ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রে বড় ধরনের আইনি সীমাবদ্ধতা কাটানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৭(২) ধারায় পরিচালনা পর্ষদ বাতিলের আদেশের মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার বিধান রয়েছে। কিন্তু ব্যাংক খাতের চলমান পুনর্গঠন, মালিকানা ও পরিচালনা কাঠামো পুনর্বিন্যাস এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোকে ঘিরে বিভিন্ন জটিলতার মধ্যে এই দুই বছরের সীমা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে বিশেষ ক্ষেত্রে ওই মেয়াদসংক্রান্ত বিধান থেকে অব্যাহতি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে গতকাল সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে সংশ্লিষ্টদের অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রজ্ঞাপনের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।
জানা গেছে, ব্যাংক-কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৭ (১) ধারায় কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের কার্যকলাপ ব্যাংক বা আমানতকারীদের স্বার্থের পরিপন্থী, ক্ষতিকর বা অনাকাক্সিক্ষত হলে বাংলাদেশ ব্যাংক লিখিত কারণ উল্লেখ করে ওই পর্ষদ বাতিল করতে পারে। একই সাথে আইনটির ৪৭(২) ধারায় বলা হয়েছে, পর্ষদ বাতিলের আদেশের মেয়াদ বাংলাদেশ ব্যাংক সময় বাড়াতে পারবে; তবে বর্ধিত মেয়াদসহ মোট মেয়াদ দুই বছরের বেশি হতে পারবে না। অর্থাৎ ২০২৪ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে যেসব ব্যাংকের পর্ষদ বাতিল করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন পর্ষদ বসিয়েছিল, সেসব ক্ষেত্রে চলতি বছরের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে সময়ের মধ্যে দুই বছরের মেয়াদ পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। ফলে পর্ষদ বাতিল রেখে বাংলাদেশ ব্যাংকের মনোনীত ব্যক্তিদের মাধ্যমে ব্যাংক পরিচালনা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে আইনি বাধা তৈরি হয়েছে। এই বাস্তবতাই এখন নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
এ দিকে বিগত স্বৈরাচারের আমলে দেশের আর্থিক খাত বিশেষ করে ব্যাংকিং সেক্টরে লুটপাটের নৈরাজ্য, অনিয়ম, সুশাসনের ঘাটতি ও ব্যাংক লুটেরা এস আলমের ব্যাংক দখল ও জনগণের আমানতের অর্থ ঋণের নামে বের করে পাচার করা হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর অন্তবর্তীকালীন সরকার এস আলমসহ ব্যাংক লুটেরাদের প্রভাবমুক্ত করতে একের পর এক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক। ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকসহ একাধিক ব্যাংকে নতুন পর্ষদ গঠন করা হয়। এরপর পর্যায়ক্রমে আরো কয়েকটি ব্যাংকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়ন্ত্রিত পর্ষদ গঠন করা হয়। মোট ১১টি বেসরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে দুই বছর আগে ভেঙে দেয়া পর্ষদগুলোর মেয়াদ চলতি বছরে শেষ হওয়ার পর্যায়ে আসে। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ধাপে ধাপে উদ্যোক্তা ও শেয়ারহোল্ডারদের হাতে ফিরিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এরই প্রথম বড় উদাহরণ আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক। প্রায় দুই বছর স্বতন্ত্র পরিচালকদের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার পর গত জুলাইয়ে ব্যাংকটির পর্ষদে উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডারদের প্রতিনিধিত্ব ফিরিয়ে দেয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন করে ১৪ জন উদ্যোক্তা পরিচালককে পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করে।
এখানেই গতকালের প্রজ্ঞাপনের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। একদিকে দুই বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ায় কিছু ব্যাংকের পর্ষদ মালিকপক্ষের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া চলছে। অন্য দিকে বিশেষ পরিস্থিতিতে পর্ষদ বাতিলের মেয়াদসংক্রান্ত আইনি সীমা থেকে অব্যাহতি দেয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এর অর্থ হলো সব ব্যাংকের ক্ষেত্রে একই ধরনের সমাধান আরোপ না করে যেসব ব্যাংকের ক্ষেত্রে পুনর্গঠন, একীভূতকরণ, মালিকানা যাচাই, সম্পদ পুনরুদ্ধার বা সুশাসন প্রতিষ্ঠার কাজ এখনো অসম্পূর্ণ, সেগুলোকে আলাদা ব্যবস্থায় রাখার সুযোগ তৈরি করা। বিশেষ করে পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংককে একীভূত করে নতুন ব্যাংক গঠনের প্রক্রিয়া এর সাথে গুরুত্বপূর্ণভাবে সম্পর্কিত। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংককে একীভূত করে নতুন কাঠামোর অধীনে নেয়ার উদ্যোগ চলছে। এই প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত পুরনো মালিকানা ও পর্ষদ কাঠামো নিয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরার সুযোগ সীমিত। ফলে এসব ব্যাংকের ক্ষেত্রে দুই বছরের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার প্রশ্নটি শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতার সাথেও যুক্ত।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, পর্ষদ বাতিলের মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংকের আমানতকারী ও সাধারণ গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা। আইনটির ৪৭(৩) ধারায় বলা হয়েছে, পর্ষদ বাতিল থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক যে ব্যক্তিকে নিয়োগ করবে, তিনি পর্ষদের যাবতীয় ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু এই ব্যবস্থা দীর্ঘায়িত হলে অন্য প্রশ্নও সামনে আসে। একটি বেসরকারি ব্যাংকের মালিক ও শেয়ারহোল্ডারদের সাংবিধানিক ও আইনি অধিকার কতদিন পর্যন্ত স্থগিত রাখা যাবে? আবার অনিয়মের অভিযোগে সরিয়ে দেয়া পুরনো মালিকপক্ষকে পর্যাপ্ত যাচাই ছাড়া নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দিলে আমানতকারীর স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকবে? ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই দ্বন্দ্বই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, আওয়ামী ফ্যাসিবাদের আমলে ব্যাংকিং খাতে লুটপাটের কারণে দেশের ব্যাংকিং খাতে শ্রেণিকৃত ঋণ এখন ভয়াবহ পর্যায়ে রয়েছে। ২০২৬ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে শ্রেণিকৃত ঋণ প্রায় পাঁচ লাখ ৮৮৭ কোটি টাকায় উঠেছে এবং মোট খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে হয়েছে ৩২.২৬ শতাংশ। অর্থাৎ শুধু পর্ষদ পরিবর্তন করলেই ব্যাংকের সমস্যা শেষ হচ্ছে না; বিপুল খেলাপি ঋণ আদায়, অনিয়মের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, সম্পদ পুনরুদ্ধার এবং মূলধন ঘাটতি পূরণ- সবই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-দুই বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে থাকার পর যেসব ব্যাংকের পর্ষদ মালিকপক্ষের হাতে ফিরবে, তারা কি আগের অবস্থায় ফিরে যাবে? বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানে ‘মালিকানা’ এবং ‘পরিচালনার অধিকার’কে এক করে দেখলে চলবে না। প্রকৃত মালিকানা যাচাই, ঋণখেলাপি পরিচালক শনাক্তকরণ, সুবিধাভোগী মালিকানা বা আল্টিমেট বেনিফিশিয়াল ওনার (ইউবিও) যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের ঋণ ও লেনদেন পর্যালোচনা করেই নতুন পর্ষদ গঠন করা প্রয়োজন। কারণ অতীতে ব্যাংকের পর্ষদকে কেন্দ্র করে গোষ্ঠীগত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অভিযোগ থেকেই বড় ধরনের ঋণ অনিয়মের জন্ম হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার চোখের সামনে একই গোষ্ঠী ব্যাংকের পর্ষদ, ঋণ অনুমোদন ও ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করেছে- এমন অভিযোগও বহুবার উঠেছে।
এর ফলে বাংলাদেশ ব্যাংক জারি করা নতুন প্রজ্ঞাপনে নতুন ক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। গতকালের প্রজ্ঞাপন তাই কেবল একটি প্রশাসনিক নির্দেশনা নয়; ব্যাংক খাতের চলমান সংস্কার প্রক্রিয়ায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে বিশেষ পরিস্থিতিতে দুই বছরের আইনি সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে প্রয়োজনীয় সময় পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে এই ক্ষমতার প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যাংককে কেন অব্যাহতি দেয়া হবে, কত দিনের জন্য দেয়া হবে এবং ওই সময়ের মধ্যে কী সংস্কার সম্পন্ন করতে হবে- এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট রোডম্যাপ থাকা জরুরি। অন্যথায় দুই বছরের সীমা থেকে অব্যাহতি যদি অনির্দিষ্টকাল প্রশাসক বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক-নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনা বহাল রাখার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে ব্যাংক পরিচালনায় জবাবদিহির নতুন সঙ্কট তৈরি হতে পারে। অন্য দিকে এই অব্যাহতি যদি কেবলমাত্র দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, সম্পদ উদ্ধার, মালিকানা যাচাই ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য একটি ‘ট্রানজিশন পিরিয়ড’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক হতে পারে।
সবমিলিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনে এখন দ্বিমুখী পরীক্ষা। একদিকে আইন অনুযায়ী দুই বছর পূর্ণ হওয়া ব্যাংকগুলোর পর্ষদ নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, অন্য দিকে যেসব ব্যাংকের আর্থিক ও প্রশাসনিক সংস্কার এখনো অসম্পূর্ণ, সেগুলোকে তাড়াহুড়ো করে আগের মালিকদের হাতে তুলে দেয়া যাবে না। আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের মতো ক্ষেত্রে পরীক্ষিত উদ্যোক্তাদের ফিরিয়ে এনে নতুন পর্ষদ গঠনের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সেটি কতটা সফল হয়তা এখন দেখার বিষয়। একই সাথে একীভূত হতে যাওয়া পাঁচ ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট। ব্যাংক খাতে যখন খেলাপি ঋণ ৩২ শতাংশের ওপরে, মূলধন ঘাটতি প্রকট এবং অতীতের অনিয়মের অর্থ উদ্ধারের অভিযান চলছে, তখন শুধু ‘কার হাতে পর্ষদ’- এই প্রশ্ন যথেষ্ট নয়। বরং আসল প্রশ্ন হলো- কারা ব্যাংকের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, কারা খেলাপি ঋণ আদায় করবে এবং কারা আমানতকারীর স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে। ১০ আগস্টের প্রজ্ঞাপন সেই বৃহত্তর প্রশ্নেরই নতুন অধ্যায় খুলে দিয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।



