সৌদি নেতৃত্বাধীন প্রতিরক্ষা জোটে যে সুবিধা পাবে বাংলাদেশ

ডিপ্লোম্যাটের বিশ্লেষণ

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

সৌদি নেতৃত্বাধীন প্রতিরক্ষা জোটে যোগদান ইরানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কে কোনো হুমকি সৃষ্টি করবে না। এই প্রতিরক্ষা জোটে অংশগ্রহণের ফলে লোহিত সাগরে চলাচলকারী বাংলাদেশী পণ্যবাহী জাহাজগুলোর নিরাপত্তা জোরদার হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা বাড়তি পরিবহন ও বীমা খরচের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করবে। তবে জোটের সদস্যপদ সরাসরি অভ্যন্তরীণ জ্বালানির দাম কিংবা নতুন কর্মসংস্থান তৈরিতে বড় কোনো প্রভাব ফেলবে না। জোটটির কার্যক্রম এবং কমান্ড কাঠামো ভবিষ্যতে কেমন হয় এবং বাংলাদেশ এতে ঠিক কতদূর যুক্ত থাকে, তার ওপরই নির্ভর করবে এই সিদ্ধান্তের প্রকৃত ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুফল।

পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে এই সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিলো বাংলাদেশ। এই উত্তেজনা লোহিত সাগর, বাব আল-মানদেব প্রণালী এবং এডেন উপসাগরের মধ্য দিয়ে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ততম নৌপথগুলোকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। জোটের সদস্য দেশগুলো হচ্ছে, সৌদি আরব, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, পাকিস্তান, তুরস্ক, মিসর, জর্দান, ইয়েমেন, বাংলাদেশ, নাইজেরিয়া, সুদান, জিবুতি এবং সোমালিয়া।

সৌদি আরব এই জোটের নেতৃত্ব দেবে এবং এর সদর দফতর স্থাপন করবে। এর পরিকল্পিত কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ পরিকল্পনা এবং সমন্বিত সামুদ্রিক অভিযান। তবে, এর সনদ, কমান্ড ব্যবস্থা এবং কার্যবিধি এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

গত ২০ জুলাই ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি আন্দোলনের পক্ষ থেকে সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর ওপর হামলা এবং নৌ অবরোধ ঘোষণার পর এই উদ্যোগটি নেয়া হয়। হরমুজ প্রণালীতে সৃষ্ট অচলাবস্থার কারণে সৌদি আরব লোহিত সাগরে অবস্থিত তার প্রধান বন্দর ইয়ানবুর মাধ্যমে আরো বেশি তেল পরিবহন করতে বাধ্য হলে এই হুমকি আরো গুরুতর হয়ে ওঠে। এর ফলে বাব আল-মানদেব রুটের ওপর আরো বেশি চাপ সৃষ্টি হয়। আরব উপদ্বীপ থেকে জ্বালানি পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত দু’টি প্রধান জলপথকে ঘিরেই সৌদি আরব এখন ঝুঁকির সম্মুখীন।

বাংলাদেশ এই জোটকে সমর্থন জানিয়েছে, যার লক্ষ্য হলো সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদার করা এবং নৌচলাচলের স্বাধীনতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথ ও জ্বালানি সরবরাহ লাইন রক্ষা করা। এই জোটে যোগদানের সিদ্ধান্তটি এই অঞ্চলে বাংলাদেশের নিজস্ব ঝুঁকিরই প্রতিফলন।

বাংলাদেশ তার রফতানির একটি বড় অংশ ইউরোপে পাঠায়। পোশাক ও অন্যান্য পণ্যবাহী জাহাজগুলো সাধারণত লোহিত সাগর ও সুয়েজ খাল ব্যবহার করে। যখন শিপিং কোম্পানিগুলো এই পথ এড়িয়ে চলে, তখন জাহাজগুলোকে কেপ অফ গুড হোপ ঘুরে যেতে হয়। এই দীর্ঘ যাত্রার ফলে জ্বালানির ব্যবহার, মাল পরিবহন খরচ, বীমা ব্যয় এবং পণ্য পৌঁছানোর সময় বেড়ে যায়।

বাংলাদেশ লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের মাধ্যমে তুলা, রাসায়নিক, যন্ত্রপাতি এবং শিল্প উপকরণও আমদানি করে। এই দীর্ঘস্থায়ী বিঘœ মাল পরিবহন খরচ বাড়াতে পারে এবং উৎপাদন ব্যয় ও ভোক্তামূল্যের ওপর আরো চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক সম্পর্কে সৌদি আরবের একটি বিশেষ স্থান রয়েছে। দেশ দু’টি ১৯৭৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। পরের বছর থেকেই সৌদি আরবে বাংলাদেশীদের শ্রমিক অভিবাসন শুরু হয় এবং তখন থেকেই এটি এই সম্পর্কের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে উঠেছে। শুধুমাত্র ২০২৫ সালেই সাত লাখ ৫২ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশী কাজের জন্য সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। সে বছর বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশীদের মোট শ্রমিকের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি ছিলেন তারা।

স্বাভাবিকভাবেই, সৌদি আরব বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের অন্যতম বৃহত্তম উৎস। সেখানে কর্মরত বাংলাদেশীরা ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে প্রায় ৫.২৮ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন, যা মোট রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রায় ১৬ শতাংশের সমান। এই অর্থ খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং আবাসন খাতে পরিবারের ব্যয় নির্বাহে সহায়তা করে। এ ছাড়াও, এই রেমিট্যান্স এমন একটি অর্থনীতিতে মার্কিন ডলার সরবরাহ করে যা প্রায়শই তার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপের সম্মুখীন হয়।

সৌদি প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের জ্বালানি অর্থায়নেও জড়িত। ২০২৪ সালে, আন্তর্জাতিক ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইআইএফএফসি) জ্বালানি আমদানির জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে ১.৪ বিলিয়ন ডলার প্রদানে সম্মত হয়েছে। সৌদি ফান্ড ফর ডেভেলপমেন্ট (এসএফডি) ১৯৭৭ সাল থেকে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

এই স্বার্থগুলোই ব্যাখ্যা করে কেন ঢাকা সৌদি প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করলে এমন একটি দেশের সাথে উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারত, যা বাংলাদেশের শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স আয়, জ্বালানি সরবরাহ এবং উন্নয়ন অর্থায়নের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।

তবে, সরকার এই জোটে বাংলাদেশ কী অবদান রাখবে তা ব্যাখ্যা করেনি। বাংলাদেশ যুদ্ধজাহাজ, বিমান বা সেনাসদস্য পাঠাবে কি না, সে বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো নিশ্চিতকরণ নেই। ঢাকা নজরদারি তথ্য, যোগাযোগ কর্মকর্তা, প্রশিক্ষণ সহায়তা বা আর্থিক অনুদান দেবে কি না, তাও স্পষ্ট নয়।

তবে, ২ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্তকে ইরান-বিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা উচিত নয়। তিনি বলেন, ‘আমরা ইরানের সাথেও কথা বলছি, তাই এটিকে ইরানকে কোনোভাবে বাদ দেয়া বা আঘাত করার পদক্ষেপ হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই।’ তিনি আরো যোগ করেন যে, এই জোটের প্রধান উদ্দেশ্য হলো হুথি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা।

বাংলাদেশ সীমিত ভূমিকা দিয়ে শুরু করতে পারে। এটি বৈঠকে অংশ নিতে, তথ্য বিনিময় করতে, মহড়ায় অংশগ্রহণ করতে বা জোটের সদর দফতরে কর্মকর্তা নিয়োগ করতে পারে। এই ধরনের অংশগ্রহণের নজির রয়েছে। বাংলাদেশ ২০১৫ সালে সৌদি নেতৃত্বাধীন ইসলামিক মিলিটারি কাউন্টার টেরোরিজম কোয়ালিশনে যোগ দিয়েছিল, কিন্তু কোনো বড় ধরনের অভিযানিক ভূমিকা পালন করেনি। সর্বশেষ জোটটিও একই পথ অনুসরণ করতে পারে।

তবে, এবার বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট এই ব্যবস্থাকে আরো সংবেদনশীল করে তুলেছে। হুথিরা ইরানের মিত্র, অন্য দিকে সৌদি আরব ইরানের অন্যতম প্রধান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী। রিয়াদ এই জোটকে প্রতিরক্ষামূলক বলে বর্ণনা করেছে এবং বলেছে যে এটি কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পরিচালিত নয়। এই পার্থক্যটি বিশ্বাসযোগ্য থাকে কি না, তা এর কর্মকাণ্ডই নির্ধারণ করবে। নৌচলাচল সুরক্ষারব্যবস্থা হিসেবে বাণিজ্যিক জাহাজ প্রহরা, নজরদারি, অনুসন্ধান ও উদ্ধারকার্যক্রম এবং প্রতিরক্ষামূলক টহলকে তুলে ধরা যেতে পারে। ইয়েমেনের ভূখণ্ডে হামলা, হামলায় সমর্থন, ইরানি জাহাজ জব্দ, বা অবরোধে অংশগ্রহণ বাংলাদেশকে আঞ্চলিক সঙ্ঘাতের অনেক কাছাকাছি নিয়ে যাবে।

ইরানের সাথে বাংলাদেশের কোনো সরাসরি বিরোধ নেই এবং তেহরানের সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রয়েছে। তবে, সৌদি আরবের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের তুলনায় এই অর্থনৈতিক সম্পর্ক সীমিত। ইরান তুলনীয় কোনো শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স প্রবাহ বা উন্নয়ন অর্থায়ন প্রদান করে না।

সুতরাং, সৌদি ও ইরানের সাথে সম্পর্কের সঙ্ঘাত হলে ঢাকা রিয়াদের দিকে ঝুঁকে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

জোটটি কার্যকর হওয়ার পর বাংলাদেশ তার অংশগ্রহণের সীমা কিভাবে নির্ধারণ করে, তার ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করবে। আর্থিক ব্যয় এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদানের নিয়মকানুনও প্রকাশ করা হয়নি। প্রধান নৌপথগুলোতে অধিকতর নিরাপত্তা মালবাহী, বীমা এবং জ্বালানি খরচের আকস্মিক বৃদ্ধির ঝুঁকি কমাতে পারে। আরো অনুমানযোগ্য নৌপরিবহন রফতানিকারকদের, বিশেষ করে পোশাক খাতে, বিলম্ব এড়াতে সাহায্য করতে পারে।

তবে, জোটের সদস্যপদ অভ্যন্তরীণ জ্বালানির দাম বা পরিবহন ভাড়ার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে এমন সম্ভাবনা কম। এগুলো বৈশ্বিক পণ্যের দাম, বিনিময় হার, করব্যবস্থা এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি নীতির দ্বারাও নির্ধারিত হয়। একইভাবে, জোটে অংশগ্রহণের ফলে সৌদি আরবে বাংলাদেশীদের জন্য আরো বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে, এমন কোনো ইঙ্গিতও নেই।

নিরাপত্তা সহযোগিতা ঢাকা ও রিয়াদকে আরো কাছাকাছি আনতে পারে। তাদের সম্পর্ক ইতোমধ্যেই শ্রম অভিবাসন, রেমিট্যান্স, জ্বালানি খাতে অর্থায়ন এবং উন্নয়ন সহায়তার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।

বাংলাদেশের জন্য, জোটে তার প্রকৃত ভূমিকা কী হবে, তার ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করবে। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল রক্ষায় সহায়তা করা এক বিষয়; আর বৃহত্তর সঙ্ঘাতের সাথে যুক্ত সামরিক অভিযানে অংশ নেয়া হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি বিষয়। জোটের ম্যান্ডেট, কমান্ড কাঠামো এবং বাংলাদেশের নির্দিষ্ট দায়িত্বগুলো আরো স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত, ঢাকার জন্য এই সিদ্ধান্ত কতটা তাৎপর্যপূর্ণ হবে তা নির্ধারণ করা কঠিন।