নিজস্ব প্রতিবেদক
ঘন কুয়াশায় দিনের বেশির ভাগ সময় সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। ফলে সারা দেশেই দিনের সার্বিক তাপমাত্রা আরো কিছুটা কমেছে। এ দিকে প্রচণ্ড শীতে খোলা আকাশের নিচে রেল, বাস অথবা লঞ্চ স্টেশনে রাত যাপনকারীদের দুর্ভোগ বেড়েছে। এতো শীতেও শীতবস্ত্র বিতরণে সরকারের বড় ধরনের কোনো কর্মসূচি চোখে পড়েনি। তবে ব্যক্তি বা ছোট ছোট সংগঠনের উদ্যোগে ঢাকা শহরে কিছু কম্বল বিতরণ করা হয়েছে।
এ অবস্থায় আজ দেশের কোথাও আবহাওয়া দফতর শৈত্য প্রবাহের পূর্বাভাস দেয়নি। তবে দেশব্যাপী কুয়াশা চলমান থাকবে। ঘন কুয়াশায় বিমান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, গতকালও বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের আটটি ফ্লাইট ঢাকায় অবতরণ করতে পারেনি। কুয়াশা ঘন হলে পাইলট উপর থেকে রানওয়ে দেখতে পারেন না। ফলে বিমানবন্দরের চারপাশে ঘুরতে থাকে রানওয়ে দেখার অপেক্ষায় কিন্তু জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে কাছের অন্য কোনো বিমানবন্দরে গিয়ে অবতরণ করা হয়। শুধু যে বিমান চলাচল ব্যাহত হয়েছে তা নয় গতি কমে গেছে রাতের বেলা চলাচলরত দীর্ঘ যাত্রার বাস ও অন্যান্য যানবাহনের। একই অবস্থা ছিল রাতের লঞ্চ চলাচলে।
গতকাল যশোরে সর্ব নিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৮.৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস যা সারা দেশেও সর্বনিম্ন। ঠাণ্ডা বেড়ে যাওয়ায় জীবন যাত্রায় কিছুটা প্রভাব পড়েছে। কাজ না থাকলে অলস দিন পার করেছেন অনেকেই। আবার প্রচণ্ড শীতে খেটে খাওয়া মানুষকে সকাল সকাল বের হতে হয়েছে, এ শ্রেণীর মানুষের কষ্টের সীমা ছিল না। গতকাল ঢাকা শহরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৩.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বছরের এ সময়টায় বাংলাদেশ ঘন কুয়াশার দাপট থাকে। দেশের বাইরে থেকে আসতে থাকে কুয়াশার মেঘ। কুয়াশা গতকাল দেশের প্রায় সব জেলায় দেখা গেছে। বাংলাদেশের পশ্চিম-উত্তর অঞ্চলের দিকে ভারত থেকে প্রচুর কুয়াশা আসছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ মোস্তফা কামাল পলাশ।
কুয়াশা মূলত বাতাসে ভাসমান পানির ক্ষুদ্র কণার সমষ্টি। শীতকালে রাতের তাপমাত্রা কমে গেলে বাতাসে থাকা জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে কুয়াশা তৈরি করে। বিশেষ করে যখন বাতাস শান্ত থাকে এবং আকাশ পরিষ্কার থাকে, তখন ভোররাতে কুয়াশার ঘনত্ব বেশি হয়। নদী, খাল ও জলাশয়বেষ্টিত এলাকায় কুয়াশা বেশি দেখা যায়।
৪৭ বরযাত্রী ১৬ ঘণ্টা পর উদ্ধার : ঘন কুয়াশায় পথ হারিয়ে যমুনা নদীর মাঝখানে আটকে পড়া নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ৪৭ জন বরযাত্রীকে ১৬ ঘণ্টা পর উদ্ধার হয়েছেন। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তারা জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার জামথল ঘাটে এসে পৌঁছান। এর আগে শুক্রবার রাতে বগুড়ার সারিয়াকান্দী থেকে মাদারগঞ্জ যাওয়ার পথে ঘন কুয়াশার কবলে পড়ে মাঝ নদীতে আটকা পড়েছিল তাদের বহনকরা নৌযান।
তারা শুক্রবার সকালে মাদারগঞ্জ উপজেলার তারতাপাড়া এলাকার সানোয়ার হোসেনের ছেলে নিলয় হাসান ছানির বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বগুড়া শহরের সাবগ্রাম এলাকায় যান। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে বর-কনেসহ বরযাত্রীরা সন্ধ্যা ৬টার দিকে সারিয়াকান্দীর কালীতলা ঘাট থেকে নৌকায় মাদারগঞ্জের জামথল ঘাটের উদ্দেশে রওনা হয়ে যমুনা নদীর মাঝখানে পৌঁছালে তীব্র কুয়াশায় মাঝি দিক হারিয়ে ফেলেন। রাত ৮টা থেকে ১২টা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় চেষ্টা করেও পথের দিশা না পেয়ে নিরাপত্তার খাতিরে নৌকাটি মাঝ নদীতে নোঙর করে রাখা হয়। এ সময় নৌকাটিতে ১৭ জন নারী ও ৯ জন শিশুসহ মোট ৪৭ জন যাত্রী ছিলেন। হাড়কাঁপানো শীতে রাতভর মাঝ নদীতে অবস্থান করায় তারা চরম ভোগান্তিতে পড়েন।
ভুক্তভোগীরা জানান, রাতে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-সহ পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সাথে যোগাযোগ করা হলেও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধারকারী দল সেখানে পৌঁছাতে পারেনি। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কুয়াশা কিছুটা কেটে গেলে বিকল্প দু’টি নৌকার সাহায্যে যাত্রীরা নিরাপদে ঘাটে ফিরে আসেন।
লঞ্চ-ফেরি চলাচল বিঘিœত : এ দিকে ঘন কুয়াশার কারণে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ও মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া এবং মানিকগঞ্জের আরিচা ও পাবনার কাজিরহাট নৌপথে ফেরি ও লঞ্চ চলাচল ১৪ ঘণ্টা বন্ধ ছিল। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে শুরু হওয়া ঘন কুয়াশায় দুর্ঘটনার ঝুঁঁকি এড়াতে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া এবং আরিচা-কাজিরহাট নৌরুটে ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল। গতকাল সকাল পৌনে ১০টায় আবার চালু করা হয়।
বিআইডব্লিউটিসি সূত্র জানায়, শুক্রবার সন্ধ্যা সোয়া ৭টা থেকে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া এবং রাত সোয়া ৮টা থেকে আরিচা-কাজিরহাট নৌপথে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখা হয়। একই কারণে রাত ৮টা থেকে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া রুটে লঞ্চ চলাচলও বন্ধ করে দেয় বিআইডব্লিউটিএ।
এর আগে দৌলতদিয়া ঘাট থেকে ছেড়ে যাওয়া যাত্রীবাহী একটি লঞ্চ দিক হারিয়ে ঘাট থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে পদ্মার চরে আটকা পড়ে। পরে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে নৌপুলিশের সহায়তায় রাত ১২টার দিকে যাত্রীদের উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া বিকেল থেকে আরিচা-কাজিরহাট নৌপথেও লঞ্চ চলাচল বন্ধ ছিল
বিআইডব্লিউটিসি আরিচা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, কুয়াশার কারণে এক সপ্তাহ ধরে নৌযান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে দৌলতদিয়া থেকে ছেড়ে যাওয়া শাহ মখদুম, এনায়েতপুরী ও ভাষাশহীদ বরকত নামে তিনটি বড় ফেরি মাঝ নদীতে কুয়াশার কবলে পড়ে। দিক নির্ণয় করতে না পেরে ফেরিগুলো মাঝ নদীতে নোঙর করে রাখা হয়।
সে খবর পেয়ে সন্ধ্যা সোয়া ৭টা থেকে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। এ সময় দৌলতদিয়া প্রান্তে কোনো ফেরি ছিল না। পাটুরিয়া প্রান্তে হাসনাহেনা, বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন, শাহ পরান, কেরামত আলী, ভাষাশহীদ বরকত ও বীরশ্রেষ্ঠ গোলাম মাওলা নামের পাঁচটি ফেরি নোঙর করতে বাধ্য হয়। পারাপার বন্ধ থাকায় উভয় ঘাটে বেশ কিছু যানবাহন আটকা পড়ে।
বিআইডব্লিউটিসি আরিচা কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক আবু আবদুল্লাহ রনি বলেন, কাজিরহাট ঘাট এলাকায় চিত্রা ও শাহ আলী এবং নদীতে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান ও ধানসিঁড়ি নামের ফেরিগুলো নোঙর করে রাখা হয়। পাশাপাশি লঞ্চ চলাচলও বন্ধ রাখা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করেন বিআইডব্লিউটিএ আরিচা কার্যালয়ের ট্রাফিক সুপারভাইজার মো: শিমুল ইসলাম।
এদিকে আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, গতকাল দিনগত মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে এবং কোথাও কোথাও তা দুপুর পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। ঘন কুয়াশার কারণে বিমান চলাচল, অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল এবং সড়ক যোগাযোগ সাময়িকভাবে ব্যাহত হতে পারে।
সেই সাথে সারা দেশে রাতের এবং দিনের তাপমাত্রা সামান্য বাড়তে পারে। কুয়াশাচ্ছন্ন আবহাওয়ার কারণে দেশের অনেক জায়গায় শীতের অনুভূতি অব্যাহত থাকতে পারে।
শনিবার দিনগত রাত ১টা থেকে পরবর্তী ৭-৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশের নদী অববাহিকায় মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশার কারণে দৃষ্টিসীমা ২০০ মিটার বা কোথাও কোথাও এর চেয়ে কম হতে পারে। এসব এলাকার নৌ-যানগুলোকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে।



