ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। ভোট যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সহিংসতার মাত্রা। দেশের বিভিন্ন জেলায় হামলা, ভাঙচুর, গুলি, গণপিটুনি, প্রাণহানিসহ রক্তক্ষয়ী ঘটনার সংখ্যা বাড়তে থাকায় নির্বাচনকে ঘিরে জনমনে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং প্রতিপক্ষকে দমন করার প্রবণতা নির্বাচনের পরিবেশ কতটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ থাকবে- তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে শেষ সময়টিতে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। তফসিল ঘোষণার পর থেকেই প্রার্থী ও সমর্থকদের সভা-সমাবেশ, গণসংযোগ এবং নির্বাচনী কার্যালয়ে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনা বেড়েছে। কোথাও প্রকাশ্যে গুলি, কোথাও লক্ষ্য করে হত্যাকাণ্ড- এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার সারা দেশে পুলিশের পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) মোতায়েনসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়িয়েছে। তবুও মাঠপর্যায়ে উত্তেজনা কমার বদলে অনেক জায়গায় তা বাড়ছে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সহিংসতা কেন বাড়ছে?
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার ও শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতাই সহিংসতার অন্যতম কারণ। তফসিল ঘোষণার পর বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব ধরে রাখা এবং প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করতে হামলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা বাড়ছে।
অন্য দিকে, একই দল বা জোটের ভেতরেও মনোনয়নকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে সংঘর্ষ ঘটছে। স্থানীয় আধিপত্য, চাঁদাবাজি ও ভোটকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়ও সহিংসতার পেছনে কাজ করছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, গণপিটুনি সংস্কৃতি এবং বিচারহীনতার ধারাবাহিকতাও অপরাধীদের উৎসাহিত করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
‘দুই ধরনের শঙ্কা’ : নির্বাচনকালীন নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব:) এমদাদুল ইসলাম বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে দুই ধরনের শঙ্কা রয়েছে। প্রথমত, এটি পুরোপুরি অন্তর্ভুুক্তিমূলক নির্বাচন হচ্ছে না। যারা বাদ পড়েছে, তারা অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। দ্বিতীয়ত, অতীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। এসব অস্ত্র অপরাধীদের হাতেই রয়েছে। এগুলো উদ্ধার না হলে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে।’
তার মতে, নির্বাচনের সময় এই অবৈধ অস্ত্র বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মাঠে রক্তক্ষয়ী ঘটনা : সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন জেলায় একাধিক প্রাণঘাতী ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে হামলায় এক রাজনৈতিক নেতা নিহত হন। রাজধানীর পল্টনে নির্বাচনী প্রচারণার সময় প্রকাশ্যে হত্যাকাণ্ড, কাওরান বাজারে গুলিতে রাজনৈতিক কর্মী নিহত, চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতাকে গুলি করে হত্যা- এমন ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছে।
এ ছাড়া কক্সবাজারে এক প্রার্থীকে কাফনের কাপড় পাঠিয়ে হুমকি দেয়া, মিরপুরে নারীকর্মীদের গণসংযোগে হামলা, কদমতলীতে নারীকে কুপিয়ে আহত করা, চুয়াডাঙ্গায় নারী কর্মীর সায়া খুলে নেবার হুমকির মতো ঘটনাও ঘটেছে। অনেক এলাকায় নির্বাচনী কার্যালয় ভাঙচুর ও লাঠিসোঁটা নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আশ্বাস : পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অতীতের নির্বাচনেও সহিংসতা হয়েছে। এবারের নির্বাচনেও কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে। তবে সব ঘটনায় আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাবসহ সব বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। নি-িদ্র নিরাপত্তার মধ্যেই নির্বাচন সম্পন্ন হবে।’
তিনি আরো বলেন, সব ঘটনা সরাসরি নির্বাচনকেন্দ্রিক নয়; কিছু সাধারণ অপরাধও রয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে উদ্বেগজনক চিত্র : মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত জানুয়ারি মাসেই নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৬৪টি। এতে চারজন নিহত ও ৫০৯ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে গণপিটুনিতে প্রাণ গেছে ২১ জনের। অজ্ঞাত লাশ, কারা হেফাজতে মৃত্যু এবং সীমান্তে গুলিবিদ্ধের ঘটনাও বেড়েছে। ডিসেম্বরের তুলনায় এসব ঘটনার হার দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সারা দেশে ৯১৪টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৩৩ জন নিহত ও সাড়ে সাত হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। একই সময়ে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন অন্তত ১৬৮ জন।
পুলিশ সদর দফতরের হিসাবে, গত বছরের জানুয়ারি মাসেই ২৭৬টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ রাজনৈতিক সহিংসতার সাথে সম্পর্কিত।
অবৈধ অস্ত্র বড় ঝুঁকি : মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: ওমর ফারুক বলেন, ‘লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার হয়নি। এগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার হচ্ছে। ভয়ভীতি সৃষ্টি করে চাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তারে এসব অস্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে।’
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘সুষ্ঠু নির্বাচনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। কিন্তু অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি না কমলে এর প্রভাব নির্বাচনের মাঠে পড়বেই। নাগরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আগে অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাস নিয়ন্ত্রণ জরুরি।’
নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন : বিশ্লেষকদের মতে, আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের দৃশ্যমান ও কঠোর ব্যবস্থা না থাকায় সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আসছে না। সময়মতো নজরদারি, দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও প্রার্থী-সমর্থকদের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন ভোটারদের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনা। মানুষ যদি ভয়ে ভোটকেন্দ্রে না যায়, তাহলে নির্বাচন সুষ্ঠু হলেও তার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
তাদের মতে, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, সহিংসতার দ্রুত বিচার, নিরপেক্ষ নিরাপত্তা বলয়, আচরণবিধি কঠোর প্রয়োগ, রাজনৈতিক সংলাপ- এসব পদক্ষেপই পারে উত্তেজনা কমাতে।
শেষ পর্যন্ত, নির্বাচন কেবল ভোটের দিন নয়-পুরো প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে তার গ্রহণযোগ্যতা। আর সেই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে রয়েছে নিরাপত্তা ও আস্থা। তা নিশ্চিত না হলে গণতন্ত্রও ঝুঁকির মুখে পড়বে- এমন সতর্কবার্তাই দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা।



