গুমের মহাকাব্যিক বেদনা উন্মোচন জরুরি : চিফ প্রসিকিউটর

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেছেন, শহীদদের বীরত্বগাথা এবং গুমের ঘটনা প্রকাশ করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, এই ইতিহাসের কাহিনী ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষায় সচেতন করবে। গতকাল শনিবার বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে দৈনিক নয়া দিগন্তের ২১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

চিফ প্রসিকিউটর আরো উল্লেখ করেছেন, ‘প্রতিটি শহীদ ও গুমের ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক নয়, এটি জাতির ইতিহাসের অংশ। এগুলো এক এক করে তুলে ধরতে হবে, যাতে কেউ পুনরায় একই অবস্থা সৃষ্টি করতে না পারে।’ তিনি বলেন, জুলাই ও আগস্টের বিপ্লব এবং তরুণ প্রজন্মের সাহসের উদাহরণ দেশের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় যোগ করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং শহরের দেয়ালে লেখা গ্রাফিতি ও ছোট সে্লাগানগুলো এই প্রজন্মের ন্যারেটিভকে প্রতিফলিত করছে।

মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেছেন, আমরা গত স্বৈরশাসনের সময় অর্থাৎ, এক বছর আগে পর্যন্ত তার আগের সাড়ে ১৫ বছর যেভাবে ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়েছে বাংলাদেশে এবং সেই ন্যারেটিভ বাংলাদেশকে কোন খাদের কিনারে পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল, সেটা আমরা সবাই অবগত আছি। কিন্তু সেই জায়গায় আমাদের জেনারেশন জি, জেনারেশন জুম আসছে। আমাদের তরুণ প্রজন্ম তারা এটাকে যেভাবে ভেঙে দিয়েছেন, সেটা ছিল অভাবনীয়। এরকম ঘটনা শতাব্দীতে হয়তো দুই-একবার ঘটে বা একবার ঘটে। প্রতিদিন আমাদের এই জেনারেশন জি আমাদের অতীতের মিথ ভেঙে একটা বিপ্লব নিয়ে আসবে তা কিন্তু আমরা প্রত্যাশা করতে পারি না। সেই জন্য প্রতিনিয়ত আমাদের দায়িত্ব পালন করার ব্যাপার আছে।

গত সাড়ে ১৫ বছরে, (এক বছর আগে পর্যন্ত), সাংবাদিকতাকে তোষামোদের একটি শিল্পে পরিণত করা হয়েছিল। যে সাংবাদিকতার শাসকদেরকে কঠিন প্রশ্নবাণে জর্জরিত করার কথা ছিল, সেই সময় সাংবাদিকেরা তৈলমর্দনে ব্যস্ত ছিলেন। প্রশ্ন করেছেন : ‘আপনি নোবেল পুরস্কারের জন্য কেন লবিং করছেন না’? সাংবাদিকতাকে এই পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া এই কাজটা কিন্তু সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরশাসকদের সাফল্য ছিল; সবাইকে একই ন্যারেটিভে কথা বলাতে তারা সফল হয়েছিলেন। দৈনিক নয়া দিগন্ত এই জায়গায় কঠিন এক বিপ্লবী ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু আমি মনে করি, যা করেছেন তার বাইরেও উপস্থাপনগুলো আরো স্মার্ট হওয়া উচিত। দুনিয়াতে সারভাইভাল অব দ্যা ফিটেস্ট বলা হয় যে যোগ্যতম, সে-ই টিকে থাকবে।

আমাদের জেন-জি’র বিপ্লবের সময় আপনারা দেখেছেন, যে কথা আমরা অনেক ইনিয়ে বিনিয়ে বলতে যাই, তারা কত চমৎকারভাবে ছোট্ট সেøাগানের মধ্য দিয়ে, একটি গ্রাফিতির মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছে। তারা স্ট্রং ন্যারেটিভ তৈরি করেছে, ন্যারেটিভকে ভেঙেও দিয়েছে। এই ন্যারেটিভগুলো তৈরি হয় এই জমিনে, এই মাটির কৃষ্টি-কালচার, এই জনগণের বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে। পরবর্তী জেনারেশনের জন্য যে ন্যারেটিভ দরকার, প্রতিদিন সংবাদপত্রগুলো সেটা তৈরি করে। সেই জায়গায় যদি আপনার চিন্তা, আপনার উপস্থাপন স্মার্ট না হয়, তা হলে কিন্তু আপনি এক সময় ইতিহাসের পাতা থেকে ক্রমে হারিয়ে যাবেন।

যে জেনারেশন আমরা এখন আছি, পরবর্তী জেনারেশনের জন্য আমি কিন্তু ফিট নাও হতে পারি। যে জেনারেশন আগামী ১০ বছর, ১৫ বছর পরে দেশ শাসন করবে, তাদের চিন্তার জগৎ, তাদের নেটওয়ার্কিং, তাদের উপস্থাপন, সব কিছু উপস্থাপনার কর্মপদ্ধতিগুলো কিন্তু আলাদা।

জুলাই বিপ্লবের সময়ে আমার পুত্র যেহেতু আন্দোলনের মধ্যে একজন ছিল, তাদের নেটওয়ার্কিংগুলো লক্ষ্য করার চেষ্টা করেছি। যেগুলো আমাদের কল্পনারও বাইরে, সেইভাবে তারা যোগাযোগ মেনটেইন করেছে, পরিকল্পনা করেছে, রাস্তায় গ্রাফিতি এঁকেছে এবং মানুষকে সম্পৃক্ত করেছে। এটা যদি আমরা, আজকে নয়া দিগন্তের কথা বলছি, তারা যদি এটাকে ধারণ করতে না পারে, পাঁচ বছর পরে, ১০ বছর পরে হয়তো আপনারাও ইত্তেফাকের মতো বা পুরনো যে পত্রিকাগুলো ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে গেছে ক্রমে, সেরকম পর্যায়ে চলে যাবেন। কিন্তু আপনি যদি প্রতিনিয়ত নিজেকে অভিযোজনের মাধ্যমে এই জেনারেশনের মাইন্ডসেটের সাথে, তাদের প্রয়োজনীয়তার সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারেন, তা হলে আপনি দীর্ঘকাল বেঁচে থাকবেন, টিকে থাকবেন।

আমি আজকের এই পর্যায়ে এসে জুলাই বিপ্লবের অমর শহীদদের স্মরণ করি, শহীদ আনাসের কথা স্মরণ করি। তার ছোট্ট একটা চিঠি কীভাবে আমাদেরকে নাড়া দিয়েছে! মায়ের কাছে লিখে গেছে ১২ বছরের বাচ্চা, প্রতিবন্ধী যদি আন্দোলনে যেতে পারে, গুলি খেয়ে শহীদ হতে পারে, আমি কীভাবে ঘরে বসে থাকব? ‘যদি বেঁচে না ফিরি, গর্বিত হও।’ এমন কথা ক’জন বলতে পারে? ‘যদি বেঁচে না ফিরি’ ১০ বছরের বাচ্চা বলছে, মাকে বলছে: ‘তুমি গর্বিত হও।’ সেখানে আমরা ঘরে ফেরার জন্য কতই না কৌশল অবলম্বন করি, বেঁচে থাকার জন্য কতই না কৌশল অবলম্বন করি।

ইতিহাসের স্রোত তারাই পাল্টাতে পারে, যারা এইভাবে কথা বলতে পারে, জীবন দিতে পারে, মাঠে নামতে পারে, বিজয়টাকে অর্জন করতে পারে, ছিনিয়ে আনতে পারে।

আমাদের পত্র-পত্রিকাগুলো আগের সরকার গত সাড়ে ১৫ বছরে যে ভয়াবহ সংস্কৃতি, ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করেছিল বাংলাদেশে, সেগুলো কিন্তু ফুটিয়ে তুলতে পারেনি সঠিকভাবে। কিন্তু এখনও আজকের এই মুক্ত বাংলাদেশে এই বিষয়গুলোকে তুলে আনার বিশাল দায়িত্ব রয়েছে। প্রত্যেকটি গুমের ঘটনার পেছনে একটা মহাকাব্যিক বেদনার কাহিনী রয়েছে। এক এক করে সেগুলো এক্সপ্লোর করতে হবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য, যাতে কেউ কখনো এমন অবস্থা বাংলাদেশে সৃষ্টি করতে না পারে। জুলাই-আগস্টের প্রত্যেকটি শহীদের ঘটনা, শহীদদের পরিবারের সাথে কথা বলে, তার সহকর্মীদের সাথে কথা বলে দেখবেন আপনি এক গৌরবোজ্জ্বল বীরত্বগাথা দেখতে পাবেন। আমরা যদি তাদেরকে তুলে আনতে না পারি, তা হলে আমরা এই জেনারেশনের কথা কিন্তু বুঝতে পারব না এবং আগামীতে বাংলাদেশে নেতৃত্ব দেয়ার, আগামী দিনের বাংলাদেশে কোনো প্রাসঙ্গিক থাকার কোনো অধিকারও কিন্তু আমাদের থাকবে না।

যে মহাবিপ্লব হয়েছে জুলাই এবং আগস্টে, ভেতর থেকে কী পরিবর্তন হয়েছে, সেইটা আমাদেরকে উপলব্ধি করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে, ঢাকা শহরের দেয়ালে যে গ্রাফিতি, তাদের ভাষা, তাদের উপস্থাপন, তাদের মনের আকুতি আমাদেরকে বুঝতে হবে এবং সেই আলোকে ন্যারেটিভ তৈরি করতে হবে।

জেনারেশন জি’কে আমরা অপদার্থ ভেবেছিলাম। বলতাম, ‘এগুলো পাবজি খেলে, এইগুলো ফেসবুকে পড়ে থাকে, এইগুলো ফার্মের মুরগির মতো।’ কিন্তু এই বাচ্চাগুলো আবাবিল পাখির মতো কী বিশাল দানবীয় বাহিনী ছিল! আবাবিল পাখির মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লাঠি আর পাথর দিয়ে এক স্বৈরশাসককে শুধু চর্বিতঘাসের ন্যায় পিষেই ফেলেনি, তাকে দিল্লি পর্যন্ত তাড়িয়ে নিয়ে গেছে।

এটা একটা মহাকাব্যিক বিপ্লব। এটা জাতির প্রবাহমান রক্তস্রোতের সাথে আমাদেরকে মিশিয়ে নিতে হবে, যে এরকম বিপ্লব আমাদের সন্তানেরা করতে পারে। তাদের বীরত্বগাথা লিখে রাখতে হবে, সংরক্ষণ করতে হবে আগামী প্রজন্মের জন্য, যাতে কোনো দিন প্রয়োজন হলে আমাদের সন্তানেরা আবারো একইভাবে জেগে উঠতে পারে।

আজকের এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আপনাদেরকে অভিনন্দন জানিয়ে, আপনাদের দায়িত্বের কথাটি আরেকবার মনে করিয়ে দিয়ে মুক্ত বাংলাদেশে আবার আমরা সমৃদ্ধির সেই পর্যায়ে দেশকে নিয়ে যাব, মুক্ত বাতাসে আমরা বুক ভরে শ্বাস নেবো এবং বাংলাদেশ এমন একটি পর্যায়ে যাবে, যে দিন আমাদের মানুষেরা উচ্চ শিক্ষার জন্য, ব্যবসার জন্য ইউরোপ বা আমেরিকাতে যাবেন না। ইংরেজরা যেমন বাংলাদেশে এসেছে ব্যবসার প্রয়োজনে, সভ্যতা শেখার প্রয়োজনে এই বাংলা, সোনার বাংলা, আবার সেই পর্যায়ে বিশ্বের নেতৃত্ব দিবে। আমেরিকান, ইউরোপিয়ান, চাইনিজরা শিক্ষার জন্য, বাণিজ্যের জন্য, মেডিক্যাল সায়েন্সের জন্য, ঐতিহ্যের জন্য, স্থাপত্যকলার জন্য এই বাংলায় আবার ফিরে আসবে। সেই দিনের স্বপ্ন দেখে আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ।