মো: আল আমিন কিশোরগঞ্জ
রাজধানী ঢাকার বাইরে প্রথমবারের মতো জাতীয় মৎস্য পক্ষের উদ্বোধন হতে যাচ্ছে কিশোরগঞ্জে। এ উপলক্ষে আগামীকাল রোববার কিশোরগঞ্জে আসছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে জেলার মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ ও প্রত্যাশা। নির্বাচনের পর কিশোরগঞ্জে এটিই প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সফর। শুধু তা-ই নয়, কিশোরগঞ্জ জেলা শহরে তারেক রহমানের এটিই প্রথম সফর।
এ সফরে জেলার তিন উপজেলা সদর, কটিয়াদী ও পাকুন্দিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর বিভিন্ন কর্মসূচি রয়েছে। পাকুন্দিয়ায় পুরনো ব্রহ্মপুত্র নদে মাছের পোনা অবমুক্ত ও স্থানীয়দের সাথে শুভেচ্ছাবিনিময়, কটিয়াদীতে জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬ উদ্বোধন এবং সদর উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার কথা রয়েছে তার। এ ছাড়া শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দানে উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধনসহ আরো কয়েকটি কর্মসূচিতে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী।
তাই প্রধানমন্ত্রীর সফরকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা বেড়েছে। বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তাদের প্রত্যাশার বড় অংশজুড়ে রয়েছে হাওরের যোগাযোগব্যবস্থা, কৃষি ও মৎস্যভিত্তিক অর্থনীতি, শিল্পায়ন, চিকিৎসা ও পর্যটন। জেলা শহরের যানজট ও নরসুন্দা নদীর পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও তাদের প্রত্যাশার মধ্যে রয়েছে।
কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি এবং বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো: শরীফুল আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে জেলার সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। তারা আশা করছেন, এ সফরের মাধ্যমে কিশোরগঞ্জের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন ও মানুষের প্রত্যাশা বাস্তবায়নের সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।
কিশোরগঞ্জ শহর ও কটিয়াদীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে রাস্তা সংস্কার ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়েছে। সার্কিট হাউস সাজানো হয়েছে, জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তাব্যবস্থা। জেলাজুড়ে তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখতে এবং তার বক্তব্য শুনতে আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছেন সাধারণ মানুষ, নেতাকর্মী ও সমর্থকরা। এ প্রতিনিধিকে কিশোরগঞ্জের মানুষ জানিয়েছেন তাদের প্রত্যাশার কথা।
হাওরের যোগাযোগে উড়াল সড়ক
হাওরের মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি যোগাযোগব্যবস্থা। মিঠামইন থেকে করিমগঞ্জের মরিচখালী পর্যন্ত প্রস্তাবিত উড়াল সড়কটি নিয়ে তাদের আগ্রহ রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদের উদ্যোগে প্রকল্পটি নেয়া হয়েছিল। ২০২৩ সালে এটি একনেকে অনুমোদন পায়। পরে প্রকল্পটি বাতিল করা হয়। এখন স্থানীয় মানুষের বিরাট একটি অংশ প্রকল্পটি পুনর্বিবেচনার কথা বলছেন।
এ দিকে হাওরাঞ্চলের মানুষের পাশাপাশি ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক সড়ক চার লেনে উন্নীত করার দাবিও রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, ভৈরবের সাথে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ উন্নত হলে ব্যবসা-বাণিজ্য ও যাতায়াত দুই ক্ষেত্রেই সুবিধা বাড়বে। ঢাকায় যোগাযোগ করতেও মানুষের সুবিধা বাড়বে।
ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথ ডাবল লাইনে উন্নীত করার পাশাপাশি এই পথে আরো আন্তঃনগর ট্রেন চালুর দাবিও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
হাওরের কৃষি ও মৎস্য
কিশোরগঞ্জের হাওরে ধান ও মাছের উৎপাদন বেশি। কিন্তু উৎপাদিত এসব পণ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করার বড় অবকাঠামো নেই। স্থানীয় মানুষের মতে, হাওরাঞ্চলে কৃষি ও মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র গড়ে উঠলে এবং এ কেন্দ্রিক ইপিজেড গড়ে উঠলে কৃষক ও জেলেরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের ভালো দাম পাবেন। একই সাথে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
স্থানীয়দের মতে, হাওরকেন্দ্রিক মৎস্য হিমাগার ও সংরক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে মাছ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে আরো গতি আসবে। জাতীয় মৎস্য পক্ষের উদ্বোধন কিশোরগঞ্জে হওয়ায় এ খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর প্রত্যাশাও রয়েছে তাদের।
ভৈরবে শিল্পায়ন ও কিশোরগঞ্জে ইপিজেড
জেলায় কর্মসংস্থান বাড়াতে শিল্পায়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ। তাদের প্রত্যাশার মধ্যে রয়েছে কিশোরগঞ্জে একটি রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) স্থাপন এবং ভৈরবে বড় শিল্পকারখানা গড়ে তোলা। জেলার ব্যবসায়ীরা বলছেন, কিশোরগঞ্জের অর্থনীতিতে ভৈরবের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। সড়ক, রেল ও নৌযোগাযোগের সুবিধা কাজে লাগিয়ে সেখানে বড় শিল্পকারখানা গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। এ দিকটায় প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্ব দেয়া উচিত। এ ছাড়াও জেলা শহরের আশপাশে পরিকল্পিত শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠলে জেলার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।
কিশোরগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলোয়ার হোসেন দিলু বলেন, কিশোরগঞ্জে ইপিজেড স্থাপন জরুরি হয়ে পড়েছে। আশাকরি আমাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা প্রধানমন্ত্রী পূরণ করবেন।
স্থানীয়দের আরেকটি প্রত্যাশা করিমগঞ্জ, কুলিয়ারচর, বাজিতপুর ও কটিয়াদীকে গ্যাস সঞ্চালন লাইনের আওতায় আনা। তাদের মতে, শিল্পায়নের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কিশোরগঞ্জ টেক্সটাইল মিল চালু এবং কালিয়াচপড়া চিনিকল সচল করার বিষয়টিও স্থানীয়দের প্রত্যাশার তালিকায় রয়েছে।
হাওরবাসীর জন্য উন্নত চিকিৎসা
হাওরের মানুষের আরেকটি বড় সমস্যা চিকিৎসা। মিঠামইন, ইটনা ও অষ্টগ্রামের মতো এলাকার মানুষ গুরুতর অসুস্থ হলে অনেক সময় জেলা শহরে আসতে হয়। বর্ষায় নৌপথে রোগী পরিবহনে ভোগান্তি আরো বেড়ে যায়।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, হাওরের উপজেলা হাসপাতালগুলোতে জরুরি চিকিৎসা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অস্ত্রোপচারের সুবিধা থাকলে গরিবদের জেলা শহরে যেতে হতো না।
এ দিকে জেলা শহরের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল এবং শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বাড়ানোর কথাও বলেছেন জেলার বাসিন্দারা। তাদের মতে, এসব হাসপাতালে বিশেষায়িত চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতির সুবিধা বাড়লে জেলার মানুষকে ঢাকায় যেতে হবে কম।
হাওরকে পর্যটন অঞ্চল ঘোষণার দাবি
কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে পর্যটনের সম্ভাবনাও রয়েছে। বর্ষায় বিশাল জলরাশি দেখতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসে। স্থানীয়দের মতে, হাওরকে পর্যটন এলাকা হিসেবে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে পারলে এটি জেলার অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
দেশের বিভিন্ন স্থানের পাশাপাশি হাওরে ট্যুর পরিচালনা করে থাকে ‘তাবুট্যুর’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান। এর নির্বাহী পরিচালক জাফর হায়দার তুহিন বলেন, হাওরে পর্যটক আসছেন, কিন্তু প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নেই। থাকার ব্যবস্থা, নিরাপদ নৌযান, পর্যটনকেন্দ্র ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা গেলে পর্যটন থেকে স্থানীয় মানুষও আয় করতে পারবেন।
স্থানীয়দের মতে, মিঠামইন, ইটনা, অষ্টগ্রাম ও নিকলীকে ঘিরে একটি সমন্বিত পর্যটন পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। এতে পরিবেশ ও হাওরের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে হবে।
শহরের যানজট নিরসন ও নরসুন্দায় পানিপ্রবাহ
কিশোরগঞ্জ শহরের যানজটও মানুষের বড় দুর্ভোগ। শহরের বিভিন্ন সড়কে অটোরিকশার চাপ, যেখানে-সেখানে পার্কিং, ফুটপাথ দখল ও অপরিকল্পিত স্ট্যান্ডের কারণে যান চলাচল ব্যাহত হয়। শহরের ভেতরের অনেক সড়কও যানবাহনের চাপের তুলনায় সরু।
কিশোরগঞ্জ শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া নরসুন্দা নদীর পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশার মধ্যে রয়েছে। নদীটির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে এনে দখল ও দূষণ কমানোর উদ্যোগ চান তারা।
কর্মসংস্থান ও কৃষিপণ্যের বাজার
প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে জেলায় কৃষিভিত্তিক কর্মসংস্থান বাড়ানো এবং কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করাও মানুষের প্রত্যাশার মধ্যে রয়েছে। কৃষকদের অনেকে ফসল সংরক্ষণের জন্য আধুনিক গুদাম ও কোল্ড স্টোরেজের প্রয়োজনের কথা বলেছেন। তরুণদের একটি অংশ জেলায় কারিগরি প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানোর কথা বলেছেন।
কিশোরগঞ্জের তরুণ তরিকুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দরকার। প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের জেলায় কাজের সুযোগ পেলে তরুণদের জন্য ভালো হবে। বিগত জোট সরকারের সময় বেগম খালেদা জিয়া জেলার করিমগঞ্জ উপজেলায় ‘কিশোরগঞ্জ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট’ নামে একটি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন। এটির অবস্থা এখন বেহাল।
তার মতে, এ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটকে আরো উন্নত করার পাশাপাশি নতুন কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন এবং তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানো হলে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হবে। তার প্রত্যাশা প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়টির দিকে খেয়াল দেবেন।
প্রধানমন্ত্রীর সফরকে সামনে রেখে স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা, এসব বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া হবে এবং জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের প্রয়োজন অনুযায়ী উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে।
রাজশাহী মহানগর ও জেলা বিএনপি নেতাদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক
রাজশাহী ব্যুরো জানায়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিকে তৃণমূল পর্যায়ে আরো সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে রাজশাহী মহানগর ও জেলা শাখার নেতাদের সাথে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় গুলশানে চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন।
তিনি বলেন, ‘রাজশাহী বিভাগ, জেলা ও মহানগরীর নেতাদের সাথে সাংগঠনিক বিষয়াদি নিয়ে দলের চেয়ারম্যান বৈঠক করেছেন। এটা ধারাবাহিক বৈঠক।’
বৈঠকে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুন অর রশিদ, রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো: মাহফুজুর রহমান রিটনসহ রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলার নেতারা এতে উপস্থিত ছিলেন।


