মনিরুল ইসলাম রোহান
বিদেশে পালিয়ে যাওয়া নেতৃত্বের উসকানির ফাঁদে পড়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় নিষিদ্ধ দলের নেতাকর্মীরা পরিকল্পিতভাবে একটি ন্যারেটিভ দাঁড় করিয়ে সত্য-মিথ্যার সংমিশ্রণে চটকদার ফটোকার্ড এবং কন্টেন্ট ক্রিয়েট করে ভুয়া অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর কাজ করছে। ফ্যাসিস্ট আমলের সুবিধাভোগীরা অর্থনৈতিক সেক্টরকেও অস্থিতিশীল করতে তৎপরতা চালাচ্ছে। পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিবেশ ঘোলাটে করার মধ্য দিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে আওয়ামী লীগকে কার্যত প্রাসঙ্গিক করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে নজিরবিহীন পতন ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের। ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়েন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই সময় তার সরকার ও দলের মন্ত্রী, এমপি ও শীর্ষ নেতৃত্বসহ অন্তত কয়েক হাজার নেতাকর্মী নিরাপদ আশ্রয়ে ভারতসহ অন্যান্য দেশে পাড়ি জমান। দেশের অভ্যন্তরে যেসব নেতাকর্মী ছিলেন ওই সময় তাদের বেশিরভাগই আত্মগোপনে চলে যান। সম্প্রতি শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরা সংক্রান্ত একটি অডিও ক্লিপ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। হাসিনার ওই ঘোষণার পরই আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঝটিকা মিছিল করছে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় “আপা আসছে, বাংলাদেশ হাসছে” স্লোগানে ঝড় তুলছে। সোশ্যাল মিডিয়া পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, লন্ডন ও মার্কিন মুল্লুকসহ বিদেশে পালিয়ে থাকা সাবেক আইনমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, সাবেক এমপি শামীম ওসমানসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতৃত্বের কিছু ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত, গাজীপুরের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলম সরকারসহ পতিত সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী-এমপি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেখ হাসিনার দেশে ফেরা সংক্রান্ত কয়েকটি উসকানিমূলক পোস্ট করেছেন, যেগুলো এ দেশে আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রভাব ফেলছে। নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, বিদেশে পালিয়ে থাকা নেতারা এ দেশে অবস্থান করা নেতাদের সাথে বিভিন্ন ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। সাবেক ও বর্তমান ছাত্রলীগের কয়েকটি গ্রুপও সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় রয়েছে। তাদের কয়েকটি অভ্যন্তরীণ গ্রুপে তথ্যের আদান প্রদানও করা হয় এবং তৃণমূল নেতাকর্মীদের এখনো পতিত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের বিভিন্ন নির্দেশনা পালন করার জন্য বিশেষ নির্দেশনা দেয়া হয়। ওই নির্দেশনা পেয়ে মূলত সোশ্যাল মিডিয়ায় একযোগে ঝাপিয়ে পড়ে তারা এবং ঝটিকা মিছিল ও গোপন বৈঠক করে নির্দেশনা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি গ্রহণ করে।
বিশ্বস্ত সূত্র বলছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দেশে ও বিদেশে পলাতক নেতাকর্মীরা অন্তত দেড় হাজার থেকে দুই হাজার ভুয়া অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করছে। দেশের অভ্যন্তরে খুন, হত্যা ধর্ষণ কিংবা মব ভায়োলেন্সের মতো কোনো ঘটনা ঘটার আগেই ওইসব ভুয়া অ্যাকাউন্টগুলো আগে থেকেই সক্রিয় থাকে। ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই ফুলিয়ে ফাপিয়ে গুজব ছড়িয়ে ঘটনাকে ভিন্নমাত্রা দেয়ার জন্য একটি হাইপ তুলে দেয়া হচ্ছে।
ড. ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও একের পর এক ইস্যু তৈরি করে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়েছিল কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ। যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের কঠোরনীতির কারণে তাদের সেই তৎপরতা ওই সময় বেশিদূর আগাতে পারেনি। পতিত দলটি এখন রাজনৈতিক মাঠ উত্তপ্ত করার জন্য লোকবল সঙ্কটে সোশ্যাল মিডিয়াকে বেছে নিয়েছে। রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে প্রাসঙ্গিক করতে নানা ন্যারেটিভ তৈরি করে আলোচনায় থাকার কৌশলের পথ বেছে নিয়েছে তারা।
পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের এক সময়কার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজীম আহমেদ সোহেল তাজ তার ফেসবুকে এক পোস্টে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে লিখেছেন, “ইদানিং শুনছি যে ছাত্র- জনতার ঝাঁটাপেটা খেয়ে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন নাকি আবার দেশে ফেরার কথা বলছেন। তিনি আসবেন ভালো কথা কিন্তু আমার কথা হচ্ছে যে একজন মানুষ কত নির্লজ্জ/বেহায়া হলে তার সব কৃতকর্মকে (গণহত্যা, গুম, খুন, দুর্নীতি, গণতন্ত্র কবর, নিজ স্বার্থে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অপব্যবহার করা, দেশ এবং মানুষের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা, আওয়ামী লীগ কে ধ্বংস করা, দুর্নীতি/লুটপাট করে লাখ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা) অস্বীকার করে মানুষকে এবং দলকে বিভ্রান্ত করে এখন ফিরে আসার অবাস্তব স্বপ্ন দেখাচ্ছেন ও নিজের ভুল স্বীকার না করে, কোনো অনুশোচনা, আত্মসমালোচনা না করে বরং একটি মিথ্যা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দিয়ে আওয়ামী লীগ দলটিকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছেন এবং দেশের মানুষকে একটি অন্ধকারের পথে ঠেলে দিচ্ছেন। তিনি আরো লিখেছেন, ইতিহাস বলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মত স্বৈরাচারের আবার ফিরে আসা এবং ক্ষমতা ফিরে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। পৃথিবীর ইতিহাসে তিনজন সফলভাবে ফিরে আসতে পেরেছিলেন : প্রথম জন ১৯৫০ সালে ব্রাজিলের গুইতালিও ভার্গাস, দ্বিতীয় হচ্ছে ৭০৫ সালে বিজান্টিন সম্রাট জাস্টিনিয়ান (২য়) এবং (১৮৩৩- ৫৫) মেক্সিকোর এন্টোনিও লোপেজ ডি সান্টা আনা। উল্লেখ্য এদের সবাইকে সামরিক অভ্যুথানে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের জনগণ একটি গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উৎখাত করে এবং তিনি বাধ্য হন পালিয়ে যেতে এবং ভুলে গেলে চলবে না যে তার সরাসরি নির্দেশে শিশুসহ শত শত মানুষকে হত্যা করা হয়, ৬০০ মানুষ অন্ধ হয়ে যায় এবং হাজার হাজার নিরীহ মানুষ পঙ্গু হয়। তিনি ফিরে আসতে পারেন ঠিকই কিন্তু ক্ষমতায় যাবেন না- যাবেন জেলে।”
বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুম মনে করেন, দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের বিপদের মুখে ফেলে দিয়ে শেখ হাসিনা এবং তার দলের শীর্ষ নেতারা বিদেশে পালিয়ে গেছে। এখন দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের উসকানি দিচ্ছে। শেখ হাসিনার ওই উসকানির ফাঁদে তারা পা দিয়ে ঘর থেকে বের হচ্ছে, ঝটিকা মিছিল করছে, গোপন বৈঠক করছে আর এ সবের কারণে পুলিশ তাদের গ্রেফতার করবে- এটাই স্বাভাবিক। শেখ হাসিনার উসকানির ফাঁদে পা দিয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখা পতিত দলের নেতাকর্মীদের পরিবারও ক্ষতির মুখে পড়বে। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টই আওয়ামী লীগের কবর রচনা হয়েছে। শেখ হাসিনা যে দেশে আর স্বাভাবিকভাবে ফিরতে পারবে না তা পতিত দলের তৃণমূল নেতাকর্মীরা যত তাড়াতাড়ি বুঝবে তাদের জন্য ততই মঙ্গল হবে।



