আমদানির পেঁয়াজেও বাজারে ঝাঁজ

সিন্ডিকেটের চাপে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন স্বাভাবিক, গুদামে আগের মৌসুমের লাখ টন মজুদ রেখেই অনেকটা চাপেই আমদানির অনুমতি দেয় কৃষি মন্ত্রণালয়।

কাওসার আজম
Printed Edition

বাজার স্বাভাবিক রাখতে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের চাপে ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন স্বাভাবিক, গুদামে আগের মৌসুমের লাখ টন মজুদ রেখেই অনেকটা চাপেই আমদানির অনুমতি দেয় কৃষি মন্ত্রণালয়। গত ৭ ডিসেম্বর থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত (১২ দিন) প্রায় ৫০ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির (আইপি) অনুমতি দিয়েছে কৃষি মন্ত্রণালয়। এর বিপরীতে গতকাল পর্যন্ত দেশে এসেছে ১৬ হাজার ৫০০ টন পেঁয়াজ। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) সংগনিরোধ উইং সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রথমে সীমিত পরিসরে দিনে ৫০টি আইপি তথা দিনে এক হাজার ৫০০ টন করে আমদানির অনুমতি দেয় সরকার। এর পরও বাজার স্থিতিশীল না হওয়ায় তা বাড়িয়ে দেয় কৃষি মন্ত্রণালয়। সর্বশেষ গতকাল ছয় হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি দেয় ডিএইর সংগনিরোধ উইং।

গত মাসের শেষের দিক থেকে দেশে মুড়িকাটা পেঁয়াজ তোলা শুরু হয়েছে। গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ তুলছেন কৃষক। আগামী জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ১১ লাখ টন গ্রীষ্মকালীন ও মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে আসবে। এর পর মার্চ-এপ্রিল থেকে কৃষকের নিয়মিত পেঁয়াজ তোলা শুরু হবে। এর মধ্যে বাজারে নতুন পেঁয়াজ তোলা শুরু হয়েছে। আমদানির পেঁয়াজও আসছে। তার পরও পেঁয়াজের দাম শতকের উপরে। এর পেছনে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের কারসাজির কথা উচ্চারিত হচ্ছে।

আমদানি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও ভোক্তারা বলছেন, ভারত থেকে আমদানির পেঁয়াজ বাংলাদেশে পৌঁছতে প্রতি কেজি ৪০ টাকা করে পড়ছে। পাইকারি বাজারে ভারতীয় পেঁয়াজ ৮০ টাকা বা তারও বেশি দরে বিক্রি হচ্ছে। আর খুচরা বাজারে ১০০ বা তারও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। অর্থাৎ দ্বিগুণেরও বেশি মুনাফা করছে ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সর্বশেষ গত আগস্ট মাসে পেঁয়াজ আমদানির অনুমতি (আইপি) দেয়া হয়। তখন প্রায় ১২ হাজার টন আমদানির পর কৃষকের কথা বিবেচনায় বন্ধ করে দেয়া হয়। প্রায় সাড়ে তিন হাজার ব্যবসায়ী আইপির জন্য ডিএইতে আবেদন করে। আইপি বন্ধ হওয়ার পর তারা নানাভাবে সরকারকে চাপ দিতে থাকে। এর পর তারা উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়। এরই মধ্যে চলতি ডিসেম্বরের প্রথম দিকে পেঁয়াজের কেজি ১৬০ টাকায় ঠেকে। বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে কৃষি মন্ত্রণালয় সীমিত পরিসরে আমদানির অনুমতি দেয়। শুরুতে প্রতিদিন ১৫০০ টন অনুমতি দিলেও বাজার দরে তেমন প্রভাব না পড়ায় আমদানি অনুমতির পরিসর বাড়িয়ে দেয়। সর্বশেষ গতকাল এক দিনে ছয় হাজার টন রেকর্ড আমদানির অনুমতি দেয় ডিএইর সংগনিরোধ উইং।

কৃষি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীল বা সহনীয় পর্যায়ে না আসা পর্যন্ত আইপি দেয়া হবে। তবে, বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ আমদানি চলমান থাকলে পেঁয়াজ চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হন কি-না, তা নিয়েও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। তাই আমদানির অনুমতি খুব বেশি দিন চালিয়ে না যেতেও পরামর্শ আসছে।

এ দিকে, পেঁয়াজ আমদানির আইপি নিয়েও কথা উঠেছে। ব্যবসায়ীদের অনেকে অভিযোগ করেছেন প্রতি আইপি ইস্যু করতে (৩০ টন) ৫০ হাজার টাকা বা তারও বেশি একটি চক্রকে ‘উৎকোচ’ দিতে হয়। সূত্র জানায়, ৭ ডিসেম্বর থেকে আইপি দেয়া শুরু হয়। প্রথম দিকে ৫০টি প্রতিষ্ঠানকে এই আইপি দেয়া হয়। গত আগস্টে আবেদন করা ৩৫০টি প্রতিষ্ঠানের মধ্য থেকে প্রতি দিন এই সংখ্যক আইপি দেয়া হয়। যেহেতু অল্প সংখ্যক আইপি দেয়া হয় তাই বঞ্চিতরা হুমড়ি খেয়ে পড়েন সংশ্লিষ্টদের কাছে। তারাই উৎকোচ দাবির অভিযোগ তুলছেন।

ডিএইর সংগনিরোধ উইংয়ের গুরুত্বপূর্ণ আমদানি শাখায় গত প্রায় ছয় মাসের বেশি হলো উপ-পরিচালক পদ শূন্য। অতিরিক্ত উপ-পরিচালক বনি আমিন খান উপ-পরিচালকেরও দায়িত্ব পালন করছেন। আইপি প্রদানে উৎকোচের বিষয়টি নাকচ করে দিয়ে বনি আমিন খান বলেন, সম্পূর্ণ অনলাইন সিস্টেমে আইপি ইস্যু করা হচ্ছে। এখানে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই। মূলত যারা পাচ্ছেন না তারা এসব অভিযোগ করছেন।

এ দিকে, চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ ও ঢাকার পাইকারি বাজারে অভিযান চালিয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরণ অধিদফতর আমদানি মূল্য ও বিক্রয় মূল্যের অস্বাভাবিক ফারাক পেয়েছে। সংস্থাটির দাবি, অনিয়ম প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে দাম বাড়ানো হয়েছে। কৃষকের স্বার্থ উপো করে অদৃশ্য শক্তির চাপে সরকার আমদানিতে বাধ্য হয়েছে। কত দামে পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে ও কত দামে বিক্রি হচ্ছে, এই তথ্য প্রকাশ করলেই বাজার নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে মনে করেন তিনি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বলছে, দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২৮ লাখ টন। উৎপাদন ৪৪ লাখ টন। প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ পেঁয়াজ সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যায়। ফলে দেশে পেঁয়াজের কিছুটা ঘাটতি থেকেই যায়। তবে, কৃষি মন্ত্রণালয়ভুক্ত একাধিক সংস্থা পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য কাজ করছে। এটি নিশ্চিত হলে আগামীতে আর আমদানি করতে হবে না।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সরেজমিন উইংয়ের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো: জামাল উদ্দীন বলেন, ইচ্ছা করে সঙ্কট তৈরি করে দাম বাড়ানোই এখন একটি চক্রের ল্য। সংরণ সমতা বাড়ানো গেলে দেশীয় উৎপাদনের পেঁয়াজ পরিস্থিতি আরো স্থিতিশীল হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক এস এম সোহরাব উদ্দিন জানান, অল্প জমিতে করা মুড়িকাটা পেঁয়াজই এখন বাজারে এসেছে। কিন্তু ভালো দামের লোভে কৃষকরা অপরিপক্ব পেঁয়াজও তুলছেন, এতে উৎপাদন কমছে। মাঠপর্যায়ে বিষয়টি বোঝানো হচ্ছে।