- কারিগরি প্রশিক্ষণে আরো ২০ টিটিসি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে
- আগামী এক বছরে জাপানে এক কোটি কর্মীর চাহিদা
- মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও বাড়ছে আগ্রহ
বিশ^ শ্রমবাজারের চাহিদা বিবেচনায় পাঠ্যবইয়ে অর্থাৎ শিক্ষা কারিকুলামে যুক্ত হচ্ছে দক্ষতা আর বিদেশী ভাষাজ্ঞানের নতুন অধ্যায়। শুধু কর্মে দক্ষতা আর যোগাযোগে ভাষাজ্ঞানের দুর্বলতার কারণেই চাহিদামতো বিদেশে কর্মী পাঠাতে পারছে না বাংলাদেশ। আবার অদক্ষ কর্মী পাঠালেও অন্য দেশের তুলনায় কম মজুরিতে কাজ করতে হয় বাংলাদেশীদের। বিদেশে কর্মরতদের দু’টি ঘটনায় আমাদের দেশের শ্রমিকদের দুর্দশার এমন চিত্র ফুটে উঠেছে। কাতারের একটি শহরের রেস্টুরেস্টে দীর্ঘ ছয় বছরের বেশি সময় ধরে শ্রমিকের কাজ করেন চাঁদপুরের মিজান। বেতন বাংলাদেশী ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকার মতো। প্রতিদিন তাকে যে পরিমাণ শ্রম দিতে হয় তার সমপরিমাণ কাজ করেই পাকিস্তানের এক যুবক শুধু ভাষাজ্ঞান থাকায় মাসে বেতন পান লাখ টাকার উপরে। পদ পদবীও আলাদা। একজন শ্রমিক অন্যজন ম্যানেজার।
এটা তো গেল ভাষাজ্ঞানের পার্থক্য। ঠিক একইভাবে কাজ জানা কিংবা না জানার কারণেও এমন অসংখ্য বাংলাদেশী হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে শুধু শ্রমিক শ্রেণীর কাজ করে বেতন পান খুবই সামান্য। অন্য দিকে কিছু টেকনিক আর হাতে কলমে কাজ জানার কারণে পাশর্^বর্তী ভারত, শ্রীলঙ্কা কিংবা পাকিস্তান বা নেপালের মতো দেশের কর্মীরা। বাংলাদেশীদের তুলনায় দ্বিগুণ কিংবা তিনগুন বেশি বেতন পাচ্ছে। অবশ্য এ বিষয়ে অনেক লেখালেখি কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ থাকার পরও দীর্ঘদিনে তেমন কোনো ভালো ফল আসেনি। এখন তাই বাধ্য হয়েই দেশের কারিকুলামে বিশেষ করে শ্রমিকদের ভাষাজ্ঞানের তাগিদ দেয়া শুরু হয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, জাপানী ভাষায় দক্ষতা বাড়াতে একটি প্রকল্প নিয়ে ইতোমধ্যে কাজ শুরু হয়েছে। বিভিন্ন ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে তরুণ শিক্ষিত যুবকদের দক্ষতা বাড়ানোর কাজ শুরু হয়েছে। জাপান সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী একবছরে বাংলাদেশ থেকে শুধু জাপানী ভাষা জ্ঞানে দক্ষ এক লাখ শ্রমিক নেয়া হবে। একই সাথে মধ্যপ্রচ্য এবং ইউরোপের অনেক দেশও কাজ জানা এবং কারিগরি দক্ষ লোকবল বাংলাদেশ থেকে নিতে চায়। যদিও মাধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ এবং ইউরোপের কিছু দেশেও অসংখ্য বাংলাদেশী শ্রমিক প্রতি বছরই যাাচ্ছে। শুধু তাদেরকে কিছু বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে তুলতে পারলেই দ্বিগুণের বেশি রেমিট্যান্স অর্জন করা সম্ভব হবে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজতৈনিক পট-পরিবর্তনের পর থেকেই দেশের শিক্ষা কারিকুলাম এবং বিদেশে দক্ষ শ্রমিক পাঠানোর জন্য নানাদিক থেকে জোর তৎপরতা শুরু হয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপি সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে নতুন শিক্ষামন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রী শিক্ষা কারিকুলাম এবং দক্ষ জনশক্তি গঠনের উপর বেশ তৎপরতা শুরু করেছেন। ইতোমধ্যে তারা কারিকুলামে আমূল পরিবর্তন আনারও ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ইতোমধ্যে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, দেশের বিপুল জনসংখ্যাকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষাকে আধুনিক, যুগোপযোগী এবং বাজারের চাহিদাভিত্তিক করতে চাই। এ লক্ষ্যে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ জোরদার করা, ইন্ডাস্ট্রি ও একাডেমিয়ার মধ্যে শক্তিশালী সংযোগ তৈরি করা এবং কারিকুলাম ও সিলেবাস আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। এ বিষয়ে গত বুধবার কারিগরি শিক্ষা অধিদফতরের সভাকক্ষে অধিদফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় দেশের উন্নয়ন ও মানবসম্পদ গঠনে সবার আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে কাজ করার বিষয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
শিক্ষামন্ত্রী জানান, কারিগরি শিক্ষার বিভিন্ন সূচক ও কেপিআই (কি পারফরম্যান্স ইন্ডিকেটরস) প্রাথমিকভাবে পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে বিষয়গুলো আরো গভীরভাবে অধ্যয়ন করে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ, শিল্পখাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় এবং বাজারমুখী কারিকুলাম প্রণয়নের ক্ষেত্রে কিছু দুর্বলতা রয়েছে, যা দ্রুত দূর করতে হবে।
তিনি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে বলেন, প্রত্যেকে নিজ নিজ বিভাগ, প্রকল্প ও প্রতিষ্ঠানে কী কী উন্নয়নমূলক উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন তা নিজ উদ্যোগে নির্ধারণ করবেন। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার অপেক্ষায় না থেকে সৃজনশীলতা ও উদ্যোগের মাধ্যমে কাজ করার আহ্বান জানান।
মন্ত্রী আরো বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়, কারণ এখান থেকেই দেশের মানবসম্পদ তৈরি হয়। দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষকে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা একটি বড় দায়িত্ব। বাংলাদেশের বিপুল জনসংখ্যাকে সঠিকভাবে দক্ষতায় রূপান্তরিত করা গেলে এটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। তিনি বলেন, কারিগরি, ভোকেশনাল এবং পলিটেকনিকসহ কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অতিরিক্ত তাত্ত্বিক শিক্ষার পরিবর্তে ব্যবহারিক ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য কারিকুলাম ও প্রশিক্ষণব্যবস্থার যথাযথ পর্যালোচনা প্রয়োজন।
অপর দিকে মন্ত্রী আরো জানান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সমন্বয় জোরদার করে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর সুযোগ আরো সম্প্রসারণ করা হবে। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে জনসংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে, অন্য দিকে বাংলাদেশ জনসংখ্যার দিক থেকে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। এ জনশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা গেলে বাংলাদেশ বিশ্বে একটি শক্তিশালী মানবসম্পদসমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষিত দেশে ব্যাপকভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য বাস্তবায়নে কারিগরি শিক্ষা খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ লক্ষ্যে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান শিক্ষামন্ত্রী।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বাংলাদেশে তরুণদের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩০ শতাংশ। এই তরুণ শক্তি যদি সঠিক দিকনির্দেশনা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং ব্যবহারিক দক্ষতায় সমৃদ্ধ হয়, তবে তারা শুধু নিজেদের জীবন নয়, দেশের অর্থনীতি এবং সমাজকে নতুন দিগন্তে পৌঁছে দিতে সক্ষম হবে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষ জনশক্তি বৃদ্ধি পেলে উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায় এবং জাতীয় আয়ের হারও দৃঢ়ভাবে উন্নীত হয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, কারিগরি শিক্ষায় অংশগ্রহণের হার ক্রমবর্ধমান। এটি তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনার সোপান খুলছে। দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া এবং ভিয়েতনামের মতো উদাহরণ প্রমাণ করে যে, কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ দেশের অর্থনীতিকে দ্রুত প্রতিযোগিতামূলক এবং স্থিতিশীল করে তোলে। এই শিক্ষার মাধ্যমে তরুণরা কেবল কর্মমুখী দক্ষতা অর্জন করে না, বরং সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী মনোভাব এবং আত্মবিশ্বাসও অর্জন করে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দক্ষ জনশক্তি যেকোনো শিল্পের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করতে পারে। বাংলাদেশের রফতানি শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি খাত এবং উৎপাদনশীল ক্ষেত্রগুলো ইতোমধ্যেই কারিগরি শিক্ষায় প্রশিক্ষিত জনশক্তির প্রভাবে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করছে। ২০২২ থেকে ২০২৩ অর্থবছরে দক্ষ জনশক্তি রেমিট্যান্স আয়ের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে নতুন প্রজ্বলিত আলো যোগ করেছে, যা দেশের উন্নয়নের নতুন মাত্রা সৃষ্টি করছে। সরকারের ঝশরষষং ভড়ৎ ঊসঢ়ষড়ুসবহঃ ওহাবংঃসবহঃ চৎড়মৎধস ইতোমধ্যে লাখ লাখ তরুণকে কারিগরি ও ব্যবহারিক দক্ষতায় সজ্জিত করতে কাজ শুরু হয়েছে।
সর্বশেষ তথ্যমতে জাপানের বিশাল শ্রমবাজারে বাংলাদেশের দক্ষ জনশক্তি রফতানির লক্ষ্যে রাষ্ট্রক্ষমতায় দায়িত্ব নিয়েই বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২০৪০ সালের মধ্যে জাপানে প্রায় এক কোটি ১০ লাখ তরুণ শ্রমিকের চাহিদাকে সামনে রেখে বাংলাদেশের প্রায় ২৩ লাখ অতিরিক্ত যুব শক্তিকে দক্ষ করে গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি ‘আনন্দময় ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি’ বিষয়ক এক সভায় প্রধানমন্ত্রী এই আগ্রহ প্রকাশ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের ফলোআপ বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের ২০টি কার্যক্রম প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত, যা এখন জাতীয় কর্মসূচিতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে অদক্ষ শ্রমিকের বদলে দক্ষ ও আধা-দক্ষ জনশক্তি রফতানির ওপর জোর দিচ্ছে সরকার। জাপানি ভাষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণের জন্য বিদ্যমান ৩৩টি টিটিসি’র (ঞবপযহরপধষ ঞৎধরহরহম ঈবহঃবৎ) সাথে আরো ২০টি যোগ করে মোট ৫৩টি কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।


