মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
দেশের ইতিহাসে এই প্রথম সরকার ও বিরোধী সংসদ সদস্যদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। যেখানে নির্বাচনের আগে ও পরে রাষ্ট্রপতি প্রার্থী বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের সাথে কুশলাদি বিনিময় করেছেন এবং নির্বাচিত হওয়ার পর বিরোধী দলের নেতার সাথে কোলাকুলিও করেছেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদের ভেতর এমন অভূতপূর্ব দৃশ্য স্বাধীনতা পরবর্তীতে এই প্রথম বলে মন্তব্য করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিরোধীদলের অংশগ্রহণে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে আরো শক্তিশালী করছে বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতি এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আমরা একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব সম্পন্ন করেছি। আগামী দিনের রাজনীতিতে বিরোধীদলের অংশগ্রহণসহ পুরো সংসদ এই নির্বাচন প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত থাকাটা দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে আরো বেগবান ও শক্তিশালী করবে।
গত ২৪ জুলাই রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়েন মো: সাহাবুদ্দিন। এরপর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। বৃহস্পতিবার দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল সংসদে বিশাল ব্যবধানে জয়ের পর বিপুল করতালিতে অভিনন্দিত হয়েছেন বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বাধীনতার পর এভাবে কোনো রাষ্ট্রপতি সরকার ও বিরোধী দলের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হওয়ার নজির নেই। যদিও এর আগে নির্বাচন হয়েছিল কিন্তু সেগুলো ছিল অনেকটা একতরফা।
এর আগে সর্বশেষ ১৯৯১ সালে সংসদ সদস্যদের প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছিল। ওই সময় বিএনপির প্রার্থী হয়েছিলেন আব্দুর রহমান বিশ্বাস এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন বদরুল হায়দার চৌধুরী। আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট এবং ১৭২ ভোট পেয়ে ১১তম রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন আব্দুর রহমান বিশ্বাস। সেদিন বিরোধীদের সাথে এভাবে নতুন রাষ্ট্রপতির কর্মদন বা কোলাকুলির পরিবেশ ছিল না।
১৯৯১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন সাবেক নির্বাচন কর্মকর্তা এবং ওই নির্বাচনের পোলিং অফিসার মিহির সারওয়ার মোর্শেদ। তিনি বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্রে সেটি ছিল প্রথম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। নির্বাচনের দিন ভোটগ্রহণ শুরুর ঠিক আগেই জাতীয় সংসদের সংসদের অধিবেশন কক্ষে একসাথে ঢুকল আওয়ামী লীগ নেতা মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিম, সাজেদা চৌধুরীসহ অনেকেই। প্রকাশ্যে ভোট আয়োজন নিয়ে তুমুল প্রতিবাদ করছিলেন তারা। চিৎকার করে বলছিলেন ‘শেইম, শেইম’। তিনি বলেন, এই নির্বাচনের দিন বেলা সোয়া ২ টায় মোহাম্মদ নাসিমসহ ২০/২৫ আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য কক্ষে প্রবেশ করেন এবং সংসদ কক্ষে ভোটগ্রহণ করার প্রতিবাদ ও আপত্তি জানান। এছাড়া ফলাফল ঘোষণার পর বিরোধী সংসদ সদস্যরা হই চই করাসহ নানারকম নেতিবাচক মন্তব্য করেন।
সূত্র মতে, স্বাধীনতার ৫৪ বছরের ইতিহাসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদ নানা রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, সামরিক অভ্যুত্থান, গণ-আন্দোলন ও সাংবিধানিক পরিবর্তনের সাক্ষী। এ সময়ে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায় ২২ জন ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত বা দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে পূর্ণাঙ্গ, ভারপ্রাপ্ত ও দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির হিসাব ধরলে স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত মোট ১৯ জন ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। এর মধ্যে কয়েকজন ছিলেন ভারপ্রাপ্ত বা অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি। রাষ্ট্রপতি পদে সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯১ সালে। এরপর দীর্ঘ সময় ক্ষমতাসীন দলের একক প্রার্থী হিসেবে সাতজন রাষ্ট্রপতি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। বিরোধী দলগুলো কোনো প্রার্থী দেয়নি। ফলে দীর্ঘ ৩৫ বছর পর এবার আবারো রাষ্ট্রপতি পদে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোট অনুষ্ঠিত হলো।



