বিদেশী ঋণে রেলপথ পরিবর্তনের মেগাপ্রকল্প। লাকসাম থেকে চট্টগ্রাম ১৩১ দশমিক ২০ কিলোমিটার রেলপথ। সেটিকে মিটারগেজ থেকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর করে ডাবল ট্র্যাকে উন্নীত করা হবে। সাথে থাকবে সিগন্যালিং, ইন্টারলকিং, জমি অধিগ্রহণ, পরামর্শক, পরিবেশগত সুরক্ষা ও অন্যান্য অবকাঠামো। প্রস্তাবিত খরচ ১৬ হাজার ৯৫৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। প্রতি কিলোমিটারে খরচ পড়বে প্রায় ১২৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা। শুধু নির্মাণ ব্যয় নয়, জমি অধিগ্রহণ, প্রকৌশল ও অন্যান্য সরঞ্জাম, পরামর্শক সেবা, এনজিওর মাধ্যমে সামাজিক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, ব্যবস্থাপনা সহায়তা পরামর্শক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, বাড়িভাড়া, ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং বিভিন্ন কন্টিনজেন্সি খাতের ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আজ মঙ্গলবার প্রকল্পটি নিয়ে মূল্যায়ন কমিটির সভা রয়েছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প দলিলের তথ্য বলছে, রেলপথে কনটেইনার পরিবহনের হার ৪ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে গেজ ইউনিফিকেশন করে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল করিডোরটিকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আলোচ্য করিডোরের মাধ্যমে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ট্রান্স এশিয়ান রেলপথে নেপাল, ভুটান এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য সহজতর হবে, যা এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরো ত্বরান্বিত করবে। ঢাকা-টঙ্গী (২২,৯৪ কিমি) এবং আখাউড়া-লাকসাম (৭১.২৪ কিমি) অংশের মিটারগেজ সিঙ্গেল লাইন ট্যাককে ইতোমধ্যে ডাবল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাকে রূপান্তর করা হয়েছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডরের অবশিষ্ট ২২৫.৮৫ কিমি (টঙ্গী-ভৈরব বাজার-আখাউড়া ৯৭.০১ কিমি এবং লাকসাম-চট্টগ্রাম ১৩১.২০ কিমি) মিটারগেজ ডাবল লাইন ট্র্যাককে ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা প্রয়োজন। বর্তমান সরকার সক্ষমতা বৃদ্ধি ও গেজ সমতাকরণের লক্ষ্যে সমগ্র ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল করিডোরটিকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) উপআঞ্চলিক পরিবহন প্রকল্প প্রস্তুতি সুবিধার আওতায় অর্থায়ন সহায়তা পাওয়া গেছে। এই ঋণের আওতাধীন রেলসংক্রান্ত অংশের বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ রেলওয়েকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সংস্থাটি ডিজাইন পরামর্শক হিসেবে কানাডার কানারেইল কনসালটেন্টস ইন্স. কানাডাকে লিড ফার্ম নিয়োগ দিয়েছে। যারা অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স এবং বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানের সাথে যৌথ উদ্যোগে কাজ করছে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত কারিগরি সম্ভাব্যতা যাচাই বলছে, প্রকল্পটি অর্থনৈতিকভাবে কাক্সিক্ষত, আর্থিকভাবে লাভজনক, কারিগরিভাবে বাস্তবায়নযোগ্য। পাশাপাশি এর পক্ষে জোরালো সামাজিক ও পরিবেশগত যৌক্তিকতাও বিদ্যমান। প্রকল্পটির প্রাথমিক প্রকল্প প্রস্তাব ২৮ নভেম্বর ২০২৪ পরিকল্পনা উপদেষ্টা কর্তৃক নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয়েছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ১৬ হাজার ৯৫৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন মাত্র দুই হাজার ৮২৫ কোটি এক লাখ টাকা। আর ১৪ হাজার ১২৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকা আসার কথা প্রকল্প ঋণ হিসেবে এডিবি ও ইউরোপীয়ান ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (ইআইবি) থেকে। অর্থাৎ মোট ব্যয়ের প্রায় ৮৩ শতাংশই বিদেশি ঋণনির্ভর। প্রকল্পটি ৬ বছরে অর্থাৎ চলতি বছর অনুমোদিত হলে আগামী ২০৩২ সালের জুনে শেষ হবে।
ভারতের সাথে তুলনায় কোথায় বাংলাদেশ?
রেল অবকাঠামোর ব্যয় দেশভেদ তুলনা করা কঠিন। কারণ কোথাও শুধু নতুন লাইন, কোথাও ডাবলিং, কোথাও গেজ রূপান্তর, আবার কোথাও বিদ্যুতায়ন, সিগন্যালিং, সেতু, টানেল ও ভূমি অধিগ্রহণ একই প্রকল্পের মধ্যে থাকে। প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো এবং বিভিন্ন মিডিয়া তথ্য থেকে জানা যায়, ভারতে গুন্টুর-গুন্টাকাল অন্ধ্রপ্রদেশে ৪০১.৪৭ কিলোমিটার ডাবল লাইন ও বিদ্যুতায়ন প্রকল্পটির অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৬৩১ কোটি রুপি। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ৯.০৫ কোটি রুপি, যা বাংলাদেশী হিসেবে প্রায় ১১.৭৫ কোটি টাকা।
আর রোজা-সীতাপুর-বুড়ওয়াল ১৮০.৭৭ কিলোমিটার ব্রডগেজ সিঙ্গেল লাইন ডাবলিংয়ের অনুমোদিত ব্যয় এক হাজার ২৯৫.৪২ কোটি রুপি এবং প্রতিযোগিতা মূল্য এক হাজার ৪৮৬.৪৬ কোটি রুপি। প্রতিযোগিতা মূল্য ধরলে প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ৮.২২ কোটি রুপি। অর্থাৎ প্রায় ১০.৬৮ কোটি বাংলাদেশী টাকা। অন্য দিকে ভারতের ভাগলপুর-দুমকা-রামপুরহাট ২০২৫ সালে অনুমোদিত ১৭৭ কিলোমিটার ডাবলিং প্রকল্পের মোট ব্যয় ৩ হাজার ১৬৯ কোটি রুপি। প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ১৭.৯ কোটি রুপি। অর্থাৎ ২৩.২৫ কোটি বাংলাদেশি টাকা। এ ছাড়া ২০২৬ সালে অনুমোদিত গোন্দিয়া-জাবালপুর ২৩১ কিলোমিটার ডাবলিং প্রকল্পের ব্যয় ৫ হাজার ২৩৬ কোটি রুপি। প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ২২.৬৭ কোটি রুপি। বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ২৯.৪৪ কোটি টাকা।
এক প্রশ্নে এত পরামর্শক কেন?
পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ বলছে তাদের কাছে প্রস্তাবনা এসেছে। প্রকল্পে তিন ধরনের খাতে বিপুলসংখ্যক পরামর্শক নিয়োগের প্রস্তাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। ডিপিপিতে প্রস্তাবিত অধিকসংখ্যক পরামর্শক নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা, তাদের জনমাস, সম্মানীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে পর্যালোচনা করা হবে।
ডিজাইন পরামর্শক হিসেবে কানাডার কানারেল কনসালটেন্টকে লিড ফার্ম হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। এর সাথে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার এসএমইসি ইন্টারন্যাশনাল প্রাইঋেঁ লি. সিস্ট্রাসা ফ্রান্স এবং বাংলাদেশের এসিই কনসালট্যান্ট লিমিটেড ও স্ট্র্যাটিজি কনসালটিং লিমিটেড। পরামর্শক খাতে মোট ব্যয় হবে ৫২৭ কোটি টাকার বেশি।
১৩১ কিলোমিটারে কী হবে?
প্রকল্প প্রস্তাবনার তথ্য থেকে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় লাকসাম-চিনকি আস্তানা-চট্টগ্রাম স্টেশন ইয়ার্ড পর্যন্ত ১৩১ দশমিক ২০ কিলোমিটার মিটারগেজ ডাবল ট্র্যাককে ডুয়েলগেজ ডাবল ট্র্যাকে রূপান্তর করা হবে। ব্রডগেজ ট্রেনের ডিজাইন স্পিড নির্ধারণের লক্ষ্য ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার। মিটারগেজ ট্রেনের ক্ষেত্রে তা হবে ১০০ কিলোমিটার। অপারেশনাল স্পিড হবে ব্রডগেজ ট্রেনের জন্য ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার এবং মিটারগেজ ট্রেনের জন্য ৮০ কিলোমিটার। সিগন্যালিং ও ইন্টারলকিং ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে ট্রেন চলাচলের নিরাপত্তা বাড়ানো হবে। প্রকল্পটির আরেকটি বড় লক্ষ্য রেলপথে কনটেইনার পরিবহনের হার বর্তমানের ৪ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করা। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলসংযোগের সাথে যুক্ত হয়ে কক্সবাজার এবং ভবিষ্যতে মাতারবাড়ি বন্দরকেন্দ্রিক পণ্য ও যাত্রী পরিবহন বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। এর ফলে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহনে রেলের ভূমিকা বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
শুধু চট্টগ্রাম নয়, নজর নেপাল-ভুটানেও
প্রকল্পের তথ্য থেকে জানা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল করিডোরকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের পেছনে শুধু অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ নয়, রয়েছে আঞ্চলিক বাণিজ্যের পরিকল্পনাও। সরকারের লক্ষ্য ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সাথে বাংলাদেশের রেল যোগাযোগকে আরো কার্যকর করা। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে নেপাল, ভুটান ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও পরিবহন যোগাযোগ বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হবে। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বাণিজ্য ও পরিবহন সুবিধা বাড়ানোও প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
পরিকল্পনা কমিশন বলছে ফিজিবিলিটি স্টাডি কোথায়?
প্রকল্পের পটভূমিতে কারিগরি সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কথা বলা হলেও প্রস্তাবিত ডিপিপিতে ফিজিবিলিটি স্টাডির বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। তাদের মূল্যায়ন কমিটির সভার কার্যপত্রে তা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্য দিকে পরামর্শকদের পরিচালিত কারিগরি সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে প্রকল্পটিকে অর্থনৈতিকভাবে কাক্সিক্ষত, আর্থিকভাবে লাভজনক ও কারিগরিভাবে বাস্তবায়নযোগ্য বলা হয়েছে। সামাজিক ও পরিবেশগত দিক থেকেও প্রকল্পটির যৌক্তিকতা রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।



