জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে পালানো আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের একের পর এক সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার পর এবার আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন বানচালের নতুন ছক কষছে দলটি- এমন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক সূত্রে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকারকে উৎখাত করতে একাধিক প্রচেষ্টা চালানো হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থান ও রাজনৈতিক ঐক্যের কারণে সেসব পরিকল্পনা সফল হয়নি। ফলে এখন দলটির পলাতক নেতারা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ ও বানচাল করাকেই প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
দিল্লিতে প্রকাশ্য তৎপরতা, কূটনৈতিক অস্বস্তি
ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী, এমপি ও শীর্ষ নেতাকর্মীদের প্রকাশ্য রাজনৈতিক তৎপরতা দুই দেশের সম্পর্ককে আরো সংবেদনশীল করে তুলছে। সম্প্রতি দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র রক্ষা করুন’ (ঝধাব উবসড়পৎধপু রহ ইধহমষধফবংয) শীর্ষক এক সেমিনারে দলটির একাধিক পলাতক নেতা প্রকাশ্যে অংশ নেন।
সেমিনারে সরাসরি কিংবা ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসান মাহমুদ, সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত এবং সিরাজগঞ্জের সাবেক এমপি ডা: হাবিবে মিল্লাত। আওয়ামী লীগের পক্ষে পরিচিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকটিভিস্টরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের মাটিতে এভাবে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কার্যক্রম শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই নয়, বরং দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সম্পর্কেও অস্বস্তি তৈরি করছে।
শেখ হাসিনার অডিও ভাষণ ও পাঁচ দফা দাবি
সেমিনারে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি রেকর্ড করা অডিও ভাষণ শোনানো হয়। সেখানে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
* জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমে বিগত বছরের ঘটনাবলির ‘নিরপেক্ষ তদন্ত’
* আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন
* তথাকথিত ‘মব সংস্কৃতি’ ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ
* বিরোধী দল ও সাংবাদিকদের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করাই এই প্রচারণার মূল উদ্দেশ্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নির্বাচন বানচালের ছক : মাঠ ও অনলাইনে নাশকতা
একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানায়, নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগের পলাতক নেতৃত্ব বাংলাদেশে থাকা নেতাকর্মীদের উদ্দেশে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে, যেন কোনোভাবেই নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত না হয়।
পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে-
* নির্বাচনের আগে ও ভোটের দিন নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড
* ছদ্মবেশে প্রচার-প্রচারণায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি
* সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর ভিডিও প্রচার
* গ্রেফতার এড়াতে অটোরিকশা, সিএনজি ও রাইড শেয়ার চালক সেজে আত্মগোপনে থাকা
* টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে গোপন সমন্বয়
সূত্র জানায়, এসব কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অর্থের জোগান দিচ্ছেন বিদেশে অবস্থানরত সাবেক নেতা, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা।
বিশেষ করে লন্ডনে বসে লবিস্ট নিয়োগ করে আন্তর্জাতিক মহলে তৎপরতা চালাচ্ছেন সিরাজগঞ্জের সাবেক এমপি ডা: হাবিবে মিল্লাত। তিনি একাধিক মার্কিন আইনপ্রণেতার সাথে যোগাযোগ রেখে আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে।
তৃণমূলে ক্ষোভ, ঢাকামুখী ঝটিকা মিছিলের পরিকল্পনা
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তারা অভিযোগ করছেন- দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকে সুবিধা নেয়া সিনিয়র নেতারা বিদেশে নিরাপদে থাকলেও দেশে থাকা কর্মীরা মামলা ও গ্রেফতারের মুখে পড়ছেন।
এই পরিস্থিতিতে অনেক নেতাকর্মী নিজ নিজ এলাকায় সক্রিয় না থেকে ঢাকায় এসে ছদ্মবেশে ঝটিকা মিছিল ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির পরিকল্পনা করছেন। তবে তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন- অর্থের জোগান ছাড়া কোনো কার্যক্রম সম্ভব নয়।
যেভাবে আগের সব পরিকল্পনা ভেস্তে যায়
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মাধ্যমে ঝটিকা মিছিল শুরু হয়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে ঢাকায় লাখো লোক জড়ো করে শেখ হাসিনাকে ফেরানোর পরিকল্পনাও করা হয়। ‘ধানমন্ডি ৩২’ নামে একটি টেলিগ্রাম গ্রুপ থেকে নিয়মিত নির্দেশনা দেয়া হতো।
কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অভিযান, ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় ভূমিকা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের কারণে এসব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে জুলাই-আগস্টে ককটেল বিস্ফোরণ, পুলিশের ওপর হামলা ও নাশকতার চেষ্টা বাড়লেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সরকার অপারেশন ‘ডেভিল হান্ট’ চালু করে।
সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির সমন্বিত অভিযানে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামো কার্যত ভেঙে পড়ে।
নির্বাচন ঘিরে কঠোর প্রস্তুতি
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়, আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশে যে কোনো ধরনের নাশকতা কঠোরভাবে দমন করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, আগের সব পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ায় আওয়ামী লীগের নতুন ছকও সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ বাড়তে পারে- এ জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সতর্ক থাকতে হবে।



