অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
পুঁজিবাজার ক্রমান্বয়ে স্বাভাবিক আচরণে ফিরছে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। এতে কমবেশি স্বস্তি ফিরে আসছে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। গতকাল বৃহস্পতিবার সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসে সূচকের অবনতি হলেও বিনিয়োগকারীরা বাজার আচরণে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করেন পুঁজিবাজারে সূচকের ওঠানামার চেয়েও বেশি জরুরি যারা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের সাথে রয়েছেন তাদের মনোভাব। গত ক’দিনের বাজার আচরণে তারা ইতিবাচক ধারারই প্রতিফলন দেখছেন এমনই মন্তব্য ছিল মতিঝিলের বিভিন্ন ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের কয়েকজন তরুণ বিনিয়োগকারীর। তাদের মতে, এটি সামনের দিনগুলোতে একটি ভালো বাজারের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রসঙ্গত বিগত বেশ কয়েক মাস পুঁজিবাজারগুলোতে কিছু দুর্বল ভিত্তির কোম্পানির একচ্ছত্র প্রাধান্য ছিল। অন্য দিকে ভালো ও মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলো হয়ে পড়েছিল কোণঠাসা। এর ফলে একদিকে পুঁজিবাজার তার স্বাভাবিক আচরণ হারাতে থাকে, অন্য দিকে ভালো বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশই বাজার বিমুখ হতে শুরু করে। কিন্তু সম্প্রতি বাজার আচরণে কিছুটা পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানির প্রতি আগ্রহ বাড়তে শুরু করেছে বিনিয়োগকারীদের। এটি অব্যাহত থাকলে তা সামনের দিনগুলোতে পুঁজিবাজারের জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে বলে মনে করেন তারা। কারণ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সাইডলাইনে থাকা বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ আবার বাজারে অবস্থান নিতে পারেন।
প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৭ দশমিক ৫২ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। সকালে ৪ হাজার ৯৬৬ দশমিক ৫১ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার দিনশেষে নেমে আসে ৪ হাজার ৯৫৮ দশমিক ৯৮ পয়েন্টে। লেনদেন শুরুর প্রায় আধঘণ্টা পর বাজারটিতে বিক্রয়চাপ তৈরি হলেও মোট লেনদেন সময়ের একটি বড় অংশই বাজারটি সূচকের উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। কিন্তু লেনদেনের একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে বিক্রয়চাপ কিছুটা তীব্রও হয়ে ওঠে, যা দিনশেষে সূচকের অবনতি ঘটায়। এ সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচকের মধ্যে ডিএসই-৩০ ৪ দশমিক ৫১ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে পারলেও ডিএসই শরিয়াহ সূচকটির ১ দশমিক ৯৭ পয়েন্ট অবনতি ঘটে।
সূচকের একই আচরণ দেখা গেছে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) এখানে সিএসইর প্রধান সূচক সিএএসপিআই ৮ দশমিক ৫৯ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ১৩ হাজার ৯১৫ দশমিক ৮১ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে নেমে আসে ১৩ হাজার ৯০৭ দশমিক ২১ পয়েন্টে। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচকের মধ্যে সিএসই-৩০ সূচকটি ১২ দশমিক ৬৯ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হলেও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি হয় ১ দশমিক ৪৯ পয়েন্ট।
বাজার-সংশ্লিষ্টরা গতকালের বাজার আচরণকে সংশোধন হিসেবেই দেখছেন। তারা মনে করেন গত ক’দিন তালিকাভুক্ত ভালো কোম্পানিগুলোর বেশ খানিকটা মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। তাই বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ নিজেদের মুনাফা তুলে নিতে গিয়ে সূচকের কিছুটা অবনতি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তারা বিমাখাতের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, গত কয়েক দিনে বিমাখাতের প্রায় শতভাগ কোম্পানির কমবেশি মূল্যবৃদ্ধি হয়েছিল। এ খাতেই বেশি সংশোধন হয় গতকাল। তা সত্ত্বেও আবার ভালো কোম্পানির দিকে বিনিয়োগকারীদের ঝোঁক সামনের দিনগুলোতে বাজারের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তারাও। তারা মনে করেন, এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে বাজার বিমুখ ভালো ও সক্ষম বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ আবার বাজারে ফিরতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সামনে নির্বাচনকে ঘিরে বিনিয়োগকারীরা একটু দোদুল্যমান অবস্থায় রয়েছেন। নির্বাচনের আগে বা পরে বাজার কোনদিকে মোড় নিতে পারে তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় আছেন বিনিয়োগকারীদের একটি বড় অংশ। তাই এ মুহূর্তে বাজার একটু ঢিলেঢালা অবস্থায় পার করছে। সঠিক সময়ে নির্বাচন হলে পুঁজিবাজার নতুন করে গতি ফিরে পাবে।
গতকাল দুই পুঁজিবাজারেই লেনদেন হওয়া কোম্পানির বেশির ভাগ দরপতনের শিকার হয়। ঢাকায় লেনদেন হওয়া ৩৯০টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ১০২টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দর হারায় ২২০টি। দর অপরিবর্তিত ছিল ৬৮টির। অপর দিকে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে লেনদেনে অংশ নেয়া ১৫৮টি সিকিউরিটিজের মধ্যে ৬১টির দাম বাড়ে, ৭১টির কমে এবং ২৬টির অপরিবর্তিত থাকে।
গতকাল ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষে ছিল ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস। ১৯ কোটি ১৭ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৯ লাখ ১১ হাজার শেয়ার হাতবদল হয়। ১১ কোটি ২২ লাখ টাকায় ৪৪ লাখ ২২ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করা ব্যাংকিং কোম্পানি সিটি ব্যাংক ছিল দ্বিতীয় স্থানে। ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে এপেক্স স্পিনিং, ওরিয়ন ইনফিউশন, মালেক স্পিনিং, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স, সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, এসিআই লিঃ, লাভেলো আইসক্রিম ও খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ।
গতকাল ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ কোম্পানি ছিল টেক্সটাইল খাতের এপেক্স স্পিনিং। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৯ দশমিক ৯৬ শতাংশ। ৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে এ তালিকার দ্বিতীয় ছিল চামড়া খাতের কোম্পানি এপেক্স ট্যানারি। ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে এনসিসিবি, ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, বিডি ল্যাম্প, ট্রাস্ট ব্যাংক, ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ফার্স্ট বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ফান্ড, রহিম টেক্সটাইলস, এপেক্স ফুডস, মোজাফ্ফর হোসাইন স্পিনিং মিলস ও ইন্দু বাংলা ফার্মাসিউটিক্যালস।
এ দিন বাজারটিতে দরপতনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ। কোম্পানিটির দরপতনের হার ছিল ৭ দশমিক ৩১ শতাংশ। ৭ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল বিচ হ্যাচারিজ। দরপতনে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে তুং হাই টেক্সটাইলস, অ্যাপোলো ইস্পাত, জাহিন টেক্সটাইলস, ওইম্যাক্স ইলেক্ট্রোড, বিডি থাই অ্যালুমিনিয়াম, আল- আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংক, আরএসআরএম স্টিলস ও ঢাকা ইন্স্যুরেন্স।



