ আইডি এবং ই-সিম ব্যবহারের সুবিধা। এর কার্যক্ষমতা নিশ্চিত করতে ভেতরে ব্যবহার করা হয়েছে নতুন ‘এ-২০ প্রো’ চিপ এবং ১২ গিগাবাইট র্যাম। ডিভাইসটিকে ঠাণ্ডা রাখতে যুক্ত করা হয়েছে আপগ্রেডেড থার্মাল ম্যানেজমেন্ট বা তাপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। এর দুই পাশে থাকা দুটি ব্যাটারি দুই পর্দাই ব্যবহার করলে ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত ব্যাকআপ দিতে সক্ষম। দ্রুত চার্জিংয়ের মাধ্যমে মাত্র ২০ মিনিটে প্রায় ৫০ শতাংশ চার্জ করা সম্ভব। কানেক্টিভিটির জন্য এতে রয়েছে অ্যাপলের নিজস্ব ‘সি-২ মডেম’। এই ফোনটিতে আছে ৪৮ মেগাপিক্সেলের ফিউশন মেইন ক্যামেরা এবং ৪৮ মেগাপিক্সেলের ফিউশন আলট্রা ওয়াইড ক্যামেরা।
‘ডুও প্রিভিউ’ ফিচারের মাধ্যমে ক্যামেরার সামনে থাকা ব্যক্তি বাইরের পর্দাতেই লাইভ প্রিভিউ দেখতে পাবেন। স্মার্ট টেকফিচারের সাহায্যে ফোনটি নিজে থেকেই বুঝতে পারে কখন সবাই প্রস্তুত এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছবি তুলে নেয়। গ্রুপ ছবি বা সেলফির ক্ষেত্রে ‘ডুও ফেসটাইম’ ফিচারের মাধ্যমে আশপাশের বন্ধুরা সহজেই বাইরের পর্দা থেকে কলে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া শিশুদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে বাইরের পর্দায় ‘কিড কিউ’ অপশন এবং ভেতরের পর্দার নিচে লুকানো ‘সেন্টার স্টেজ ফ্রন্ট ক্যামেরা’ রাখা হয়েছে। দ্রুত ক্যামেরা চালু ও নিয়ন্ত্রণের জন্য রয়েছে ‘ক্যামেরা কন্ট্রোল’ বাটন এবং ‘সিরি ক্যামেরা মোড’। জিরো শাটার ল্যাগ ও অপটিক্যাল মানের টুএক্স টেলিফটো জুমের সুবাদে দূরের বিষয়ও নিখুঁতভাবে ধারণ করা যাবে।
আইফোন ডুওর প্রারম্ভিক দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৯৯৯ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় আড়াই লাখ টাকা। আগামী ১৬ অক্টোবর থেকে এর প্রি-অর্ডার শুরু হবে এবং ২৩ অক্টোবর থেকে ডিভাইসটি আনুষ্ঠানিকভাবে ক্রেতাদের হাতে পৌঁছাবে। একই ইভেন্টে অ্যাপল ওয়াচ সিরিজ ১২, আল্ট্রা ৪, এয়ারপডস ৫ এবং নতুন ‘আইফোন ১৮ প্রো’ ও ‘১৮ প্রো ম্যাক্স’-এর মতো ডিভাইসও উন্মোচন করা হয়েছে।



