নিজস্ব প্রতিবেদক
গত ৪ জুন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আবদুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি এবং মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে জাতীয়বাদী যুবদলের ১৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি ঘোষণার প্রায় দুই বছর পর এই পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘিরে খোদ সংগঠনের ভেতরেই ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ও আকাক্সিক্ষত এই পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে স্থান না পাওয়ায় পদপ্রত্যাশী নেতারা প্রায় প্রতিদিনই নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ও গুলশানে দলের চেয়ারম্যানের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছেন। যুবদলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলে ধরে পদবঞ্চিত ও ক্ষুব্ধ নেতারা কেন্দ্রীয় কমিটি পুনর্গঠনের দাবি জানান।
সোমবার বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, যিনি দলটির দফতরের দায়িত্বেও নিয়োজিত এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী আহমেদের সাথে সাক্ষাৎ করে যুবদলের বিক্ষুব্ধ কর্মীদের পক্ষ থেকে কমিটি বাতিলের দাবিতে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। অভিযোগপত্রে পদবঞ্চিতরা বলেছেন, ঘোষিত কমিটি একটি ‘মাই ম্যান’ বা পকেট কমিটি। পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বা অনুগত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। বিগত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী শাসনামলে ও তারও আগে ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিনের ‘বিশেষ সরকারে’র সময় মাঠের ত্যাগী ও সিনিয়রদের অবমূল্যায়ন করে জুনিয়রদের সাংগঠনিক দক্ষতাকে গুরুত্ব না দিয়ে ‘ব্যক্তিগত লবিং’ প্রধান যোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে বলে ক্ষুব্ধরা অভিযোগ করেছেন।
অভিযোগে প্রকাশ, বিগত দিনের আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে যাদের ভূমিকা ছিল না, কিংবা যারা এতদিন নিষ্ক্রিয় ছিলেন, এমন কিছু অনিয়মিত ব্যক্তি ও অচেনা মুখ বড় পদ পেয়েছেন। বেশ কয়েকজন সুনির্দিষ্ট পদপ্রাপ্ত নেতাদের নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম বিতর্ক ও প্রশ্ন। হত্যা মামলা বা অন্যান্য গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত বা বিতর্কিত চরিত্রদের কমিটিতে স্থান দেয়ার অভিযোগও করছেন পদবঞ্চিতরা। এ ছাড়া সাবেক ছাত্রদল নেতারা যারা যুবদলের পদপ্রত্যাশী ছিলেন, তাদেরও কোনো মূল্যায়ন করা হয়নি বলে বিগত কমিটিগুলোর সাবেক ছাত্রনেতারা অভিযোগ তুলেছেন।
যেসব নেতাকে নিয়ে সাধারণ কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন, সহসভাপতি রফিক আহম্মেদ ডলার। ১/১১-এর ক্রান্তিকাল থেকে বিগত ১৭ বছর বিরোধী দলের মিছিল মিটিং বা রাজনৈতিকভাবে ছিলেন নিষ্ক্রিয়; বরং অভিযোগ আছে তিনি ২০০৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সাথে মিশে ব্যবসা-বাণিজ্য করেছেন। ঘোষিত কমিটির সহসভাপতি ফিরোজ আব্দুল্লাহ কখনোই রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন না। সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম নয়নের ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ লোক হিসেবে বর্তমান কমিটিতে তাকে সহসভাপতি করা হয়েছে বলে পদবঞ্চিতদের অভিযোগ। সহসভাপতি মাহমুদুস সালেহীনকে। বর্তমান রাজনীতিতে কেউ চিনে না। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান। রাজনীতি না করেও যুবদলের ২ নং যুগ্ম সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে তাকে পদায়ন করা হয়েছে।
যুগ্ম সম্পাদক মনিরুল ইসলাম সোহাগ প্রায় ১৩ বছর রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন না বলে অভিযোগ। একজন নিষ্ক্রিয় নেতাকে প্রথম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে।
যুগ্ম সম্পাদক মঈনদ্দিন রুবেল, যার প্রকৃত নাম মঈন আলদীন বিন নাসির তিনি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কামাল-শান্ত কমিটির সহসভাপতি ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক হত্যার অভিযোগে বহিষ্কৃত। বিগত আন্দোলন সংগ্রামে রাজপথে তাকে দেখা যায়নি বলে অভিযোগ। এমন একজন নিস্ক্রিয় ব্যক্তিকে কমিটির যুগ্ম সম্পাদকের মতো বড় পদে পদায়ন করা হয়েছে।
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আজহারুল ইসলাম মিলন যুবদল সভাপতির বন্ধু এবং আবুজর গিফারী কলেজের সহপাঠী। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জোহা সুমন, শেখ হাসিনার পিএস সাইফুজ্জামান শেখরের আত্মীয় এবং তার মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট আমলে ঢাবির ক্যাম্পাসের ক্যাফে-ডিইউ এবং হাইকোর্ট এ দু’টিসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্যান্টিনের ব্যবসা চালিয়েছেন। জিয়া পরিবার ও খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানকে নিয়ে নানা কটু কথাও বলতেন। ২০২৪-এর গণ-আন্দোলনের পর অক্টোবর মাসে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড সফরে পরিবারসহ ফেইসবুকে পোস্ট দেন এবং সবাইকে আন্দোলনে না থাকার পরামর্শ দিতেন।
আবারো পদ পেয়েছেন জিয়াউর রহমান জিয়া, যিনি ধানমন্ডি থানা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওয়ারেস আহমেদের হত্যা মামলার আসামি হিসেবে কয়েক বছর পলাতক থেকে পরে জেলও খেটেছেন। এমন গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্তকে ১ নং সহসভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ দেয়ায় নেতাকর্মীরা হতাশা প্রকাশ করেছেন।
এ ছাড়াও যাদের দিকে আঙুল তুলেছেন ক্ষুব্ধরা তারা হলেন, অপরিচিত ৬০ ঊর্র্ধ্ব বয়সী এনএম আব্দুল্লাহ উজ্জ্বলসহ সাধারণ সম্পাদক, নিষ্ক্রিয় রাহাদুল আলম খানসহ সাধারণ সম্পাদক, নিষ্ক্রিয় খন্দকার মাইনউদ্দিন খোকনসহ সাধারণ সম্পাদক, নিষ্ক্রিয় মাহবুবর রহমান পলাশসহ সাধারণ সম্পাদক, নিষ্ক্রিয় কসমেটিক ব্যবসায়ী মাহবুবুর রহমানসহ সাধারণ সম্পাদক, সহসাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মেহেদী হাসান জুয়েল। অপরিচিত সহসাধারণ সম্পাদক মো: মাসুদুল হক, গত ২০ বছর রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় শাহাবুদ্দিন মুন্নাসহ সাধারণ সম্পাদক, ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার সাইদুর রহমান শামীমসহ সাংগঠনিক সম্পাদক, ঢাকার গার্মেন্টে ২০১২ থেকে চাকরিজীবী আরিফুর রহমান সোহেল সহসাংগঠনিক সম্পাদক, নিষ্ক্রিয় মো: রাশেদুল ইসলাম রিপনসহ সাংগঠনিক সম্পাদক, বিএনপির অ-অনুমোদিত ভুঁঁইফোড় সংগঠন জাতীয়তাবাদী তরুণ দল থেকে আসা তারেকুর রহমানসহ প্রচার সম্পাদক, তানভীর হাসান সোহেল আইন সম্পাদক, কখনো রাজনীতি না করা মো: মেজবাউদ্দিন মেজু ক্রীড়া সম্পাদক ইমরান আহমেদ প্রিন্স তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক।
এ ছাড়াও ডা: গালিব হাসান স্বাস্থ্য সম্পাদক, নিষ্ক্রিয় ডা: মাহমুদুল হাসান সুমনসহ স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক, ডা: আল মামুন হাসান খান এমিলসহ স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক, হেদায়েত হোসেন ভূঁইয়া পাঠাগার সম্পাদক, সাংগঠনিক রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় আমিনুল ইসলাম খান সহসাধারণ সম্পাদক পদমর্যাদায় সদস্য, অপরিচিত আবদুল্লাহ আল কাফি সাহেদ সদস্য, মাহমুদুল করিম সজল সদস্য, সাংগঠনিকভাবে অপরিচিত সালাউদ্দিন শাহীন সদস্য, অপরিচিত মো: ইমরান হোসেন শাহীন সদস্য, অপরিচিত ফখরুল বিন খালেকের ব্যাপারেও কমিটির ভেতর ও বাইরে বিভিন্ন অভিযোগ, সমালোচনা এবং ক্ষোভ শোনা যাচ্ছে।
তবে অভিযুক্তদের অনেকেই এ প্রতিবেদকের কাছে বলেছেন, তাদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হচ্ছে সেগুলো অসত্য। কমিটিকে বিতর্কিত করতেই এ ধরনের প্রপাগান্ডা চালানো হচ্ছে। তারা অতীতের সব আন্দোলন সংগ্রামে রাজপথে সোচ্চার ছিলেন।
জানতে চাইলে যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে যাচাই-বাছাই করে বিগত সময়ে রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামে যেসব নেতা ভূমিকা রেখেছেন, নির্যাতন সয়েছেন, জেল-জুলুম সহ্য করেছেন এবং যোগ্যতা অনুযায়ী তাদের পদায়ন করা হয়েছে। এরপর হাইকমান্ড সেই কমিটি অনুমোদন করেছেন। এখানে কারো পছন্দ বা অপছন্দকে প্রাধান্য দেয়া হয়নি।
পদবঞ্চিতরা বলছেন, এই ধরনের বঞ্চনা যুবদলের মতো একটি ফ্রন্টলাইনার সংগঠনের তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তি ও কর্মীদের মনোবল দুর্বল করে দিতে পারে। পাশাপাশি দলের দুর্দিনে বিএনপি নিবেদিত নেতাকর্মী হারাবে ও নেতারা সংগঠন থেকে অভিমানে মুখ গুটিয়ে নিতে পারে।



