চুপ্পুই থাকছেন রাষ্ট্রপতি?

অভিশংসনের দাবিতে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, চুপ্পু রাষ্ট্রপতি হিসেবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছেন। ভারতীয় প্রেসক্রিপশনে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে। আলামত বলছে বিএনপির ঘাঁড়ে পা রেখেই আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরে আসছে এবং ভারতীয় মিডিয়া এসব বিষয়ে বিএনপির সাথে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের বিশদ বিবরণ দিচ্ছে। ভারতীয় রাজনৈতিক ধারাভাষ্যকাররা এ ধরনের সমঝোতা কিভাবে সফল করে তোলা যায় তার ফিরিস্তি দিচ্ছেন। কিন্তু বিএনপি কোনো প্রতিবাদ বা এসব বিষয়ে অবস্থান পরিষ্কার না করায় জনমনে তীব্র অসন্তোষ ও শঙ্কা বাড়ছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition
চুপ্পুই থাকছেন রাষ্ট্রপতি?
চুপ্পুই থাকছেন রাষ্ট্রপতি?

বিএনপি আপাতত রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে ক্ষমতায় রেখে আগাতে চাচ্ছে। অন্য দিকে তাকে অভিসংশনের দাবি জোরালো হচ্ছে। রাষ্ট্রের ক্লাসিফাইড ডকুমেন্ট প্রকাশ করে চুপ্পু তার ওথ অব সিক্রেসি ভেঙেছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অবিলম্বে চুপ্পুকে অভিশংসনের উদ্যোগ নিতে চিঠি দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির। অন্য দিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, চুপ্পু রাষ্ট্রপতি হিসেবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছেন। ভারতীয় প্রেসক্রিপশনে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে। আলামত বলছে বিএনপির ঘাঁড়ে পা রেখেই আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরে আসছে এবং ভারতীয় মিডিয়া এসব বিষয়ে বিএনপির সাথে রাজনৈতিক অঙ্গীকারের বিশদ বিবরণ দিচ্ছে। ভারতীয় রাজনৈতিক ধারাভাষ্যকাররা এ ধরনের সমঝোতা কিভাবে সফল করে তোলা যায় তার ফিরিস্তি দিচ্ছেন। কিন্তু বিএনপি কোনো প্রতিবাদ বা এসব বিষয়ে অবস্থান পরিষ্কার না করায় জনমনে তীব্র অসন্তোষ ও শঙ্কা বাড়ছে।

প্রধানমন্ত্রীকে দেয়া চিঠি : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেয়া ৬ পৃষ্ঠার চিঠিতে সংবিধানের ৭৪(৩) মোতাবেক কোনো সংসদ সদস্যকে স্পিকার হিসেবে নিয়োগ ও আর্টিকেল ৫৪ অনুযায়ী স্পিকারকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে সংসদে আর্টিকেল ৭৩(২০) অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশনে বক্তব্য দেয়ার কথা বলা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু জুলাই আন্দোলনের সময় মানবাধিকার লঙ্ঘন রুখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারকে পরিকল্পিতভাবে জুলাই আন্দোলনে জড়িতদের হত্যা, নির্যাতন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে একই ধরনের কার্যকলাপ থেকে বিরত থাকতে রাষ্ট্রপতি কোনো ধরনের উদ্যোগ নেননি বরং তার অগোচরে এ ধরনের হত্যা ও নির্যাতন ঘটেছে, যা অবিশ্বাস্য। এখন পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি আওয়ামী লীগের এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতন নিয়ে কোনো বিবৃতি দেননি। জনগণের অভিপ্রায় ও তার জানমালের নিরাপত্তা রক্ষায় রাষ্ট্রপতি তার শপথের অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছেন। একই সাথে কালের কণ্ঠকে দেয়া সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি অসত্য ও ভিত্তিহীন বক্তব্য দিয়ে জুলাই আন্দোলনকে অবজ্ঞা ও অসম্মান করেছেন। রাষ্ট্রপতি আওয়ামী লীগ শাসনামলে ডামি নির্বাচনের সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে ধংসের কাজেও সম্পৃক্ত ছিলেন। দ্বৈতনাগরিক হিসেবে কোনো তথ্য তিনি দেননি এবং আমিরাতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত রয়েছেন। রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে দুদকের চেয়ারম্যান হিসেবে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মিথ্যা দুর্নীতির মামলা দায়ের, তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকো যাতে দেশে না ফিরতে পারেন এমন ধরনের ষড়যন্ত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। এজন্য বিনা চিকিৎসায় কোকো ও কারাগারে বেগম জিয়া দুর্ভোগের পর শেষ পর্যন্ত মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছেন। রাষ্ট্রপতি সংসদে প্রথম অধিবেশন আহ্বানের কর্তৃত্ব হারিয়েছেন। কাজেই সংসদ নেতা হিসেবে আপনি কোনো সংসদ সদস্যকে স্পিকার মনোনীত করতে পারেন। আর্টিকেল ৫৪ অনুযায়ী স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতির অবস্থান ছিল বিদেশী শক্তির ক্রীড়নক হিসেবে। অবিলম্বে তাকে অপসারণে উদ্যোগ নিন।

অধ্যাপক দিলারা চৌধুরীর পর্যবেক্ষণ : অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন বাহাত্তরের সংবিধান যদি বিএনপি অনুসরণ করে তাহলে এ নির্বাচন, সবই অবৈধ। কারণ সংবিধানে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো সুযোগ নাই। জুলাই সনদ না মানলে নির্বাচন বা অন্তর্বর্তী সরকার লিগ্যাল না। প্রশ্ন হচ্ছে চুপ্পুকে আবার রাষ্ট্রপতি নিয়োগ দিয়ে বিএনপি রাখবে নাকি শেখ হাসিনার দেয়া নিয়োগের ধারাবাহিকতা রক্ষা করবে। রাষ্ট্রপতি আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনৈতিক সম্পর্কের মধ্যে ভরকেন্দ্র হয়ে গেছে, চুপ্পুতো সেটা বলেছেন। সাক্ষাৎকারে চুপ্পু বলেছেন তাকে রক্ষা করেছেন ওয়াকারউজ্জামান ও বিএনপি। এবং বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে যতরকমের সমঝোতা, এটার কেন্দ্রবিন্দু হলো চুপ্পু।

রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের ব্যাপারে দিলারা বলেন, তিনি তো রাষ্ট্রের ক্লাসিফাইড ডকুমেন্ট প্রকাশ করে দিয়েছে। তার তো অভিশংসন হওয়াই উচিত। বিএনপির মধ্যে কি কেউ যোগ্য নেই রাষ্ট্রপতি হওয়ার মতো বা রাষ্ট্রপতি হওয়ার ব্যাপারে বিএনপিতে অনাগ্রহ মানে যেটা শুনছি বিএনপি ভারতের সাথে একটি চুক্তি করে এসেছে এবং এ বিষয়টি বিএনপি কখনো অস্বীকার করেনি। পার্ট অব চুক্তি হতে পারে। বিএনপি তো কখনো আমাদেরকে বলেনি যে, কোনো চুক্তি ভারতের সাথে হয়নি। আনন্দবাজার বা ইন্ডিয়া টাইমসে যেটা বলা হয়েছে, এগুলো তো বিএনপি অস্বীকার করেনি। অস্বীকার না করলে মেনে নিলেন। বিষয়টি জাতির সামনে বিএনপির অবশ্যই খোলাসা করা উচিত। বিএনপি প্রতিবাদ না করলে আমরা ধরে নেব তা সত্যি। তারা আওয়ামী লীগকে এখানে ফেরত নিয়ে আসবে। বিএনপি যেভাবে চলছে তাতে আমরা খুবই শঙ্কিত। বিএনপি শুধু বিশ্বাস ভঙ্গ করছে না জনগণের সাথে প্রতারণা করছে। আমি খুবই হতাশ কারণ এ পরিস্থিতি থেকে বের হওয়া খুব মুস্কিল হবে। আমার পর্যবেক্ষণ ভারতের প্রেসক্রিপশনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি মিলে প্রথমে জামায়াতকে নির্মূল করবে। ভারতের বেশ কিছু রাজনৈতিক ভাষ্যকার বলছেন জামায়াতের মতো শক্তিকে নির্মূল করতে হবে। কারণ ভারতের নিরাপত্তার জন্যে তারা হুমকি। তাদেরতো সবকিছুতেই হুমকি। সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ তুলে ভারত এমন বলার চেষ্টা করে। আমরা কাশি দিলেও ভারত নিরাপত্তার হুমকি দেখে। এবং একটা পর্যায়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধবে। মসনদ নিয়ে। সেখানে আওয়ামী লীগ জিতবে কারণ ভারতের পছন্দের একেবারে ট্রাস্টেড পার্টি বা রক্তের বন্ধন সেটা আওয়ামীলীগের সাথে। এটাই তাদের প্লান। বিএনপির ঘাঁড়ে পা রেখেই আওয়ামীলীগ আসবে। আলামত তো তাই দেখা যাচ্ছে।

এখন প্রশ্ন এটি কি জনগণের বিজয়? নাকি পরাজয়?

কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণ করে বলেন, রাষ্ট্রপতি মূলত তিনটি কথা বলেছেন : (১) ৫ আগস্টের গণ-ভ্যুত্থানের পর কিছু শক্তি অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতির পদ চ্যালেঞ্জ করেছিল, (২) তিনি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন এবং (৩) রাজনৈতিক দলগুলোর একটি অংশ সেই ধারাবাহিকতাকে সম্মান জানিয়েছে। এখানেই মূল রাজনৈতিক প্রশ্ন তৈরি হয়।

জুলাই-৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান ছিল বিদ্যমান রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণের বিস্ফোরিত প্রত্যাখ্যান। মানুষ প্রাণ দিয়েছে, দমন সহ্য করেছে, এবং শেষ পর্যন্ত একটি সরকার পতন হয়েছে। সাধারণ মানুষের চোখে এটি ছিল ‘ব্যবস্থা বদলের’ মুহূর্ত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে : জনগণের আত্মত্যাগ কি শুধু সরকার বদলের জন্য ছিল? নাকি ছিল নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়নের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে গঠন করার ইচ্ছা?

রাষ্ট্রপতির বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তিনি শুরু থেকেই একটি অবস্থান নিয়েছিলেন পুরানা সংবিধানের ধারাবাহিকতা ভাঙা যাবে না। অর্থাৎ গণ-অভ্যুত্থান হলেও পুরানা ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থাই অপরিবর্তিত থাকবে এবং তার বৈধতা প্রশ্নাতীত থাকবে। তিনি নিজেই বলেছেন, তাকে সরানোর চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু তিনি সফলভাবে দায়িত্বে বহাল থেকেছেন এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়া টিকিয়ে রেখেছেন। এর অর্থ দাঁড়ায় যে মুহূর্তে গণ-আন্দোলনের ফলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শীর্ষে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তখন তিনি নিজেকে পুরানা সংবিধান বহাল রাখার ধারাবাহিকতার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।

রাষ্ট্রপতির অবস্থান রাজনৈতিক সাহিত্যে ‘সাংবিধানিক প্রতিবিপ্লব’ হিসাবে গণ্য হয়। কথাটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণের ভাষা। এর সহজ অর্থ হলো : জনগণ যদি একটি ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করে, কিন্তু সেই ব্যবস্থার আইনগত কাঠামো অক্ষণœ রেখে আবার নতুন করে ক্ষমতা সাজানো হয়, তাহলে তা বিপ্লবের নৈতিক শক্তিকে সীমিত করে। রাষ্ট্রপতি নিজেই বলেছেন যে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব তার পাশে ছিলেন, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তিনি আমাদের দিয়েছেন : ‘তিন বাহিনীর পক্ষ থেকে আমাকে সর্বোচ্চ সমর্থন দিয়েছে’। অর্থাৎ, আন্দোলনের পরে ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব এবং তিন বাহিনীর প্রধান তাকে সমর্থন দিয়েছে। এটিকে কেউ দেখবেন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা হিসেবে; আবার কেউ বলবেন এটি ছিল জনগণের প্রত্যাশিত মৌলিক রূপান্তরের স্পষ্ট বিরোধিতা এবং পুরনো লুটেরা ও চরম গণবিরোধী ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা।

সরল ভাষায় বিষয়টি এমন- মানুষ যদি একটি বাড়ি ভেঙে নতুন করে গড়তে চায়, কিন্তু কর্তৃপক্ষ বলে দেয়ালগুলো ঠিকই আছে, শুধু রঙ বদলান তাহলে সেটি কি পুরা বদল? গণ-অভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রত্যাশা ছিল নতুন গঠনতন্ত্র, নতুন রাষ্ট্রের ভিত্তি নির্মাণ। কিন্তু রাষ্ট্রপতির অবস্থান ছিল জনগণের অভিপ্রায়ের বিরোধী পুরনো সংবিধানের মধ্যেই সমাধান হবে। তিনি এটিকে কৃতিত্ব হিসেবে দেখছেন পুরনো সংবিধান টিকিয়ে রাখা গেছে, রাষ্ট্র ভেঙে পড়েনি।

রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকারে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হলো- তিনি জনগণের আন্দোলনকে পরোক্ষভাবে ‘অস্থিতিশীলতার সম্ভাবনা’ হিসেবে দেখছেন, আর সাংবিধানিক ধারাবাহিকতাকে ‘রক্ষাকবচ’ হিসেবে তুলে ধরছেন। এখানেই বিতর্কের কেন্দ্র। গণসার্বভৌমত্ব মানে জনগণের ইচ্ছা সর্বোচ্চ; কিন্তু সাংবিধানিক রাষ্ট্র বলে ইচ্ছা আইন মেনে চলবে। যখন এই দুইয়ের সঙ্ঘাত হয়, তখন যিনি আইনকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন, তিনি বলবেন তিনি স্থিতিশীলতা রক্ষা করছেন; আর যিনি জনগণের ইচ্ছাকে অগ্রাধিকার দেন, তিনি বলবেন আইনকে জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের মানুষের জন্য সহজ সত্যটি হলো : ৫ আগস্ট মানুষ রাস্তায় নেমে একটি সরকার সরিয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থা বদলায়নি। রাষ্ট্রপতি বলেছেন, সেটাই তার সাফল্য।

রাষ্ট্রপতির পদ নিয়ে কেন বিএনপিতে অনাগ্রহ : রাষ্ট্রপতির পদে বিএনপির কেউ গেলে তাকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে ভবিষ্যতে সংস্কার সম্ভব হলে সে অনুসারে ক্ষমতা ভাগাভাগি করতে হবে। দুই বারের বেশি প্রধানমন্ত্রী না হওয়া বা একই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী, দলের প্রধান ও সংসদ নেতা যাতে না হন এমন সংস্কার বিএনপি পছন্দ করছে না। প্রধান বিচারপতি, সেনাবাহিনী প্রধানসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে পরামর্শ বা ভারসাম্যের বিষয়টিও রয়েছে। এসব বিষয় খেয়াল রেখে বিএনপির কেউ রাষ্ট্রপতির পদে গিয়ে রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে নিজেকে জড়াতে চাচ্ছেন না। রাষ্ট্রপতি পদ নিয়ে দলটির নেতাদের মধ্যে এক ধরনের অনাগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণেই কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ নিয়ে আলোচনার কোনো উদ্যোগই নিচ্ছে না বিএনপি।

কেন রাষ্ট্রপতিকে রাখতে চায় বিএনপি : রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর সাথে বিএনপির চমৎকার সম্পর্কের রসায়ন শুরু ৫ আগস্টের পর থেকেই। চুপ্পুও বিএনপির ইচ্ছা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন এমন আশ্বাস ও আস্থা রয়েছে উভয় দিক থেকেই। প্রমাণ হিসেবে শপথের গোপনীয়তা ভেঙে রাষ্ট্রপতি বিএনপি, সেনাবাহিনী ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাথে তার সম্পর্কের বিস্তারিত বলেছেন, যা তিনি বলতে পারেন না। আওয়ামী লীগের সাথে বিএনপির সম্পর্কের ভরকেন্দ্র কার্যত রাষ্ট্রপতি চুপ্পু। ভবিষ্যতে তিনি কোন দলের পারপাজ সার্ভ করবেন তা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক চাহিদাই বলে দেবে। আপাতত আওয়ামী লীগের সাথে বিএনপির সম্পর্কের চমৎকার বোঝাপড়া যোগসূত্র হয়ে দাঁড়িয়েছেন রাষ্ট্রপতি। নির্বাচনে না ভোট দেয়া ছাড়াও বিএনপি প্রার্থীকে ভোট দেয়ার প্রতিদান হিসেবে বিএনপি মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মামলা প্রত্যাহারের পাক্কা ওয়াদা হিসেবে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের জামিন প্রাপ্তি, জামিনের পর তাদেরকে বিএনপি নেতার মিষ্টি নিয়ে অভিনন্দন জানাতে যাওয়া ও বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের অফিস খোলাসহ ছোটখাটো ঝটিকা মিছিলের মধ্যে দিয়ে দলটির নেতাকর্মীরা সংগঠিত হয়ে রাজনীতিতে ফিরে আসছে, যা বিএনপি বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রতি সম্মানজনক এক অভিপ্রায় হিসেবে দেখছে।

রাষ্ট্রপতি নিজেও বলেছেন বিএনপি চাইলে থাকব, না চাইলে চলে যাবো। অথচ নির্বাচনের আগে রয়টার্সকে হোয়াটসঅ্যাপে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন তিনি অপমানিত বোধ করছেন। নির্বাচনের পর তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াবেন। দাঁড়াননি। বরং এখন বলছেন নতুন সরকার আসার পর তারা যা চাইবেন তিনি তাই করবেন। তিনি তারেক রহমানের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তারেক রহমানের নেতৃত্বে রাষ্ট্রপতি আশাবাদী হয়ে উঠেছেন? প্রশ্ন হচ্ছে কিসের জন্য? ভবিষ্যতে শেখ হাসিনা যাতে ‘চট’ করে দেশে ফিরে আসতে পারেন এমন পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য? বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, ‘সাপকে বিশ্বাস করা যায়, আওয়ামী লীগকে নয়।’ কিন্তু তারেক রহমান রাজনীতির ওঝা হয়ে কি রাষ্ট্রপতির ওপরই ভরসা খুঁজছেন। ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা যাতে নষ্ট না হয়, নির্বাচন বাধাগ্রস্ত না হয় এবং সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার কথা বলে রাষ্ট্রপতি চুপ্পুকে সরাতে চায়নি বিএনপি। বিএনপির সেই ভূমিকায় রাষ্ট্রপতি অভিভূত হলেও এখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। না পারছেন বঙ্গভবন ছেড়ে চলে যেতে, না পারছেন তার আওয়ামী রাজনীতির প্রতি দায়বদ্ধতা এড়াতে। ২০২৪ সালে বিএনপি রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম থাকার অভিযোগ তুলেছিল। এমন অনেক তথ্যপ্রমাণ বিএনপির হাতে রয়েছে যে কারণে রাষ্ট্রপতি চাহিবা মাত্রই কলের পুতুলের মতো ভূমিকা পালন করতে পারেন। জুলাই সনদের বাস্তবায়ন, অন্তর্বর্তী সরকার ও আওয়ামীলীগের বিচারসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বৈধতা দিতে হবে রাষ্ট্রপতিকে। এ জন্যে রাষ্ট্রপতিও তোষামোদ করছেন বিএনপি সরকারকে।

বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান রিপন রাষ্ট্রপতিকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস ওনার মতো ‘হ্যান্ডপিক’ কেউ ছিলেন না। গণ-অভ্যুত্থানের পর জন-আকাক্সক্ষার সরকার প্রধান ছিলেন ইউনূস। উনি লুটেরা এস আলমের ‘থলেদার’ ছিলেন। লাভজনক ইসলামী ব্যাংককে ‘ফোকলা’ করে ফেলার সময় ব্যাংকটির ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগ পর্যন্ত। হাসিনাকে কদমবুসি করতে গিয়েছিলেন। উনি মিথ্যাচার করে বলছেন হাসিনা সরকারের সময়ে ওনাকে লিখিত জানানো হতো অনেক কিছু, ‘ক্যান হি শো সিঙ্গেল পেপার?’ আমাদের দুর্ভাগ্য হচ্ছে এই দেশের মানুষ ‘পা খোঁজা’ লোককে প্রেসিডেন্ট বানায়।

ওথ অব সিক্রেসি ভায়োলেট

সুুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার শিশির মনির বলেন, মহামান্য রাষ্ট্রপতি বলতে পারেন না তিনবাহিনীর প্রধান বা কে তার সাথে কি আলোচনা করেছে। তখনকার প্রধান বিচারপতির মাধ্যমে কি কথা হয়েছে, বিএনপির কোন উচ্চপর্যায়ের নেতার সাথে কি কথা হয়েছে, এগুলো তিনি বলতে পারেন না। স্কোপটা তিনি কোথায় পেয়েছেন? বিএনপি না চাইলেও মনোজগতে ধারণা তৈরি হয়েছে যেহেতু বিএনপি সংবিধান সংস্কারের শপথ নিচ্ছে না, সংবিধান বাস্তবায়ন আদেশ ২০২৫কে বিএনপি মান্য করছে না, সুতরাং আমরাও করতে পারি। এই বিষয়টা মান্য করে সংসদে দ্বিতীয় শপথ নিলে আজকে যে ডিসকনটেন্ট তৈরি হয়েছে, অনেকে সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করছেন, এটা পারতেন না। আজকে বলা হচ্ছে সংবিধানে দ্বিতীয় শপথের কথা নাই তাই বিএনপি নেয়নি, বিএনপি কি একবারো বলেছে, সংবিধানে ২০২৬ সালে নির্বাচনের কথা ছিল না, নির্বাচনে অংশ নিয়েছে বিএনপি, সংবিধানে অন্তর্বর্তী সরকারের কথা নেই তাই বেগম জিয়ার মুক্তি আমরা নেব না, ১০ ট্রাক মামলা, একুশে আগস্ট গ্রেনেড হত্যা মামলা থেকে মুক্তি চাইব না অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে, অন্তর্বর্তী সরকার গঠন সাংবিধানিক না তাই সংস্কার ও সরকার আয়োজিত নির্বাচন আমরা মানি না। বিএনপি কি একবার বলেছে যে নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছে যে ব্যবস্থায় তা মানি না। একবারও তো এসব বলেনি।

সবার নজর সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের দিকে

সংসদের প্রথম অধিবেশনে দেয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি জুলাই আন্দোলনকে স্বীকৃতি দেবেন কি না তার অপেক্ষায় রয়েছে সবাই। তার ভাষণে জুলাই বিপ্লব, জুলাই সনদ, হাসিনার ফ্যাসিবাদ, গুমখুন, হাসিনার বিচার নিয়ে কি কোনো বক্তব্য থাকবে কী না।

রাষ্ট্রপতির ট্র্যাক রেকর্ড

বিচারক ও দুদকের কমিশনার হিসেবে রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে তার বিরুদ্ধে অর্থ কেলেঙ্কারির নানা অভিযোগ ওঠে। ইসলামী ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে ব্যাংকটি থেকে অর্থপাচারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেননি তিনি। সর্বশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাষ্ট্রীয় কোনো ক্রোড়পত্রে তার ছবি ও বাণী প্রকাশিত হয়নি। আদতে এটি অসত্য। বিচারবিভাগ থেকে যারা রাষ্ট্রপতি হয়েছেন তাদের সকলেই ছিলেন হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি। হাসিনার শাসনামলে উপসচিব পর্যায়ে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি হিসেবে তাকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিয়োগ দিলে পদটির অবমূল্যায়নে ব্যাপক সমালোচনা হয়। ২০০৮ সালে বিএনপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগে যে তদন্ত কমিশন গঠন করা হয় তার প্রধান ছিলেন সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংকের দুর্নীতির অভিযোগ মিথ্যা বলে একটি তদন্ত কমিশনের প্রধান হিসেবে তিনি দাবি করেন। হাসিনার শাসনামলে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হওয়ার বিরুদ্ধে দুদকে থেকেও চুপ্পু ও তার সহযোগীরা কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেননি। ২০২৪ সালে কেন শেখ হাসিনা জরুরি এমন শিরোনামে চুপ্পু বাংলাদেশ প্রতিদিনে লেখা নিবন্ধে বেগম খালেদা জিয়াকে এতিমের টাকা আত্মসাৎ করে দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্ত ও তারেক রহমানকে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা ও ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে দেশান্তরে এবং তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির বিষয়টি উল্লেখ করেন। নিবন্ধে চুপ্পু প্রশ্ন তোলেন, জনগণ কাকে ভোট দেবে, আওয়ামী লীগের বাইরে আর কে আছে? কারা, কেন, কি কারণে, কোন সুখের স্বপ্নে, কোন আশায় বিএনপিকে ভোট দেবে?