বাহাদুরের বাহাদুরি : শফিকুল আলম টিটন

Printed Edition
বাহাদুরের বাহাদুরি :   শফিকুল আলম টিটন
বাহাদুরের বাহাদুরি : শফিকুল আলম টিটন

বাহাদুরকে দেখে মনেই হয় না বোকা ছেলে। মনে করার কারণ খুঁজে পাওয়াই ভার; বরং বলা যায় আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়ে ও অনেক অ্যাডভান্স। ঘাড় অবধি নেমে আসা তার কোকড়ানো চুল পাড়াময় সুনাম রয়েছে। তবে এ জন্যে মাঝে মধ্যে বিপদেও পড়তে হয়।

রাত জেগে মোবাইল চাপে আর ঘুম থেকে উঠতে উঠতে ১২টা বেজে যায়। ঘুম থেকে উঠে একের পর এক বুকডন দিতে থাকে। মিনিটে ৫০ থেকে ৬০টি। কিছু দিন আগেও ছিল ত্রিশের কাছাকাছি। চর্চার ওপর আয়ত্ত করে নিয়েছে ও। গিনেস রেকর্ডে নাম লেখাতে কয়দিন পর উঠে পড়ে লাগবে।

বুকডনের পর সরাসরি মায়ের কাছে। ইনিয়ে বিনিয়ে বোঝাতে চাইবে- শরীরটাকে ঠিক রাখতে পর্যাপ্ত দুধ ও ডিম দরকার। তাই প্রতিদিন বাজেট করেছি প্রতিদিন সকালে পাঁচটি ডিম, দুই গ্লাস দুধ, নাশতার আগে-পরে ভেজা ছোলা আর ডাল বাটা।

মা শুনেও না শোনার ভান করে মাছ কুটতে থাকে।

কি হলো মা? শুনতে পাচ্ছ?

মা নিরুত্তর।

না শুনলে বলো, আবার বলি।

আর বলতে হবে না।

আর বলতে হবে না। তোর প্রতিদিনের বাজেট শুনতে শুনতে এখন লো-প্রেসার হয়ে গেছে হাই-প্রেসার।

আচ্ছা বলতো তোর বাঁদরামি কবে থামবে? থামলে প্রাণে বেঁচে যাই।

দুদিন আগে বাজেটে পেশ করেছিস দুটো ডিম দরকার। আজ বলছিস পাঁচটি ডিম। এক গ্লাস দুধ হয়ে গেছে দুই গ্লাস। সাথে যোগ হয়েছে ভেজা ছোলা আর ডাল বাটা।

এবার আমাকে বল, তোর বয়স বাড়ছে নাকি কমছে।

কেন মা, আমার তো বয়স বাড়ছে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে বাজেটও বাড়ছে। শোনো মা, আমরা কজন বন্ধু মিলে সংগঠন খুলেছি। নাম দিয়েছি ‘টেকো নিধন ও চুলের পরিচর্যা’।

মাইকেল জ্যাকসনের নাম শুনেছ না? ওর গান শুনে তুমি...

অজ্ঞান হয়ে যাব এই তো। মুখের কথা কেড়ে নিয়ে মা বললেন।

না মা, তা না। ওকে দেখে বলতেও পারবা না, ও ছেলে নাকি মেয়ে! কিংবা ধরো রুড গুলিতের কথা।

কি গুলতি?

আরে গুলতি না, রুড গুলিত।

ছি! মানুষের নাম এমন হয়। খোঁজ খবর নিয়ে দেখ, ওটা মানুষ না; পশু একটা।

মা তুমি না?

ও তো বিখ্যাত খেলোয়াড়। খুব দামি। ওর মাথার চুল খুব বিখ্যাত।

বিখ্যাত না ছাই! যা তোর কাজে যা। বকবক করিস না।

মা তুমি তো তোমার ছেলেকে চিনলে না। কয়দিন পরে তোমার ছেলেকে মিডিয়াতে ডেকে নিয়ে সাক্ষাৎকার নেবে। বলবে, বলুন স্যার আপনার এমন চুলের রহস্য কী?

বুঝলাম। তোর ডাল ভেজাছোলার রহস্য কী?

এগুলো ঘুম থেকে উঠে বুক ডনের কাজ সারার আগে পরে খাব।

ব্যায়াম সেরে দাঁত মেজে কলিং বেল চাপলেই তুমি ওগুলো নিয়ে আসবে।

প্রথমে কাঁচা একটি ডিম ভেঙে খাব। তারপর বয়েল করা আরেকটি। নাশতার সময় ডিম ভাজা দিয়ে পরোটা খাব। বাকি দু’টি চুলের আর মুখের জন্যে। একটি ডালের সাথে, একটি দুধের সাথে। নাশতা খাবার পর চট করে খেয়ে নেবো এক গ্লাস দুধ।

মা তো আকাশ থেকে পড়লেন। বড় একটি শ্বাস ফেলে বাহাদুরের মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, আচ্ছা বলতে পারিস, তোর ভবিষ্যতটা কী?

কেন পারব না। আমি তো টেকো নিধনের আজীবন সদস্য। পাড়ার সবাই আমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকবে। তুমি তোমার ছেলেকে নিয়ে গর্ব করবে। শুধু কি তাই! পাড়ার খালাম্মারা ছুটে আসবে তোমার কাছে। তোমার ছেলের গুণকীর্তন করবে। তখন তোমার আনন্দে বুকের ছাতি এত্ত বড় হয়ে যাবে। কি বলো মা?

ছাই হবে। যা এখান থেকে যা। রাখ তোর মামারে খবর দিতে হবে। তোকে খুলনার সুন্দরবনে ছেড়ে দিয়ে আসুক। বনের বাঁদরগুলো তোর মাথার পোকাগুলো খুঁটে খুঁটে খাক।

মা আমি একটু আসছি। রনিদের বাসা থেকে। টেকো লোক সংগ্রহ করতে হবে। শুভ্র আসলে ওকে বসিয়ে চা-পানি দিও।

আসুক তোর বন্ধু। চটে যায় মা। ছাইপাশ দেবো। ঝেটিয়ে বিদায় করব।

তাই করো মা। আমি রনিদের বাসা থেকে ঘুরে আসছি।

ঘড়ির কাঁটা রাত ৯টা ছুঁই ছুঁই। বাহাদুর ঘরে ফেরেনি। আশপাশে খোঁজ খবর নিয়ে পাওয়া গেল না সঠিক খবর। বেলকনিতে বসে মা গালে হাত দিয়ে চিন্তায় মগ্ন। ঘন ঘন পায়চারি করছে বেলকনিতে। সময় গড়িয়ে যায়। তবু ফেরার নামটি পর্যন্ত নেই। ইজি চেয়ারে বসে মা ঝিমুচ্ছে। বাবা রেলিং ধরে আকাশের তারা গুনছে।

এমন সময় বাহাদুরকে নিরস মনে ফিরতে দেখে বাবা বলে উঠল, শুনছ- তোমার বাঁদর ছেলে ফিরেছে। আসো দেখো।

এখন ওকে কোলে নিয়ে মণ্ডা মিঠাই খাওয়াও। বেলকনিতে পা রাখতেই বাবা গর্জে ওঠে। বিদ্যুৎ চমকানোর মতো।

দাঁড়াও। এতক্ষণ কোথায় ছিলে?

রাস্তায়।

ফিরলে কেন? ওখানেই থেকে যেতে।

টেকো লোক খুঁজছিলাম রাস্তায় দাঁড়িয়ে। বন্ধুরাও ছিল। আগে বলতি- আমি মাথা কামিয়ে টেকো হয়ে যেতাম। রাস্তায় যাওয়ার কি দরকার ছিল? ফাজলামো করো। টাকাপয়সা খরচ করে লেখাপড়া শেখাচ্ছি টেকো লোক খোঁজার জন্য।

থমথমে পরিবেশ হালকা করার জন্য মায়ের দিকে তাকিয়ে বললাম, জানো মা, দুপুর থেকে রাত অবধি দাঁড়িয়ে থেকে একজন মাত্র টেকো লোক পেলাম। তাও পুরো টেকো নয়। লোকটিকে ডেকে নিয়ে দেখলাম, মাথাজুড়ে ১২টি চুল, হালকা বাতাসে বিদ্রোহ করছিল। মুখের ভেতর দু’টি দাঁত নেই। আহারে বেচারা!

১০০ টাকা অফার করেছি দলে ভেড়ানোর জন্য। রাজি হলো না। লোকটার জন্য মায়াও হলো। কোন পাগলের খপ্পরে পড়লাম বলে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইল। তাই ছেড়ে দিলাম।

মা এবার না হেসে পারল না। লোকটা বুঝল তোরা পাগল, আর তোরা বুঝলি না।

শেষমেশ লোক না পেয়ে রনিকে ন্যাড়া করে দিয়েছি। হতচ্ছাড়ার চুল পাতলা আগে বলবে না।

শুনছ। তোমার ছেলেকে ভূতে ধরেছে। ওঝা আনো।

বাবা এক চিলতে হাসি উপহার দিয়ে বলল, কি যা তা বলছ। বাঁদরকে কখনো ভূতে ধরে না।

ছোট্ট একটি বেড়ার ঘর। ঘরের গায়ে সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে ‘এখানে টেকো নিধন কর্মসূচি চলছে’।

সময় নষ্ট না করে এখনি চলে আসুন। আপনার টাক মাথায় লম্বা পরচুল লাগিয়ে টাককে বাঁচান।

ঘরের সামনে গুটিকয়েক চেয়ার পেতে হা হা হি হি করছে ওরা। আচানক একটি রিকশা এসে থামে ঘরের সামনে। বুঝতে বাকি রইল না কারো।

বুড়োর মাথায় চুল নেই বললেই চলে। দাঁতের অবস্থাও খারাপ। বাঁধাই করা দাঁত নিয়ে চলছে। দুপা এগিয়ে এসে বাহাদুরকে জিজ্ঞাসা করে, আচ্ছা এখানে...

হুম। ঠিক ধরেছেন। মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বিজ্ঞের জবাব বাহাদুরের। এখানে বসেন।

শুভ্রকে ইশারায় বলে, রেজিস্টার খাতাটি নিয়ে আয় জলদি। লোকটির দিকে তাকিয়ে বলে আপনারা যদি না আসেন তবে কারা আসবে। আপনি একদম ঠিক জায়গায় এসেছেন। আমার মায়ের ভাই মানে আমার মামা ফরেস্ট অফিসার। যেমন শক্তি, তেমন সাহস। দেখতে ঠিক অবিকল আপনার মতো।

আপনাকে আমি মামা বলেই ডাকব। কি বলেন মুরুব্বি।

কথা শুনে আনন্দে গদগদ বুড়ো লোকটি।

তাই ডেকো বাবা।

রেজিস্টার খাতা হাতে নিয়ে জানতে চায়, আপনার নাম কি?

কেবলি মজুমদার।

কেবলি ডাবলি বাদ দেন মামা। এখন থেকে আপনার নাম টেকো মজুমদার।

দুই মিনিটের মধ্যে মাথার হাতে গোনা যে কয়টা চুল ছিল সব কমিয়ে নিয়ে পরচুলা পরিয়ে দেয়া হয়।

বুড়ো তো আয়নায় নিজের চেহারা দেখে ভীষণ খুশি। এখন আর কেউ টাক মিয়া বলবে না। মাথাজুড়ে চুল।

মামা আপনার বিল হয়েছে ১২ হাজার ৫২৫ টাকা।

বুড়ো লোকটি এবার থতমত খেয়ে যায়। বলে, বাবারা আমি পানি খাব।

শুভ্র এক দৌড়ে পানি নিয়ে এলো। বুড়ো পানি খেতে গিয়ে হাত কাঁপতে শুরু করল। পানি খেয়ে বুড়ো জানতে চাইল- এখানে শাহেদ আলীর বাসা কোথায়?

বুড়োর মুখে বাবার নাম শুনে হতভম্ব হয়ে গেল বাহাদুর। আপনি কে বলেন তো?

আমি এক বাঁদর ছেলের হতভাগা মামারে। ফরেস্ট অফিসার। বাহাদুর রনি আর শুভ্রকে ডেকে ফিসফাস করে বলে বন্ধু, কেস খারাপ। ১৪৪ আর ৪২০ ধারা। সব ধীরে ধীরে কেটে পড়ো।

বাহাদুর বুড়ো লোকটার কানে কানে জানতে চাইল, আপনি এই বাড়িতে কিসের জন্য এসেছেন মামা?

একটু গলা কেশে ফাসা গলায় বলল, আমার বুবুর একটা বাঁদর ছেলে আছে। ওকে সুন্দরবন নিয়ে যেতে এসেছি।

কলিজা গুরদা পিত্তি সব হিম শীতল হয়ে যায় বাহাদুরের। ও আচ্ছা। বাহাদুরের চোখের সামনে ভেসে ওঠে হাজার হাজার বাঁদর ওকে নিয়ে টানাহেঁচড়া করছে। তাই দেখে বুড়ো মামা খলখল করে হাসছে। হ