আওয়ামী আমলে একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ভারতের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছে : সালাহউদ্দিন আহমেদ

Printed Edition

ঢাবি প্রতিনিধি

আওয়ামী লীগ শাসনামলে দেশের একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী, লেখক ও মিডিয়া কর্মী ভারতের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ।

তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার ও ভিনদেশী রাষ্ট্রের প্রতি অন্ধ আনুগত্য থেকে বিগত দেড় দশকে বাংলাদেশে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বৃত্তায়ন ঘটেছে।

গতকাল সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী ভবনে সাদা দল আয়োজিত ‘বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শিক্ষার রূপান্তর : একটি কৌশলগত রোডম্যাপ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী দীর্ঘ দিন ধরে ভারতনির্ভর বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছেন, যা দেশের স্বাধীন বুদ্ধিচর্চা ও সমালোচনামূলক চিন্তাকে ক্ষয় করেছে। যেসব বুদ্ধিজীবীর অতীতে রাষ্ট্রীয় অন্যায়, নাগরিক নিপীড়ন বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কথা বলার কথা ছিল, তারাই ভারতপন্থী রাজনৈতিক বয়ানের সুবিধাভোগী হয়ে নীরব থেকেছেন।

দেশের বর্তমান শিক্ষা ও বুদ্ধিজীবী পরিস্থিতির সাথে ব্রিটিশ আমলের তুলনা করে সালাহউদ্দিন বলেন, ব্রিটিশরা তাদের শাসন দীর্ঘায়িত করতে যেমন শিক্ষিত সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করত, তেমনি বিগত সময়েও কিছু বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়া আধিপত্য বজায় রাখতে বুদ্ধিভিত্তিক চর্চা সীমিত করেছিল। ফলে গণতান্ত্রিক ও সৃজনশীল চেতনার বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে।

ভবিষ্যৎ শিক্ষাব্যবস্থা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য আধুনিক যুগের চাহিদার সাথে মিল রেখে নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলা। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, রোবোটিকস, ডেটা সায়েন্স ও বায়োটেকনোলজির মতো ক্ষেত্রে মানবসম্পদ তৈরি করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু চাকরি তৈরি করবে না; বরং গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্র হবে।

জুলাই সনদ ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশন প্রসঙ্গে বলেন, জাতীয় ঐকমত্যের নামে অনৈক্য তৈরির চেষ্টা হয়েছে। তবে আমরা নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিষয়টিকে ধন্যবাদ জানিয়েছি। জাতীয় সার্বভৌমত্বকে কখনো কোনো আদেশ দিয়ে বাধ্য করা যায় না। কারণ দেশের সর্বোচ্চ সার্বভৌমত্ব হলো জাতীয় সংসদ। মানুষ ভোট দিয়ে তার প্রতিনিধি নির্বাচিত করে। জুলাই সনদে গণভোট নিয়ে যেসব প্রশ্ন করা হয়েছে তাতে মনে হয় পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করা লোকেরাও সেটি পড়তে অনেক সময় লাগবে।

নির্বাচন প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, শেষ পর্যন্ত সবাইকে জনগণের কাছে যেতে হবে নির্বাচনের জন্য। কারণ আমরা গত ১৫/১৬ বছর আন্দোলন করেছি একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য। দেশের মানুষ ভোটের জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে এমন একটি জাতি ও দেশ তৈরি করতে হবে যাতে কোনো ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচারের উত্থান না ঘটে। স্বাধীন বিচার বিভাগ, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে। তবে স্বৈরাচারের দোসরদের বহাল রেখে স্বাধীন বিচার বিভাগ সম্ভব নয়।

শিক্ষা সংস্কার কমিশন না হওয়ায় সভাপতির বক্তব্যে সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক মোর্শেদ হাসান খান বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শিক্ষাব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে রাস্তায় নামতে হয়েছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ১১টি সংস্কার কমিশন গঠন করলেও শিক্ষা সংস্কারে কোনো কমিশন গঠন করেনি, যা হতাশাজনক।

শিক্ষায় কাঠামোগত দুর্বলতা ও ব্রেইন ড্রেন-এর বিষয় উল্লেখ করে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক এ বি এম ওবাইদুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা সব স্তরেই মৌলিক দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা আনন্দদায়ক না হয়ে বোঝায় পরিণত হয়েছে। আর ল্যাবরেটরিতে যন্ত্রপাতির অভাব ও তহবিলের সঙ্কটে মানসম্মত গবেষণা হচ্ছে না।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শাহ শামীম আহমেদ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক মহিউদ্দিন। সাদা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক আব্দুল সালামের সঞ্চালনায় সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন- আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক এম এ কাউসার ও সদস্যসচিব অধ্যাপক ড. মহিউদ্দিন, স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটির ভিসি অধ্যাপক ড. আখতার হোসেন খান, ঢাবির কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান, প্রক্টর অধ্যাপক ড. সাইফুল্লাহ, ঢাবির ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক আতাউর রহমান বিশ্বাস, অধ্যাপক আতাউর রহমান মিয়াজী, ড. মো: নূরুল আমিন, চারুকলা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক সঞ্জয় দে রিপন, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি অধ্যাপক ড. শহীদুল ইসলাম ও অধ্যাপক জাফর আহমেদ, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মো: শামীম, অধ্যাপক ড. আবদুল করিম, অধ্যাপক ড. আবদুর রশিদ, অধ্যাপক ড. মেহেদী হাসান খান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ছবিরুল ইসলাম হাওলাদার প্রমুখ।