আবদুল মোমেন কমিশনের পদত্যাগের পর প্রায় চার মাস পার হলেও এখনো দুদক কমিশন গঠন হয়নি। অর্থাৎ চার মাস ধরে অভিভাবকশূন্য দুদক। ফলে দুর্নীতিবিরোধী সরকারি এই সংস্থায় অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত, মামলা, চার্জশিট, আসামি গ্রেফতার, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে অভিযান, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও ফ্রিজ, সংশ্লিষ্টদের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি চূূড়ান্ত করাসহ সব সিদ্ধান্ত থমকে আছে।
তবে আশার কথা হলো- গত ২২ জুন দুদকে চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগে আপিল বিভাগের বিচারপতি মো: রেজাউল হককে সভাপতি করে সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত তাদের প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি কিংবা কমিশন গঠনে কারো নামের সুপারিশ রাষ্ট্রপতির কাছে যায়নি। তবে বিভিন্ন মাধ্যমে কয়েকজন সাবেক আমলা, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও বিচার বিভাগের বেশ কিছু নাম আলোচিত হচ্ছে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুদকের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, কমিশন নেই প্রায় চার মাস পেরিয়ে গেছে। কমিশন না থাকলে দুদকে কোনো কাজ হবে না, এটাই স্বাভাবিক। কারণ সব সিদ্ধান্ত দেয় কমিশন। দুদকের ইতিহাসে কখনো এত দীর্ঘদিন চেয়ারম্যান ও কমিশনার অনুপস্থিত থাকেননি। যত দ্রুত সম্ভব কমিশন গঠন জরুরি।
কমিশন গঠনে আলোচনায় যারা
নতুন কমিশনে চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে গত তিন মাস ধরেই সাবেক কয়েকজন আমলা ও বিচারকের নাম আলোচিত হচ্ছে। যদিও নামের সুপারিশ করবে সার্চ কমিটি। তারা প্রতিটি পদের বিপরীতে দু’টি করে নাম সুপারিশ করবে। যেখান থেকে রাষ্ট্রপতি তিনজনকে নিয়োগ দেবেন।
বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যানুসারে, চেয়ারম্যান ও কমিশনার হিসেবে গত কিছুদিন ধরেই সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩-এর সাবেক বিচারক মোতাহার হোসেনের নাম। এ ছাড়া সাবেক বিচারপতি আসাদুজ্জামান ও সাবেক জেলা জজ রুহুল কুদ্দুসের নামও আলোচিত হচ্ছে।
অন্য দিকে অবসরপ্রাপ্ত সাবেক সচিব আবদুস সবুর, সাবেক অতিরিক্ত সচিব তাহসিনুর রহমান, ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যান ড. মো: সাজ্জাদ হোসেনের নামও শোনা যাচ্ছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আবদুস সাত্তারের নামও আলোচিত হচ্ছে।
এর মধ্যে সাবেক বিচারক মোতাহার হোসেন ঢাকা মহানগর আদালতে সিনিয়র স্পেশাল জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষ আদালতের বিচারক হিসেবে তিনি দুর্নীতি, আর্থিক অপরাধ এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ মামলার বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন।
আলোচনায় আরো এসেছে সাবেক যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ খন্দকার আবুল হোসেনের নামও। এ ছাড়া দুদকের সাবেক মহাপরিচাক (ডিজি) প্রশাসন ক্যাডারের মুনীর চৌধুরীর নামও এসেছে।
কমিশন গঠনে সার্চ কমিটি
দুদক কমিশনার ও চেয়ারম্যান নিয়োগে গত ২২ জুন সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। ওই দিনই এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। সার্চ কমিটির সভাপতি করা হয়েছে আপিল বিভাগের বিচারপতি মো: রেজাউল হককে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি রাজিক আল জলিল, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি), সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, দুদক আইন, ২০০৪-এর ধারা ৭ অনুযায়ী কমিশনার পদে নিয়োগের জন্য সুপারিশ প্রদানের উদ্দেশ্যে সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, সার্চ কমিটি দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনারের প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে ন্যূনতম দুইজন করে প্রার্থীর নামের তালিকা প্রস্তুত করে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করবে। পরে রাষ্ট্রপতি সেখান থেকে চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ দেবেন।
অন্য দিকে নতুন কমিশন গঠনের প্রত্যাশা সম্পর্কে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুদক আইন, ২০০৪ অনুযায়ী কমিশন গঠনের লক্ষ্যে যে সার্চ কমিটি গঠিত হয়েছে, তা নিয়ে কিছু আইনি প্রশ্ন রয়েছে। আইন অনুযায়ী সার্চ কমিটিতে কার্যরত ক্যাবিনেট সচিবের থাকার কথা নয়; বরং সেখানে সদ্য সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিবের থাকার কথা ছিল। এই আইনি ব্যত্যয় বা নিয়মের বিচ্যুতির পেছনে কী কারণ ছিল, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। দুদকের প্রতি জনমানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক বা দলীয় বিবেচনার ঊর্ধ্বে উঠে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা জরুরি।
দুদকের আইন সংস্কার ও কার্যকর দুদক প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুদকের সংস্কারের জন্য অধ্যাদেশ বা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয়া হলেও, তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। মুখে বা কাগজে-কলমে দুদককে শক্তিশালী করার কথা বলা হলেও, বাস্তবে তার কাজের স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা নিশ্চিত করাই আসল চ্যালেঞ্জ। দুদক সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোকে মূল ভিত্তি হিসেবে ধরে যদি নতুন আইন বা সংস্কার করা হয়, তবেই একটি কার্যকর দুদক প্রতিষ্ঠা সম্ভব। অন্যথায় এটি কেবলই একটি আনুষ্ঠানিকতায় রূপ নেবে। দুদককে সত্যিকার অর্থে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে সরকারের সদিচ্ছা এবং আইনি সংস্কারের যথাযথ প্রতিফলন অত্যন্ত জরুরি।



