জুলাইয়ে ৪১ জেলার ৪৩৮ স্থানে হত্যাযজ্ঞ

আন্দোলনকারীদের শনাক্ত করতে রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এনটিএসসি মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের অবস্থান চিহ্নিত করে হত্যা, জখম, গ্রেফতার ও অন্যায় আটকের মতো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition

জুলাই ২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে দেশের ৪১টি জেলায় ৪৩৮টি স্থানে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে এবং ৫০টিরও বেশি জেলায় সাধারণ আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে মারণাস্ত্র। এমন ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ দাখিলকৃত তদন্ত প্রতিবেদনে। গতকাল মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ এ তথ্য জানান সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মূল তদন্ত কর্মকর্তা মো: আলমগীর আলী। তিনি জানান, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দুই শীর্ষ সহযোগীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার তদন্তকালে তিনি এ তথ্য উদঘাটন করেছেন। এদিন আলমগীরের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে। জেরার জন্য আগামী ৬ অক্টোবর দিন ধার্য করেছেন। ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল।

তদন্তকারী কর্মকর্তা আলমগীর আদালতে দাখিলকৃত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, তৎকালীন সরকার আন্দোলন দমনের নামে যত খুন, জখম, অপহরণ ও নির্যাতন চালিয়েছে তার মূল উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতায় টিকে থাকা। গত ১৫ বছর ধরে সরকার ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য জঙ্গি নাটক, জোরপূর্বক অপহরণ ও পাতানো নির্বাচনের আশ্রয় নিয়েছে। জুলাই আন্দোলন ছিল সেই দীর্ঘ অবিচারের প্রতিক্রিয়ায় জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিরোধ।

তিনি আরো জানান, আওয়ামী লীগ সরকার যতবার ক্ষমতায় এসেছে, ততবারই তারা ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে সমস্ত অপকৌশল প্রয়োগ করেছে। এর ফলেই জুলাই ২০২৪-এ সব শ্রেণির মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনে অংশ নেয়।

হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা

আলমগীর আলীর জবানবন্দীতে বলা হয়, জুলাই অভ্যুত্থান চলাকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারদলীয় সশস্ত্র নেতাকর্মীরা দেশের কমপক্ষে ৪১টি জেলায় ৪৩৮টি স্পটে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছে।

এ ছাড়াও ৫০টিরও বেশি জেলায় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সরাসরি মারণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।

আন্দোলনকারীদের শনাক্ত করতে রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এনটিএসসি মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের অবস্থান চিহ্নিত করে হত্যা, জখম, গ্রেফতার ও অন্যায় আটকের মতো কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে।

তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আক্রমণকারী ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারদলীয় সশস্ত্র ক্যাডাররা, আর আক্রান্ত ছিলেন সাধারণ, নিরস্ত্র ছাত্র-জনতা। এ থেকেই প্রতীয়মান হয় যে, এটি ছিল পদ্ধতিগত, টার্গেটেড এবং ব্যাপক মাত্রার মানবাধিকার লঙ্ঘন।

ভিডিও সাক্ষ্য ও উচ্চপর্যায়ের সম্পৃক্ততা

২৭ জুলাই ২০২৪ তারিখে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে তোলা একটি ভিডিও প্রসঙ্গে জানানো হয়, ওয়ারী বিভাগের ডিসি ইকবাল তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মোবাইলে হত্যাকাণ্ডের ভিডিও দেখান। সেখানে স্বরাষ্ট্র সচিব জাহাঙ্গীর হোসেন ও তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন উপস্থিত ছিলেন।

ভিডিওতে ডিসি ইকবাল বলেন : ‘গুলি করি, মরে একটা, আহত হয় একটা, একটাই যায়, বাকিডি যায় না স্যার, এটাই সবচেয়ে আতঙ্ক ও দুশ্চিন্তার বিষয়।’

আদালতের সামনে তদন্ত কর্মকর্তা আলমগীর আলী বলেন, এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধগুলো হয়েছিল অভিযুক্তদের জ্ঞাতসারে।

এই ভিডিওসহ একটি পেনড্রাইভ আলামত হিসেবে জব্দ করে তিনি ট্রাইব্যুনালে দাখিল করেন।

আইনি ভিত্তি ও অভিযোগ

তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য ও সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস (ট্রাইব্যুনালস) অ্যাক্ট, ১৯৭৩-এর ৩(২)(এ), ৩(২)(জি), ৩(২)(এইচ), এবং ৪(১), ৪(২), ৪(৩) ধারায় অভিযোগ গঠনযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়। ২০২৫ সালের ১২ মে এই প্রতিবেদন বিচারিক প্রসিকিউটরের কাছে দাখিল করা হয়।

ট্রাইব্যুনালের মন্তব্য

আদালতে বিচারপতি মো: গোলাম মর্তুজা মজুমদার তদন্ত কর্মকর্তাকে প্রশ্ন করেন : ‘আসামিরা হত্যা বন্ধের জন্য কোনো পদক্ষেপ নিয়েছিল কি?’ জবাবে আলমগীর বলেন, ‘না, তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।’ বিচারপতি তখন বলেন : ‘তাহলে লিখতে হবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও নৃশংসতা বন্ধ করার জন্য আসামিগণ কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি।’

কল রেকর্ড ও ভিডিও প্রমাণ

১৮ মে ২০২৫, বেলা ১১টায় তদন্ত কর্মকর্তা শেখ হাসিনা এবং তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর মাকসুদ কামালের কথোপকথনের একটি কল রেকর্ড সিআইডি ঢাকা থেকে ট্রান্সক্রিপ্টসহ সংগ্রহ করে তদন্ত সংস্থার লাইব্রেরিয়ানে জমা দেন। পরে ৪ আগস্ট ২০২৫, বিবিসি বাংলার ইউটিউব চ্যানেলে প্রচারিত ‘৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ী, শেখ হাসিনার ফোন রেকর্ড’ শিরোনামে ৩৫ মিনিট ৩৫ সেকেন্ডের ভিডিও আদালতে উপস্থাপন করা হয়।

এই ভিডিওতে দেখা যায় : ৫ আগস্ট যাত্রাবাড়ীতে ৫২ জন নিহত, দুই হাজার ৪৪৪ রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। ভিডিও ধারণকারী মিরাজ নামে একজন আন্দোলনকারী পুলিশ গুলিতে সেদিনই মারা যান।

ভিডিওতে দাবি করা হয়- শেখ হাসিনা ১৮ জুলাই তাপসের সাথে কথোপকথনে হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোর নির্দেশ দেন।

১৯ জুলাই সেনাবাহিনীকে রাস্তায় নামানোর আদেশ দেন।

২২ জুলাই ব্যবসায়ীদের সাথে বৈঠক করেন।

১৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশ দেন।

আতিকের সাথে কথোপকথনে ঢাকার পরিস্থিতি আন্তর্জাতিকভাবে কিভাবে উপস্থাপন করা হবে তা নিয়ে আলোচনা করেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অমানবিক মন্তব্য

আদালতে উপস্থাপিত আরেকটি ৩ মিনিটের ভিডিওতে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন: ‘অনেক শিশু আন্দোলনে নিহত হয়েছে, আপনি কী বলবেন?’ তিনি উত্তর দেন : ‘যে বয়স ধরে আমরা একজনকে শিশু হিসেবে গণনা করি, তা ঠিক না।’

আলজাজিরা সম্প্রচারিত ভিডিও প্রতিবেদনে (শিরোনাম : ‘জুলাইয়ের ৩৬ দিন, উন্মোচিত হচ্ছে শেখ হাসিনার গোপন আদেশনামা’) শেখ হাসিনার গোপন রাজনৈতিক ও সামরিক নির্দেশনার বিশদ বিবরণ তুলে ধরা হয়, যা এই তদন্তে উপস্থাপিত অভিযোগের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তদন্ত কর্মকর্তা আলমগীর আলী আদালতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, ‘এই আন্দোলনে যারা আক্রমণ করেছে তারা ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারদলীয় ক্যাডার। আর যারা নিহত বা নির্যাতিত হয়েছে তারা সাধারণ, নিরস্ত্র ছাত্র-জনতা।’ এই তদন্তে উঠে আসা তথ্য, ভিডিও, অডিও ও কল রেকর্ড আদালতের সামনে উপস্থাপনের মাধ্যমে দাবি করা হয়, জুলাই ২০২৪-এর দমন-পীড়ন ছিল মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং তা পরিচালিত হয়েছে সরকারের উচ্চপর্যায়ের জ্ঞাতসারে ও নির্দেশে।

ট্রাইব্যুনালে গতকাল প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। সাথে ছিলেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ, আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্যরা।