বিশেষ সংবাদদাতা
রিটার্নিং কর্মকর্তার করা বৈধ প্রার্থীদের বিরুদ্ধেও কেউ কেউ আপিল করেছেন নির্বাচন কমিশনের আপিল আদালতে। কিন্তু সেগুলো যুক্তিতে টিকছে না। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে শুনানির চতুর্থ দিনে ৫৩ জন প্রার্থী হিসেবে বৈধতা পেলেন। ফলে চার দিনের শুনানিতে মোট প্রার্থিতা ফিরে পেয়ে ২০৪ জন নতুন করে ভোটের মাঠে আসলেন। তবে দুইজনের বৈধ প্রার্থিতার বিরুদ্ধে করা আপিলও খারিজ করেছে ইসি। আর গতকাল আপিল খারিজ বা নামঞ্জুর করেছে ১৫ জনের বলে ইসির দেয়া তথ্য থেকে জানা গেছে।
আগারগাঁওস্থ নির্বাচন ভবনের সম্মেলন কক্ষে গতকাল চতুর্থ দিনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সভাপতিত্বে পুরো কমিশনের উপস্থিতিতে এই আপিলের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল আরো ৭০টি আপিল শুনানি হয়। সেটিসহ মোট ৭০টি শুনানি শেষে গতকাল রায় হয়। আপিলকারী ও তাদের পক্ষে আইনজীবীরা বৈধতা পেতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। এতে প্রার্থিতা ফিরে পান ৫৩ জন এবং আবেদন নামঞ্জুর ১৫ জনের। আপিল নিষ্পত্তির প্রথম চারদিনে ২৮০টি শুনানি করে কমিশন। এর মধ্যে মোট ২০৪ জনের আপিল মঞ্জুর করে কমিশন। শুনানিতে নির্বাচন কমিশন সংসদীয় আসন নোয়াখালী-৫ ও রাজশাহী-৫ আসনে মনোনয়নপত্র গ্রহণের বিরুদ্ধে দুইটি আপিল আবেদন নামঞ্জুর করায় ওই দুই আসনের দুইজন প্রার্থীর প্রার্থিতা বহাল থাকবে বলে ইসির পরিচালক জনসংযোগ গণমাধ্যমকে জানান। আজ বুধবার ২৮১ থেকে ৩৮০ নম্বর আপিলের শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।
আচরণবিধি লঙ্ঘন করে ইসির সামনেই ভোট চাইলেন মামুনুল হক : এ দিকে, আগারগাঁওস্থ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সামনে আচরণবিধি লঙ্ঘন করে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর অভিযোগ উঠেছে ঢাকা-১৩ আসনের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা মামুনুল হকের বিরুদ্ধে। গতকাল মঙ্গলবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তিনি অনুসারীদের নিয়ে ইসি ভবনের সামনে সাধারণ মানুষের মধ্যে লিফলেট বিতরণ করেন। মূল ভবনের পুলিশি ব্যারিকেডের সামনে এই প্রচারণা চালান মামুনুল হক।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে নির্বাচন কমিশনের সামনে দলীয় কর্মীদের নিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে ভোট চান তিনি। এ সময় সামনে যাকে পেয়েছেন, তার সাথে হাত মেলানোসহ দোয়া ও ভোট প্রার্থনা করতে দেখা যায় তাকে। একই সাথে তিনি নিজ হাতে সবার মধ্যে লিফলেটও বিতরণ করেন। প্রতীক বরাদ্দের আগে নির্বাচনী প্রচারণায় বিধিনিষেধ থাকলেও, নির্বাচন কমিশনের সামনে এভাবে আচরণবিধি লঙ্ঘন করে প্রচারণা চালান মামুনুল হক।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকা-১৩ আসনের রিটার্নিং অফিসার ও ঢাকা আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা মো: ইউনুচ আলী বলেন, প্রতীক বরাদ্দের আগে কোনো প্রার্থী নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারবেন না। তবে, তারা সীমিত পরিসরে গণসংযোগ করতে পারবেন। কিন্তু গণসংযোগকালে কোনো ধরনের লিফলেট বিতরণ করা যাবে না। যদি কেউ লিফলেট বিতরণ করেন, তবে তা নির্বাচনী আচরণবিধির লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে প্রার্থীদের আচরণবিধি প্রতিপালন নিশ্চিত করতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা দায়িত্ব পালন করছেন। কেউ আচরণবিধি ভঙ্গ করলে প্রয়োজনে ইনকোয়ারি কমিটি বিষয়টি আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। নির্বাচন কমিশনের সামনে মামুনুল হকের নির্বাচনী প্রচারণা ও লিফলেট বিতরণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি এখনো নজরে আসেনি।
উল্লেখ্য, আগামী ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনে আপিল শুনানি চলবে। আগামী ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষদিন এবং প্রতীক বরাদ্দ ২১ জানুয়ারি। প্রতীক পাওয়ার পরই প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিক প্রচারণা চালাতে পারবেন।
নির্বাচনে যাওয়ার অধিকার সবার আছে : জাপা মহাসচিব
জুলাই ঐক্যের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় পার্টি (জাপা) মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারী ইসিতে গণমাধ্যমকে বলেছেন, এ দেশের সব নাগরিকের ভোট করার অধিকার আছে, ভোটে যাওয়ার অধিকার আছে, রাজনীতি করার অধিকার আছে। এই অধিকার তাদের কাছ থেকে কেউ নিয়ে নিতে পারে না। আমাদের ভোটে যাওয়ার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাচনের তফসিলকালীন সময়ে কোনো দল বা নির্বাচনী জোটের বৈধতা থাকা সত্ত্বেও হুমকি দিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে থামানোর যে চেষ্টা করা হয়েছে, সেটা গণতন্ত্রবিরোধী। আদালতের রায়ের অপব্যাখ্যা করে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বাধা দেয়া এবং বিচার বিভাগের প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করা হয়েছে।
গতকাল দুপুরে জুলাই ঐক্য ইসি সচিবালয়ে স্মারক জমা দেয়ার পরে শামীম হায়দার পাটোয়ারী এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আমাদের সামনে এখন কোনো গণতন্ত্র নেই। নির্বাচন কমিশনকে হুমকি দিয়ে, স্টে অর্ডার না থাকা সত্ত্বেও আদালতের রায়ের অপব্যাখ্যা করে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে থামানোর যে চেষ্টা- এটা গণতন্ত্রবিরোধী। আদালতের প্রতি অসম্মান। বিচার বিভাগকে ভয় দেখানোর চেষ্টা। আমরা তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। জাতীয় পার্টি ভোটে যাবে কি যাবে না- এটা জাতীয় পার্টির নিজস্ব দলীয় সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেন জাপা মহাসচিব।
জাপাসহ ফ্যাসিবাদের দোসরদের বিরুদ্ধে ইসিতে স্মারকলিপি : এ দিকে জাতীয় পার্টি প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে ইসি গতকাল ঘেরাওয়ের চেষ্টা করেছিল জুলাই ঐক্য। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সামনে পুলিশ ব্যারিকেড দেয়। কিছু নেতাকর্মী ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ হয়, তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। পরে তিনজন প্রতিনিধি নির্বাচন ভবনে স্মারক জমা দেন। পুলিশের বাধার মুখে গতকাল দেড়টার দিকে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজের কাছে স্মারকলিপিটি জমা দেয়া হয়। জুলাই ঐক্যের নেতারা দাবি করেন, জাতীয় পার্টি ও সংশ্লিষ্ট জোটের প্রার্থীদের মনোনয়ন সংক্রান্ত বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। তারা অভিযোগ করেন, বিদ্যমান আইনি ও নৈতিক প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও এসব প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ রাখা হয়েছে।
স্মারকলিপি জমা দিতে আসার আগে ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মোসাদ্দেক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে যারা অংশ নিয়েছে তারা ফ্যাসিবাদের দোসর। তবে ১৮ সালে শেখ হাসিনাকে বিশ্বাস করে গণতন্ত্র রক্ষা করতে বিএনপি-জামায়াত ভোটে গিয়েছিল, কিন্তু রাতের ভোটের মাধ্যমে প্রহসনের নির্বাচন হয়েছে। তিনি বলেন, ২০১৮ সালের ভোট ডাকাতির নির্বাচনকে ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনের সাথে মেলানো যাবে না। মোসাদ্দেক আলী ইবনে মোহাম্মদ বলেন, সম্প্রতি তারা হাইকোর্টে রিট দায়ের করেছেন এবং একটি রুল জারি হয়েছে। তিনি আশা করেন, হাইকোর্ট খুব শিগগিরই সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল করবেন।


