নয়া দিগন্ত ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরস্পরের প্রতি হামলা টানা তৃতীয় দিনের মতো বন্ধ রেখেছে। এ সময়ে উভয় পক্ষের মধ্যে কোনো হামলা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাথে আলোচনার মাধ্যমে শান্তি চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
হরমুজ প্রণালী অবরোধ নিয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ভেঙে পড়ার পর ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ রাত ধরে নতুন করে হামলার পর শুক্রবার থেকে তা থেমে আছে। ট্রাম্প আশা প্রকাশ করেন, নতুন করে শুরু হওয়া কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ধারাবাহিক হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধের অবসান ঘটতে পারে।
ট্রাম্প এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার অনেক ধৈর্য আছে। দেখা যাক কী হয়। আমার মনে হয়, কিছু একটা হওয়ার ভালো সম্ভাবনা আছে।’ এর আগে সঙ্ঘাত বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কোনো আলোচনা চলছে-এমন দাবি নাকচ করে দেয় তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই বলেন, ‘অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন পক্ষের বার্তা মধ্যস্থতাকারীরা আমাদের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। কিন্তু এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমরা কোনো আলোচনায় নেই।’ তবে, মিশিগানে এক ভাষণে ট্রাম্প দাবি করেন, ‘এ মুহূর্তে তারা আমাদের সাথে একটি চুক্তি নিয়ে কথা বলছে।’
তিনি বলেন, নতুন এই উদ্যোগ ব্যর্থ হলে, ‘যুদ্ধবিরতির আগে আমরা যা করছিলাম, সেখানেই ফিরে যাবো।’ এ প্রসঙ্গে যুদ্ধ শুরুর প্রায় পাঁচ মাস পর যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুদ কমে আসছে-এমন উদ্বেগও উড়িয়ে দেন তিনি। ট্রাম্প বলেন, ‘আমাদের প্রচুর গোলাবারুদ রয়েছে। মাঝারি ধরনের অস্ত্রও অনেক আছে। যতই প্রয়োজন হোক না কেন, ব্যবহার করার চেয়ে বেশি রয়েছে।’
সাম্প্রতিক এই বিরতির মধ্যেও সোমবার সৌদি আরব হামলার মুখে পড়ে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, ইরান-সমর্থিত ইরাকি গোষ্ঠীগুলোর ছোড়া কয়েকটি ড্রোন তারা ভূপাতিত করেছে। এসব ড্রোন তেল স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছিল। কোনো গোষ্ঠী হামলার দায় স্বীকার করেনি। তবে রিয়াদ বাগদাদের প্রতি আহ্বান জানায়, তাদের ভূখণ্ড থেকে যেন এ ধরনের হামলা চালানো না হয়। পরে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জায়েদি সৌদি আরবের অভিযোগের তদন্তের আহ্বান জানান।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবসানে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান ড্রোন হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এসব হামলা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য ‘গুরুতর হুমকি।’ ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হাউছি বিদ্রোহীরা দাবি করেছে, সৌদি আরবের ড্রোন অনুপ্রবেশের জবাবে তারা দেশটির তেল অবকাঠামোতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তবে এ দাবি নিয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি রিয়াদ। সঙ্ঘাতের আগের পর্যায়ে সৌদি আরব ও উপসাগরীয় অন্য দেশগুলো ইরান-সমর্থিত ইরাকি মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে তাদের ভূখণ্ডে ধারাবাহিক হামলার অভিযোগ তুলেছিল। তবে নতুন করে সঙ্ঘাত শুরুর পর থেকে ওই গোষ্ঠীগুলো এ অঞ্চলে কোনো হামলার দায় স্বীকার করেনি।
এ দিকে, ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা জর্দান সীমান্তের কাছে দু’টি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। এগুলো কোথা থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল, তা তদন্ত করা হচ্ছে। অন্য দিকে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে হামলা বন্ধ থাকায় সোমবার বিশ্ব শেয়ারবাজারে ঊর্ধ্বগতি দেখা যায়। একই সাথে তেলের দামও কমে যায়। এতে উপসাগরীয় অঞ্চলের নৌপরিবহন ও তেলশিল্প কিছুটা স্বস্তি পায়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ৬ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৬ ডলারে নেমে আসে।
শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে এখনো বড় বাধা হয়ে রয়েছে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ। ইরান বলছে, তেল ও গ্যাস পরিবহনের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই থাকবে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দেশটির প্রভাবশালী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এ নৌপথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থামিয়ে দিচ্ছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের তথ্যমতে, সোমবার এমন ছয়টি জাহাজ থামানো হয়েছে, যেগুলো ইরান নির্ধারিত পথের বাইরে দিয়ে চলাচল করছিল। তেহরান জানিয়েছে, নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে হরমুজ প্রণালীর আরেক তীরবর্তী দেশ ওমানের সাথে তারা সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ‘যৌথ নীতি ও কার্যকর পদ্ধতি’ নিয়ে আলোচনা করেছে।
জুনে মাসকাট ও তেহরান জানিয়েছিল, তারা সেবা ফি আরোপের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবে। ওয়াশিংটন এ পদক্ষেপের বিরোধিতা করছে। তবে ওমান জানায়, তাদের নৌ-সীমা ব্যবহার করেও জাহাজ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করতে পারবে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ইরান কয়েকটি জাহাজে হামলা চালায়। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাকাই সোমবার বলেন, ওমানের সাথে সাম্প্রতিক আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। একই সাথে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করে বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওয়াশিংটনের আচরণ ‘এমন একটি মাফিয়া চক্রের মতো, যারা কোনো নিয়ম বা আইন মানে না।’
ক্ষতিপূরণ হিসেবে ইরানের জব্দ অর্থ ব্যবহার করতে চান ট্রাম্প
ইরানের হামলার ক্ষতিপূরণ হিসেবে মার্কিন নিয়ন্ত্রণে থাকা তেহরানের জব্দ তহবিল ব্যবহার করা হবে বলে ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত বোঝা না চাপিয়ে তেহরানকে জবাবদিহির আওতায় আনার এটিই যৌক্তিক পথ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মিশিগান যাওয়ার পথে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান যে, মার্কিন নিয়ন্ত্রণে থাকা ইরানের অর্থই তাদের ঘটানো ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ হিসেবে ব্যবহার করা হবে। গালফ অঞ্চলে ইরানি বাহিনী বা তাদের প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে বাণিজ্য জাহাজে হামলার পর বৈশ্বিক তেল পরিবহনের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় এই বার্তা দিলেন ট্রাম্প। মার্কিন অর্থ দফতরে ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজের মেরামত খরচ, পণ্যের ক্ষতি এবং আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর প্রভাব মূল্যায়ন করে এর বিস্তৃতি ও বাস্তবায়নের সময়সূচি চূড়ান্ত করছে। ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট গত জুন মাস থেকেই এই প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছেন বলে জানা গেছে। সমর্থকরা এই পদক্ষেপে জবাবদিহি নিশ্চিতের ইতিবাচক প্রয়াস হিসেবে দেখলেও সমালোচকরা বলছেন যে, এতে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার সুযোগ কমে যেতে পারে। এ দিকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য এই তহবিলের আইনি ভিত্তি বা কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে হোয়াইট হাউজ তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত মন্তব্য করেনি।



