বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ড্রেজার ও জলযান কেনাকাটায় দুর্নীতির তদন্ত মাঝপথে থেমে গেছে। চার হাজার ৫১৫ কোটি ৫২ লাখ টাকার এই প্রকল্পের অর্থআত্মসাতের অভিযোগে সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, বিআইডব্লিউটিএর সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম সাদেকসহ কয়েক জনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও অভিযুক্তদের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম সাদেককে তলবও করেছিলেন অনুসন্ধান কর্মকর্তা। তবে এরপর আর অনুসন্ধানকার্যক্রম এগোয়নি বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এর আগে ঘাট ইজারায় দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ায় ২০২২ সালে গোলাম সাদেকসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন দিয়েও আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল দুদক।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে বিআইডব্লিউটিএর জন্য ৩৫টি ড্রেজার, ১৬১টি জলযান সংগ্রহ, তিনটি ড্রেজার বেইজ নির্মাণ ও একটি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এতে মোট ব্যয় ধরা হয় চার হাজার ৪৮৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। ২০২৩ সালের জুন মাসের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে পরবর্তীতে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। সেই সাথে ব্যয় ২৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বাড়িয়ে চার হাজার ৫১৫ কোটি ৫২ লাখ টাকা করা হয়। তবে ওই সময়ের মধ্যেও কাজ শেষ না হওয়ায় ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে প্রকল্পটির মেয়াদ।
এদিকে সময়মতো কাজ না হলেও এই প্রকল্পের ড্রেজার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি কেনাসহ প্রতিটি স্তরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থআত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। দুদকের বিশেষ তদন্ত শাখার প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ড্রেজার ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রাক্কলন সংশোধন করে নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানিকে কাজ পাইয়ে দেয়া হয়েছে। শুধু কেনাকাটায়ই নয়, টেকনোলজি ট্রান্সফার বা প্রযুক্তি হস্তান্তরের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের আলামত পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ৩৫টি ড্রেজার ও সহায়ক জলযান ক্রয় প্রকল্পে দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো: আলী আজগর ফকির দুদকে অভিযোগ করেন। প্রাথমিক যাচাই-বাছাইয়ে অভিযোগটি গ্রহণযোগ্য হওয়ায় এতে বিআইডব্লিউটিএর সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম সাদেক, বর্তমান চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা, সাবেক নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এবং সাবেক প্রধান প্রকৌশলী (ড্রেজিং) মো: আব্দুল মতিনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। এর প্রেক্ষিতে কমিশনের সহকারী পরিচালক মো: রাকিবুল হায়াতকে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। তিনি ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথি এবং গোলাম সাদেকসহ বিআইডব্লিউটিএর ছয় কর্মকর্তার নথি তলব করেন। পরে ২০২৫ সালের ৫ মার্চ সংস্থাটির সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম সাদেককে দুদকে তলব করা হয়। এরপর এক বছর পার হলেও অনুসন্ধানকার্যক্রম শেষে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
এ বিষয়ে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা মো: রাকিবুল হায়াত বলেন, তদন্ত বন্ধ হয়নি। যেহেতু প্রকল্পটি চলমান, তাই তদন্তও চলমান। তদন্তকার্যক্রম শেষ হলে প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে। এ ছাড়া এখন কমিশনও নেই। কমিশন গঠিত হলে তদন্তকার্যক্রমে গতি ফিরবে। তিনি বলেন, অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোতে চিঠি পাঠিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। অভিযোগের প্রমাণ মিললে মামলা দায়েরসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমরা অভিযোগগুলো গুরুত্বের সাথে নিয়েছি। সব তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। অনুসন্ধান শেষে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
দুদক ও বিআইডব্লিউটিএ সূত্র জানায়, গোলাম সাদেক ২০২০ সালের ১৯ জানুয়ারি প্রেষণে বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান পদে যোগদান করেন। তিনি মার্চ ২০২৩ পর্যন্ত এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে সংস্থাটির বিভিন্ন প্রকল্প ও কেনাকাটায় দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ২০২১-২০২২ অর্থবছরে পাঁচ সদস্যের কমিটির মূল্যায়ন প্রতিবেদন উপেক্ষা করে তিনি দুই কোটি টাকায় ‘নগরবাড়ী-কাজিরহাট-নরাদহ নদী বন্দর’ এলাকার শুল্ক আদায় কেন্দ্র বা ঘাট ইজারা অনুমোদন করেন। অথচ এই ঘাটের বার্ষিক ইজারা মূল্য ছিল চার কোটি ৮০ লাখ টাকা। এতে দুই অর্থবছরে সরকারের প্রায় ছয় কোটি ৮১ লাখ টাকার ক্ষতি হয়। ঘাট ইজারায় এই দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ায় ২০২২ সালে দুদকের কমিশন সভায় গোলাম সাদেকের বিরুদ্ধে মামলা অনুমোদন করা হয়। তবে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালীদের তদবিরে সেই সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটে দুদক। কমিশন সভায় অনুমোদনের পরও মামলা থেকে বাদ দেয়ার এমন ঘটনা দুদকের ইতিহাসে বিরল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।


