- ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে ১২ মার্চ
- জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের চূড়ান্ত অবস্থান দেখে ডেপুটি স্পিকার পদ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেবে জামায়াত
- এমপিদের বাসা-অফিস বরাদ্দে আরো কিছুদিন অপেক্ষা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে ডেপুটি স্পিকার পদকে ঘিরে। সরকারপক্ষের প্রস্তাব-প্রধান বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকার পদ দেয়া হবে। তবে বিরোধী শিবির স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, গণভোটে অনুমোদিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট রূপরেখা ছাড়া তারা আপাতত এই পদ গ্রহণ করবে না। ফলে স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনকে ঘিরে যে ঐকমত্যের বার্তা সরকার দিতে চেয়েছিল, তা এখন শর্তসাপেক্ষ রাজনৈতিক সমীকরণে আটকে যাচ্ছে। শুধু ডেপুটি স্পিকার নয়, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তির বিষয়টি নিয়েই অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংশোধন) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫; গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার বৈধতা নিয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করায় রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
সূত্র জানায়, আগামী ১২ মার্চ প্রথম অধিবেশনে স্পিকার নির্বাচনের পরপরই ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন সম্পন্ন করার প্রস্তুতি রয়েছে। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে সরকার চাইছে বিরোধী দল যাকে মনোনীত করবে, তাকেই সমর্থন দিতে। কিন্তু বিরোধী দল বলছে, এটি কেবল একটি পদ নয়; গণভোটের রায় অনুযায়ী জুলাই সনদকে ‘প্যাকেজ’ আকারে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার আগে নিশ্চিত করতে হবে।
জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান নয়া দিগন্তকে বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের চূড়ান্ত অবস্থান পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত তারা কাউকে মনোনয়ন দেবেন না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গণভোটের ফল অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের নিশ্চয়তা পাওয়ার পরই জামায়াত ডেপুটি স্পিকার পদ নিতে চায়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ইফতার মাহফিলের পর চা-চক্রে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এই মনোভাব জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান। জামায়াত নেতাদের ভাষ্য ‘ডেপুটি স্পিকার পদটি কারো দয়ার বিষয় নয়। ৬০ শতাংশ মানুষ জুলাই সনদের পক্ষে রায় দিয়েছে। সেই রায় পাশ কাটিয়ে কেবল একটি পদ প্রস্তাব করা জনগণের সাথে প্রতারণার শামিল।’
জুলাই সনদ অনুযায়ী দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদব্যবস্থায় উভয় কক্ষের ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত হওয়ার বিধান সংবিধানে যুক্ত করার কথা রয়েছে। বিরোধী শিবিরের দাবি, এটি সরকারি দলের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল কোনো প্রস্তাব নয়; বরং গণভোটে অনুমোদিত রাজনৈতিক সমঝোতার বাধ্যবাধকতা। সরকারপক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, জুলাই জাতীয় সনদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে ডেপুটি স্পিকার পদে বিরোধী দল থেকে নির্বাচন দিতে চায় সরকার। প্রধান বিরোধী দলকে নাম ঠিক করতে মৌখিক ও সাক্ষাতে প্রস্তাব দেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। তার বক্তব্য, ‘রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল হিসেবে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন এখন থেকেই শুরু করতে চাই।’
তবে বিরোধী নেতারা বলছেন, কেবল ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনকে ‘বাস্তবায়নের সূচনা’ হিসেবে দেখানো যথেষ্ট নয়। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন, পিআর পদ্ধতিতে ১০০ আসনের উচ্চকক্ষ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও নির্বাচন কমিশনসহ অন্যান্য সাংবিধানিক কমিশনের কাঠামো নির্ধারণ- এসব বিষয়ে স্পষ্ট অগ্রগতি ছাড়া ডেপুটি স্পিকার পদ গ্রহণ করলে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দায় থেকে সরকার দায় মুক্তি পেয়ে যাবে।
পদ নাকি রাজনীতি- কোনটি অগ্রাধিকার?
ডেপুটি স্পিকার মন্ত্রী পদমর্যাদার পদ। স্পিকারের মতো একই প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হন তিনি। বিরোধী শিবিরের একাধিক নেতা মনে করেন, বর্তমান বাস্তবতায় ‘পদের চেয়ে রাজনীতি’ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যৎ বিরোধী জোটের রাজনীতি জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হবে- এমন ইঙ্গিতও দিচ্ছেন তারা।
উল্লেখ্য, সরকারপক্ষ জুলাই সনদের প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট ছাড়া একমত হয়েছিল। তবে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে নি¤œ ও উচ্চকক্ষে দু’টি ডেপুটি স্পিকার পদের কথা বলা হয়, যার একটি বিরোধী দল থেকে নেয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এই পার্থক্যও আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
অধিবেশন প্রস্তুতিতে সচিবালয়ের ব্যস্ততা : এদিকে, সংসদ সচিবালয় অধিবেশন আয়োজনের প্রস্তুতি প্রায় শেষ করেছে। এমপিদের দলীয় অবস্থান ও অভিজ্ঞতা বিবেচনায় আসন বিন্যাসের খসড়া তৈরি হচ্ছে। স্পিকার নির্বাচিত হওয়ার পর বিরোধীদলীয় নেতা ও উপনেতার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি মিলবে। কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী বিরোধী দলের স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়টি স্পিকারের একক এখতিয়ার।
প্রথম দিনে স্পিকার নির্বাচন শেষে সাময়িক মুলতবি হবে অধিবেশন। রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নেয়ার পর নতুন স্পিকারের সভাপতিত্বে ফের অধিবেশন শুরু হবে এবং ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন পরিচালিত হবে। একই সাথে পাঁচ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন ও শোক প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ভাষণও থাকবে প্রথম অধিবেশনে।
সব অধ্যাদেশ উত্থাপিত হবে, তবে : আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ প্রথম অধিবেশনেই উপস্থাপন করা হবে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সব অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করা হবে না; সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক নয় এবং প্রয়োজনীয় বিবেচিত কিছু অধ্যাদেশ বাছাই করে উত্থাপন করা হবে।
স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নিয়ে আলোচনা : নতুন স্পিকার হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খানের নাম আলোচনায় রয়েছে। এ ছাড়া অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন ও ড. এম ওসমান ফারুকের নামও শোনা যাচ্ছে।
সংসদ উপনেতা হিসেবে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের নামও আলোচনায় আছে।
ইতোমধ্যে বরগুনা-২ আসনের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম মনিকে চিফ হুইপ নিয়োগ দেয়া হয়েছে। দ্য বাংলাদেশ হুইপস অর্ডার, ১৯৭২ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির আদেশে এই নিয়োগ কার্যকর হয়েছে। আরো ছয়জন সংসদ সদস্যকে হুইপ করা হয়েছে। তারা হলেন- হবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য জি কে গউছ, খুলনা-৩ আসনের রকিবুল ইসলাম বকুল, শরীয়তপুর-৩ আসনের মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, নাটোর-২ আসনের রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, দিনাজপুর-৪ আসনের আখতারুজ্জামান মিয়া ও লক্ষ্মীপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আশরাফ উদ্দিন নিজান। চিফ হুইপ মন্ত্রী পদমর্যাদা এবং হুইপরা প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা পেয়ে থাকেন; তাদের শপথ নিতে হয় না।
জানা যায়, বিরোধী দল থেকে ইতোমধ্যে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খানকে হুইপ হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে, ডেপুটি স্পিকার পদে ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন, মীর আহমেদ বিন কাসেম আরমানসহ কয়েকজনের নাম আলোচনায় রয়েছে।
এমপিদের বাসা-অফিস বরাদ্দে অপেক্ষা : রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে এমপিদের জন্য ছয়টি ভবনে ২১৬টি ফ্ল্যাট রয়েছে। নাখালপাড়ায় আরো ৪৮টি ফ্ল্যাট আছে। সংসদ ভবনের বাইরে পুরাতন এমপি হোস্টেলে অফিস কক্ষ বরাদ্দের ব্যবস্থাও রয়েছে। তবে ‘সংসদ কমিটি’ (হাউজ কমিটি) গঠিত না হওয়ায় এখনো ফ্ল্যাট ও অফিস বরাদ্দ দেয়া যাচ্ছে না। পদাধিকারবলে চিফ হুইপ এই কমিটির সভাপতি হন। অধিবেশন শুরু ও কমিটি গঠনের পরই বরাদ্দপ্রক্রিয়া শুরু হবে।
হাইকোর্টের রুলে জুলাই সনদে নতুন অচলাবস্থা: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর প্রাক্কালে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটকে ঘিরে নতুন করে সাংবিধানিক বিতর্কের সূচনা হয়েছে। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংশোধন) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫; গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার বৈধতা নিয়ে হাইকোর্ট রুল জারি করায় রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
গত সোমবার বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল ও বিচারপতি মো: আনোয়ারুল ইসলামের বেঞ্চ পৃথক দু’টি রিটের শুনানি শেষে এই রুল দেন। রুলে জানতে চাওয়া হয়েছে- জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ এবং গত ১৬ ফেব্রুয়ারি সংসদ সচিবালয় থেকে এমপিদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার চিঠি কেন অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না। একই সাথে গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ৩ নম্বর তফসিল- যার আওতায় ৩০টি বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্যের কথা বলা হয়েছে-তা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।
আইনসচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জাতীয় সংসদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব, নির্বাচন কমিশন ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে চার সপ্তাহের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে। রিটকারীদের দাবি, সংবিধানে গণভোট বা জুলাই সনদের কোনো সুস্পষ্ট বিধান নেই। এই রুলের ফলে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনসহ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে চলমান রাজনৈতিক সমঝোতায় নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হচ্ছে এক জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। সরকার ডেপুটি স্পিকার পদ দিয়ে সমঝোতার বার্তা দিতে চাইলেও বিরোধী শিবির জুলাই সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ছাড়া কোনো প্রতীকী পদক্ষেপে রাজি নয়। ফলে আগামী ১২ মার্চের অধিবেশন শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের সূচনা করবে- সেদিকেই এখন নজর সবার।



