পয়লা বৈশাখ ও আমাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য : ড. মুহাম্মদ অসাদুজ্জামান

এ জাতির মননের সাথে জড়িয়ে আছে পয়লা বৈশাখ।... বৈশাখের অনুষ্ঠান চর্চায় নিজস্ব সংস্কৃতির অনুশীলনের আবশ্যকতা বিদ্যমান। আবহমান বাংলার এসব অনুষ্ঠান পালনের মধ্য দিয়েই বাঙালি সংস্কৃতির শেকড় অনুসন্ধান করা সম্ভব।

Printed Edition

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যে পয়লা বৈশাখের একটি বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। যুগ যুগ ধরে আবহমান বাংলার কৃষ্টি ও সংস্কৃতির অপরিহার্য প্রত্যয়-পয়লা বৈশাখ। স্বাধীনতার পর পূর্ববঙ্গের বাঙালিরা ‘বাংলাদেশী’ উপাধি লাভ করে। এরপর বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের সাথে অন্তর্ভুক্ত হয় বাংলা সংস্কৃতির নানা প্রত্যয়। পয়লা বৈশাখ এসব অভিধার মধ্যে অন্যতম।

পয়লা বৈশাখের ধরন ও প্রকৃতিতে পরিবর্তন এসেছে। বাঙালির আবহমান ও চিরায়ত সংস্কৃতির বেদিতে আঘাত হেনেছে বিদেশ-বিভূঁইয়ে অপসংস্কৃতি। অতিমাত্রায় বিদেশী পরনির্ভরশীলতা মনোভঙ্গি এর প্রধান কারণ। এ কথা সত্য যে, বর্তমান বৈশি^ক যুগে এককভাবে অগ্রসর হওয়া প্রায় অসম্ভব। সেক্ষেত্রে বিদেশী সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ আটকানো দায়। কিন্তু আপন সংস্কৃতি ফেলে অন্যের সংস্কৃতি ধারণ করা কতটা যৌক্তিক- সে ভাবনা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

বাংলা নববর্ষ (পয়লা বৈশাখ) বাঙালির একটি সর্বজনীন লোকোৎসব, যার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট মূলত মুঘল সম্রাট আকবরের আমল (১৫৫৬ খ্রি.) থেকে ফসলি সন হিসেবে শুরু হলেও এটি বাঙালি সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধারণ করে এই দিনটি পুরনো গ্লানি ভুলে নতুন বছরকে স্বাগত জানায় এবং ষাটের দশকে পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবেও এর ভূমিকা ছিল। মুঘল সম্রাট আকবর ১৫৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ১০ মার্চ হিজরি ও সৌর বর্ষপঞ্জি সংস্কার করে ফসলি সন প্রবর্তন করেন, যা পরে ‘বঙ্গাব্দ’ বা বাংলা সন নামে পরিচিত হয়। কৃষকদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে এই নতুন বছরের গণনা শুরু হয়েছিল, যার প্রথম দিনটি ছিল বৈশাখ মাসের ১ তারিখ। নবাবী আমলে পয়লা বৈশাখে ‘পুণ্যাহ’ উৎসব এবং ব্যবসায়ীরা ‘হালখাতা’ বা নতুন হিসেবের খাতা খোলার মাধ্যমে নতুন বছর উদযাপন করত।

বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে সংযোগ

সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ : ১৯৫০-৬০ এর দশকে পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) আইয়ুব খান সরকারের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে পয়লা বৈশাখ ছিল এ অঞ্চলের সংস্কৃতির আত্মপ্রকাশের ভাষা।

রবীন্দ্রসঙ্গীত ও উৎসব : ছায়ানটের বর্ষবরণ (রমনার বটমূল) এবং রবীন্দ্রনাথের ‘এসো হে বৈশাখ’ গানটি বাংলা নববর্ষের প্রথম প্রহরে গাওয়া হয়।

বাংলা বর্ষপঞ্জি : বাংলা একাডেমি কর্তৃক নির্ধারিত আধুনিক পঞ্জিকা অনুযায়ী বর্তমানে ১৪ এপ্রিল পয়লা বৈশাখ পালিত হয়, যা বাংলা ভাষা ও ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা।

বৈশাখী মেলা : গ্রামে ও শহরে বৈশাখী মেলার আয়োজন করা হয়, যেখানে লোকশিল্প, মাটির তৈরি খেলনা ও মিষ্টি বিক্রি হয়।

শোভাযাত্রা : বাংলাদেশে নববর্ষের উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের আয়োজনে বের হওয়া শোভাযাত্রা।

বাংলা নববর্ষ আজ বাঙালি জাতিসত্তা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং বাংলা ভাষার সমৃদ্ধ সংস্কৃতির প্রতীক হিসেবে সারাবিশ্বে পালিত হয়।

বাংলাদেশ সরকার ও বিভিন্ন সংগঠন বিদেশে নববর্ষের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাঙালি সংস্কৃতির বৈচিত্র্য বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরছে। বাংলা নববর্ষ (পয়লা বৈশাখ) বর্তমানে কেবল বাঙালি সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশই নয়, বরং ইউনেস্কো স্বীকৃত শোভাযাত্রা এবং বাংলাদেশ দূতাবাসের উদ্যোগে বিশ্বজুড়ে পালনের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক কূটনীতির হাতিয়ার হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। এটি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা, লোকজ ঐতিহ্য এবং ভ্রাতৃত্বের বার্তা বিশ্বব্যাপী তুলে ধরে। বাংলা নববর্ষের আন্তর্জাতিকতা ও সাংস্কৃতিক কূটনীতির মূল দিকগুলো নিচে আলোচনা করা হলো :

আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উদযাপন : প্রতি বছর বাংলাদেশ দূতাবাসগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যথাযোগ্য মর্যাদায় পয়লা বৈশাখ উদযাপন করে, যা বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরে। ভারতের রাজধানী দিল্লি, লন্ডন, নিউ ইয়র্কসহ বিভিন্ন দেশে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী উৎসব ও পোশাকে নববর্ষ উদযাপন করে প্রবাসী বাঙালিরা, যা স্থানীয়দের কাছে বাংলার সংস্কৃতিকে পরিচিত করায়।

ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী শোভাযাত্রা : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে বের হওয়া শোভাযাত্রা ইউনেস্কো কর্তৃক ‘মানবতার অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, যা বাংলা নববর্ষের আন্তর্জাতিক পরিচয়ের কেন্দ্রবিন্দু। পয়লা বৈশাখ বাঙালিদের অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সম্প্রীতি এবং ঐক্যবদ্ধ হওয়ার উৎসব, যা বিশ্বজুড়ে শান্তির বার্তা হিসেবে গণ্য হয় । বৈশাখী মেলা, লোকসঙ্গীত, পান্তা-ইলিশ, হালখাতা এবং ঐতিহ্যবাহী পোশাকের মাধ্যমে বাংলার লোকজ সংস্কৃতির প্রসার ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একে তুলে ধরা হয়।

অর্থনৈতিক তাৎপর্য : দেশীয় লোকশিল্প, কারুশিল্প এবং হস্তশিল্পের প্রদর্শন ও বিক্রয়, যা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে।

বাংলা নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ বাঙালির সাংস্কৃতিক উৎসবের পাশাপাশি একটি বিশাল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ, যা হালখাতা বা নতুন হিসাব বই খোলার মাধ্যমে ব্যবসার সূচনা করে। এটি কুটির শিল্প, ফ্যাশন, খাদ্য এবং পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে মেলাসহ বিভিন্ন খাতে কোটি টাকার কেনাবেচা ও বাণিজ্যিক গতিশীলতা নিশ্চিত করে। এ ছাড়া এটি নববর্ষকে ঘিরে কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখে। ঐতিহাসিকভাবে, পয়লা বৈশাখে ব্যবসায়ীরা পুরনো হিসাব বন্ধ করে নতুন খাতা খোলেন, যাকে হালখাতা বলা হয়। গ্রাহকরা পুরনো দেনা শোধ করেন এবং নতুন করে ব্যবসার সম্পর্ক শুরু হয়, যা আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখে। নববর্ষ উপলক্ষে নতুন পোশাক (বিশেষ করে শাড়ি, পাঞ্জাবি), জুতা এবং উপহার সামগ্রীর ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়। এটি ফ্যাশন হাউজ, দর্জি এবং স্থানীয় বাজারের বিক্রয় বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বৈশাখী মেলা এবং পয়লা বৈশাখের দিন মিষ্টির দোকানে ব্যাপক বেচাকেনা হয়। এ ছাড়াও পান্তা-ইলিশের প্রথা গ্রামীণ ও শহরতলির বাজারে মাছ ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের চাহিদা বাড়ায়। শহর ও গ্রামের বিভিন্ন স্থানে বৈশাখী মেলা বসে, যেখানে মাটির পুতুল, কুটির শিল্প, বাঁশ-বেতের সামগ্রী এবং হাতের কাজের জিনিস বিক্রি হয়, যা গ্রামীণ কারিগরদের আয়ের প্রধান উৎস। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কনসার্ট এবং শোভাযাত্রা (যেমন- মঙ্গল শোভাযাত্রা) আয়োজনকে কেন্দ্র করে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো স্পনসরশিপ প্রদান করে, যা ব্র্যান্ড ভ্যালু ও ব্যবসার প্রসার ঘটায়। নববর্ষের উৎসবের কারণে গ্রামীণ উৎপাদন, যেমন- মৃৎশিল্প, তাঁত শিল্প, এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প সচল থাকে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

পয়লা বৈশাখ কেবল উৎসব নয়, এটি বাঙালির বাৎসরিক অর্থনৈতিক লেনদেনের একটি অন্যতম বড় উৎসব, যা দেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যকে বেগবান করে।

সংক্ষেপে, বাংলা নববর্ষ আজ বাঙালির সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক উৎসবে পরিণত হয়েছে এবং সাংস্কৃতিক কূটনীতির মাধ্যমে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক, উদার ও ঐতিহ্যবাহী পরিচয় উজ্জ্বল করেছে।

সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান : পয়লা বৈশাখের রঙিন পোশাক, গান, নাচ ও খাবারের মাধ্যমে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সাথে বাঙালির সংস্কৃতির আদান-প্রদান ঘটে।

অসাম্প্রদায়িক চেতনা : এটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের উৎসব নয়, বরং একটি সর্বজনীন উৎসব যা বিশ্বজুড়ে সম্প্রীতি ও মিলনের বার্তা দেয় বাংলা নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সর্বজনীন লোকউৎসবের প্রতীক, যা ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী নির্বিশেষে সবাইকে একসূত্রে গাঁথে। এটি বাঙালি সংস্কৃতির শেকড়, যা নতুন আশা, ঐতিহ্য ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা নিয়ে আসে। বর্তমানে এটি বিশ্বব্যাপী বাঙালিদের মাধ্যমে পালিত হয়ে এক বিশাল আন্তর্জাতিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনে পরিণত হয়েছে। পয়লা বৈশাখ জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সবার উৎসব। এটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের বা গোত্রের উৎসব নয়, বরং সব বাঙালির প্রাণের উৎসব। এই উৎসবের মাধ্যমে বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা নতুনভাবে জাগ্রত হয়, যা সাম্য ও সৌহার্দ্য সৃষ্টি করে। মঙ্গল শোভাযাত্রা, বৈশাখী মেলা, পান্তা-ইলিশ, হালখাতা- এগুলো বাঙালির হাজার বছরের অসাম্প্রদায়িক লোকশিল্প ও সংস্কৃতির অংশ।

ডায়াসপোরা বা প্রবাসে উদযাপন : বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বজুড়ে প্রবাসী বাঙালিরা পয়লা বৈশাখ উদযাপন করেন, যা বাংলা সংস্কৃতিকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি দেয়।

সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন : এটি বিশ্বব্যাপী বাঙালি সম্প্রদায়কে তাদের শেকড়ের সাথে সংযুক্ত রাখে এবং বিশ্বজুড়ে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক মানবিক মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেয়। বাংলা নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা, লোকজ ঐতিহ্য এবং সর্বজনীন সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন, যা বিশ্বজুড়ে বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করে। বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ প্রবাসী বাঙালিদের মাধ্যমে এই উৎসব এখন আন্তর্জাতিক রূপ পেয়েছে, যেখানে বৈশাখী শোভাযাত্রা, হালখাতা ও বৈশাখী মেলার মাধ্যমে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সবাই মিলিত হয়। পয়লা বৈশাখ বাঙালির সর্বজনীন উৎসব, যা মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান এবং আদিবাসীদের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতি সৃষ্টি করে। গ্রামীণ মেলা, হালখাতা, লোকসঙ্গীত, পুতুলনাচ এবং মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো উৎসবের উপাদানগুলো বাঙালি সংস্কৃতিকে তুলে ধরে। শুধু বাংলাদেশ বা ভারত নয়, প্রবাসী বাঙালিদের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী এই উৎসবটি বাঙালি পরিচয় ও সংস্কৃতির ধারক হিসেবে পালিত হচ্ছে। এটি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের উৎসব নয়, বরং বাঙালি জাতির নিজস্ব সংস্কৃতির বিজয়। এই উৎসব বাঙালির পরিচয়, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির মেলবন্ধনের মাধ্যমে বাংলা সংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

সাংস্কৃতিক চেতনা

পুরনো বছরের ব্যর্থতা ভুলে নতুন বছরের নতুন উদ্যমে চলার শপথ নেয়া হয়। এই দিনটি মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য, প্রীতি ও ঐক্যের চেতনা বৃদ্ধি করে। সংক্ষেপে, বাংলা নববর্ষ বাঙালির কাছে শুধু একটি দিনের উৎসব নয়, এটি তাদের শেকড়, ঐতিহ্য ও অসাম্প্রদায়িকতার এক অনন্য অটুট সোপান

বাংলা নববর্ষ বা পয়লা বৈশাখ বাঙালির অসাম্প্রদায়িক, সর্বজনীন ও জাতিসত্তা প্রকাশের সর্বশ্রেষ্ঠ সাংস্কৃতিক উৎসব। এটি পুরনো বছরের গ্লানি মুছে নতুনকে বরণের দিন। কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে উদ্ভূত হলেও, এটি বর্তমানে বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, আত্মপরিচয় এবং জাতীয়তাবাদের অন্যতম প্রধান ধারক হিসেবে বিশ্বজুড়ে বাঙালির ঐক্য ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে তুলে ধরছে। বাংলা নববর্ষ কেবল পঞ্জিকার পাতা বদল নয়, এটি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালির ঐক্যের প্রতীক। পয়লা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ, হালখাতা, বৈশাখী শোভাযাত্রা, লোকজ মেলা এবং লাল-সাদা পোশাকের মাধ্যমে বাঙালির চিরায়ত সংস্কৃতি ফুটে ওঠে। ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক স্বাধিকার আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে নববর্ষের উদযাপনের সূত্রপাত হয়। রমনার অশ্বত্থমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ বাঙালির চেতনাকে জাগ্রত করে

বর্তমান বাংলা সংস্কৃতিতে প্রধান বিতর্কগুলো উগ্র মতাদর্শের উত্থান, সাংস্কৃতিক পরিসর সঙ্কোচন এবং রক্ষণশীলতার সাথে উদার মূল্যবোধের সঙ্ঘাতকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। গত এক দশকে সিনেমা হল ও পাঠাগার কমে যাওয়ায় সাংস্কৃতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে।

সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও স্বকীয়তা : ইংরেজি ও বিদেশী সংস্কৃতির অত্যধিক প্রভাবে বাংলা ভাষার মর্যাদা হ্রাস এবং দেশীয় সংস্কৃতির স্বকীয়তা বজায় রাখা নিয়ে উদ্বেগ।

উগ্রবাদ বনাম উদারতাবাদ : বাঙালি সংস্কৃতির মূল অসাম্প্রদায়িক ও উৎসবমুখর (যেমন- পয়লা বৈশাখ) চর্চার ওপর উগ্র ও রক্ষণশীল মতাদর্শের চাপ।

সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হস্তক্ষেপ : বাংলা একাডেমি বা শিল্পকলা একাডেমির মতো প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ বা রাজনৈতিক প্রভাবের ফলে মুক্ত বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা বাধাগ্রস্ত হওয়া।

ধর্ম ও সংস্কৃতি : ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও জাতীয় সংস্কৃতির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা নিয়ে বিতর্ক।

নিরাপত্তা ও চর্চা : সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার পর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।

পরবর্তী প্রজন্মের ওপর প্রভাব

পরবর্তী প্রজন্মের ওপর বাংলা নববর্ষের প্রভাব গভীর ও বহুমুখী। এটি তরুণ প্রজন্মকে বাঙালি সংস্কৃতি, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং শেকড়ের সাথে সংযুক্ত রাখছে। পয়লা বৈশাখ ও মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম তাদের সৃজনশীলতা, ঐক্য এবং আত্মপরিচয় খুঁজে পাচ্ছে, যা বিশ্বায়নের যুগেও নিজস্ব ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখছে। বিশ্বায়নের বিভ্রান্তি থেকে তরুণ প্রজন্মকে নিজ ঐতিহ্যের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে নববর্ষ কাজ করে। পয়লা বৈশাখ একটি সর্বজনীন উৎসব, যা পরবর্তী প্রজন্মকে ধর্মীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে অসাম্প্রদায়িক ও উদার মানসিকতা গড়তে উদ্বুদ্ধ করে। বৈশাখী উৎসবের নানা উপাদান (যেমন- মুখোশ, সরাচিত্র) তরুণদের সৃজনশীলতা ও শিল্পমনস্কতা বৃদ্ধি করে । নতুন পোশাক, পান্তা-ইলিশ এবং হালখাতার মতো রীতিনীতি তরুণদের পুরনো ঐতিহ্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। শহরে জন্ম নেয়া নতুন প্রজন্মের কাছেও গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতি ও উৎসবের আমেজ তুলে ধরে। যা পরিশেষে, আধুনিকতার সাথে শেকড়ের যোগসূত্র স্থাপন করে, বাংলা নববর্ষ পরবর্তী প্রজন্মকে আত্মবিশ্বাসী ও সংস্কৃতিমনা হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করে থাকে।

এ জাতির মননের সাথে জড়িয়ে আছে পয়লা বৈশাখ। এর ঐতিহাসিক ও প্রায়োগিক দিক বিদ্যমান। বর্তমানে এ উৎসবের গতি হ্রাস পাচ্ছে। স্বসংস্কৃতির বহমানতা উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রগতি ও উন্নতির সাথে সংশ্লিষ্ট। পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠান চর্চায় নিজস্ব সংস্কৃতির অনুশীলনের আবশ্যকতা বিদ্যমান। আবহমান বাংলার এসব অনুষ্ঠান পালনের মধ্য দিয়েই বাঙালি সংস্কৃতির শেকড় অনুসন্ধান করা সম্ভব।