নির্ধারিত বন্দরে নামতে না পারায় বিমানের ক্ষতি লাখো ডলার

ঘন কুয়াশায় রানওয়ে দেখা যায় না

Printed Edition

মনির হোসেন

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ছেড়ে আসা বিমানের কিছু ফ্লাইট সাম্প্রতিক সময়ে ঘন কুশায়ার কারণে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে পারছে না। রানওয়ে দৃশমান (ভিজিবিলিটি) না থাকায় ওই ফ্লাইটগুলো কখনো চট্টগ্রাম, সিলেটে আবার কখনো পাইলট উপায় না পেয়ে মিয়ানমার, ব্যাংকক ও ভারতের কলকাতা বিমানবন্দরে নিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিডিউল অনুযায়ী এসব ফ্লাইট ঢাকায় অবতরণে ব্যর্থ হওয়ায় উড়োজাহাজ কোম্পানিগুলোর একদিকে যেমন লাখ লাখ ডলার ক্ষতি গুনতে হচ্ছে একই সাথে এসব এয়ারক্র্যাফটের আয়ুষ্কালও (লাইফে) ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। এর সাথে অবর্ণনীয় যাত্রীদুর্ভোগ তো রয়েছেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গতকাল রোববার ভোরের দিকে দুবাইয়ের শারজাহ থেকে ছেড়ে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বোয়িং-৭৩৭-৮০০ মডেলের একটি ফ্লাইট (বিজি-১৫২) সিলেট হয়ে ঢাকায় অবতরণ করার কথা ছিল। কিন্তু ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় আসার পরও ঘন কুয়াশার কারণে রানওয়ে দেখতে না পেয়ে পাইলট ফ্লাইট ঘুরিয়ে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিয়ে নিরাপদে অবতরণ করান। শুধু এদিন নয়, এর একদিন আগেই শুধু বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সেরই একে একে ছয়টি ফ্লাইট ডাইভার্টের ঘটনা ঘটে। এসব ফ্লাইট মিয়ানমারের ইয়াংগুন, ব্যাংকক, ভারত, চট্টগ্রাম ও সিলেটের এম এ জি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্যানুযায়ী শৈত্যপ্রবাহ শুরু হওয়ার পর থেকে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুটের অসংখ্য ফ্লাইট ঘন কুয়াশার কারণে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করতে পারেনি। এসব ফ্লাইট কন্ট্রোল টাওয়ারের নির্দেশনা মোতাবেক পার্শ্ববর্তী দেশে নামার কারণে বিমান কোম্পানিগুলোর অনেক টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে রয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স। এ ছাড়া বিদেশী কয়েকটি এয়ারলাইন্সও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।

গতকাল সকালে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নিজের পরিচয় গোপন রাখার শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, কুয়াশার কারণে প্রতিনিয়ত ফ্লাইট ডাইভার্ট বা ঘুরিয়ে দিতে হচ্ছে। তবে কুয়াশার কারণে যাতে বিমান অবতরণ করাতে কোনো সমস্যা না হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে প্রতিদিনকার ফ্লাইটগুলো রি-শিডিউল করেছে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আসলে আবহাওয়ার বিষয়টিতো আর কেউ নিশ্চিত করার সুযোগ নাই। কখন কোন ধরনের আবহাওয়া থাকবে সেটি প্রকৃতির বিষয়। তবে যেসব ফ্লাইট দেশের বাইরের বিভিন্ন স্টেশন থেকে ছেড়ে আসছে সেগুলো ভিজিবিলিটি দেখে তারপর নামে। এর আগ পর্যন্ত ওই এয়ারক্র্যাফট আকাশেই উড়তে থাকে। তবে যেসব এয়ারক্র্যাফটের জ্বালানি সঙ্কট থাকে সেই ফ্লাইটের পাইলট হোল্ড না করে কাছাকাছি কোনো এয়ারপোর্টে গিয়ে অবতরণ করছে। অপর এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, যেসব ফ্লাইটের পাইলটরা ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তারা ভেতরে থাকা যাত্রীদের ল্যান্ড না করার কারণ জানিয়েই যাচ্ছেন। এ ক্ষেত্রে যাত্রীদের মধ্যে কেউ কেউ আতঙ্কিত হলে তা স্বাভাবিক বলে তিনি জানান। তবে এখনো এ ধরনের কোনো সমস্যা হয়নি। তবে এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের লোকসান হচ্ছে।

কুয়াশার কারণে এয়ারক্র্যাফটের সেফটির বিষয়ে জানতে গতকাল সকালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট সেফটি বিভাগের প্রধান ক্যাপ্টেন এনাম এর সাথে যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু তিনি টেলিফোন ধরেননি।

দীর্ঘদিন এভিয়েশনের সাথে সম্পৃক্ত একজন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ গতকাল সকালে নয়া দিগন্তকে বলেন, ফগের কারণে আমাদের বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস বাংলাসহ অন্যান্য এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ডাইভার্ট হওয়ায় লাখ লাখ ডলারের ক্ষতি হচ্ছে। একই সাথে যাত্রীদের টাইমও লস হচ্ছে। এর সাথে ভোগান্তি তো আছেই। উন্নত বিশ্বে ইউরোপ, আমেরিকায় ফগ না হলেও সেখানে তুষারপাত হয়। ওই সব দেশের কর্তৃপক্ষ অবশ্য এয়ারপোর্ট পরিচালনায় উন্নত ইকুইপমেন্টের সাপোর্ট দেয়ার পাশাপাশি পাইলটদেরও এ ক্ষেত্রে দক্ষ করে গড়ে তোলে। যার কারণে তাদের তুষারপাতের সময়ও স্বাভাবিকভাবে ফ্লাইট চালাতে সমস্যা হয় না। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি ভাবা অনেক কঠিন।

এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, আমাদের সিভিল এভিয়েশন অথরিটির একটি আইন রয়েছে, ভিজিবিলিটি কমপক্ষে ৮০০ মিটার এর নিচে হলে পাইলটরা তাদের উড়োজাহাজ অবতরণ করাতে পারবে না। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে করা হচ্ছে। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ রুটের অনেক ফ্লাইট ৫০০-৬০০ ভিজিবিলিটি (দৃশমানতা) হলেই এয়ারক্র্যাফট অবতরণ করাচ্ছে। এটা খুবই রিস্ক। যেকোনো সময় ঘটছে পারে দুর্ঘটনা।

অপর এক প্রশ্নের উত্তরে এই এভিয়েশন এক্সপার্ট বলেন, একটি এয়ারক্র্যাফট তৈরির সময় কতবার উড়োজাহাজ ল্যান্ডিং এবং টেকঅফ করতে পারবে সেটির লিমিট নির্ধারণ করে দেয়া হয়। ঘন কুয়াশার কারণে ফ্লাইট নামতে না পারায় ওই এয়ারক্র্যাফটেরও ধীরে ধীরে ক্ষতি হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, শারজাহ থেকে আজ (রোববার ভোর রাতে) যে ফ্লাইট ঢাকায় নামতে না পেরে চট্টগ্রামে গিয়ে নেমেছে। আবহাওয়া পরিষ্কার হওয়ার পর সেই এয়ারক্র্যাফট আবার টেকঅফ করে ঢাকায় ফিরে এসেছে। এতে এয়ারক্র্যাফটের (লাইফ) সাইকেল কমে যাচ্ছে। (সাইকেল হচ্ছে এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশনে যায়)। এতে উড়োজাহাজের লাইফও কমছে। আর্থিক ক্ষতিও হচ্ছে। তবে কোনো এয়ারলাইন্সের ক্ষতির পরিমাণ কত সেটি তারা ভালো বলতে পারবে।