বিশেষ সংবাদদাতা
গত বছরের আগস্টের পর দেশে ঘুষ নেয়ার প্রবণতা কমেছে। আর তিন বছরের ব্যবধানে দারিদ্র্য বেড়েছে ২৮ ভাগ। দেশে বর্তমানে ভোক্তা বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে ২১১ বিলিয়ন ডলার। বছরে পরিবারভিত্তিক গড় ভোক্তা খরচ ছয় লাখ ২৫ হাজার ৪১৬ টাকা।
গতকাল সোমবার বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার পিপিআরসির এক গবেষণায় এমন মিশ্র আর্থসামাজিক চিত্র উঠে এসেছে। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে এলজিইডি মিলনায়তনে ‘ইকোনমিক ডায়নামিকস অ্যান্ড মুড অ্যাট হাউজহোল্ড লেবেল ইন মিড ২০২৫’ শিরোনামের এই গবেষণা ফলাফল প্রকাশ করা হয়। সংস্থার নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান গবেষণার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
এ সময় জানানো হয়, গবেষণায় অংশ নেয়া উত্তরদাতাদের মধ্যে গত বছরের আগস্ট মাসের আগে ৮ দশমিক ৫৪ শতাংশ সেবা নিতে ঘুষ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। আগস্ট মাসের পর এই হার ৩.৬৯ ভাগে নেমে এসেছে। এখনো সবচেয়ে বেশি ঘুষ চলে সরকারি অফিসে। এরপর পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতাদের বেশি ঘুষ দিয়েছে মানুষ।
জরিপে দেখা গেছে তিন বছরের ব্যবধানে দেশে দরিদ্রতা বেড়েছে। বর্তমানে এই হার ২৭.৯৩ বা প্রায় ২৮ শতাংশ। সরকারি হিসাবেই ২০২২ সালে এই হার ছিল ১৮.৭ শতাংশ। এর বাইরে ১৮ শতাংশ পরিবার দারিদ্র্যসীমায় নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। যেকোনো সময় তারা দারিদ্র্যসীমায় নেমে যেতে পারো। জরিপে আরো বলা হয়েছে, বর্তমানে বেশির ভাগ মানুষের খাবারের পিছনেই খরচ হচ্ছে ৫৫ ভাগ অর্থ।
গত মে মাসে আট হাজার ৬৭টি পরিবারের ৩৩ হাজার ২০৭ জনের মতামতের ভিত্তিতে গবেষণাটি করা হয়। পিপিআরসি বলেছে, দেশের এখন তিন ধরনের সঙ্কটের প্রভাব চলমান আছে। এগুলো হলো- কোভিড (২০২০-২০২২), মূল্যস্ফীতি ও রাজনৈতিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা।
শহরে আয় কমেছে, খরচ বেড়েছে : পিপিআরসি গবেষণায় দেখা গেছে, তিন বছরের ব্যবধানে শহরের পরিবারের মাসিক আয় কমেছে, কিন্তু খরচ বেড়েছে। শহরের একটি পরিবারের গড়ে মাসিক আয় ৪০ হাজার ৫৭৮ টাকা। খরচ হয় ৪৪ হাজার ৯৬১ টাকা। ২০২২ সালে শহরের একটি পরিবারের মাসিক গড় আয় ছিল ৪৫ হাজার ৫৭৮ টাকা।
অন্যদিকে গ্রামের পরিবারের গড় আয় কিছুটা বেড়েছে। সেখানে একটি পরিবারের গড় আয় ২৯ হাজার ২০৫ টাকা, খরচ ২৭ হাজার ১৬২ টাকা। ২০২২ সালে গ্রামের পরিবারের গড় আয় ছিল ২৬ হাজার ১৬৩ টাকা। সার্বিকভাবে দেশে গড়ে একটি পরিবারের মাসে আয় ৩২ হাজার ৬৮৫ টাক, পক্ষান্তরে খরচ হয় ৩২ হাজার ৬১৫ টাকা। ফলে সঞ্চয় নেই বললেই চলে।
খাবারে খরচ প্রায় ৫৫ ভাগ : জরিপে দেখানো হয়েছে একটি পরিবারের মাসের মোট খরচের প্রায় ৫৫ শতাংশ চলে যায় খাবার কেনায়। একটি পরিবার খাবার কিনতে মাসে গড়ে ১০ হাজার ৬১৪ টাকা খরচ করে। এ ছাড়া প্রতি মাসে শিক্ষায় এক হাজার ৮২২ টাকা, চিকিৎসায় এক হাজার ৫৫৬ টাকা, যাতায়াতে এক হাজার ৪৭৮ টাকা ও আবাসনে এক হাজার ৮৯ টাকা খরচ হয়।
বাংলাদেশী পরিবারগুলোর জন্য দৈনন্দিন জীবনের নানান হয়রানি এখন সর্বব্যাপী এক সঙ্কটে পরিণত হয়েছে বলে জরিপে বলা হয়েছে। মৌলিক সেবাপ্রাপ্তি থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র ও জনপরিসরসহ সমাজের নানা স্তরেই হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।
এ ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ, চিকিৎসাব্যয়, ঋণ পরিশোধের চাপ, শিক্ষা খরচ এবং আইনি জটিলতার মতো পুরনো সামাজিক সঙ্কটের পাশাপাশি হয়রানি এখন এক স্বতন্ত্র ও ক্ষতিকর সমস্যায় রূপ নিয়েছে, কিন্তু এই বিষয়টি এখনো নীতিগতভাবে যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
প্রতিবেদনে হয়রানি ও দুর্নীতির মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য টেনে বলা হয়েছে, হয়রানির অর্থনৈতিক ও মানসিক ক্ষয়ক্ষতি প্রায়ই উপেক্ষিত হয়। ঘুষ হয়তো মাত্র ১০ টাকা, কিন্তু সেজন্য বিলম্ব ও ঝক্কি-ঝামেলায় হারানো এক সপ্তাহের ক্ষতি তার চেয়ে অনেক বেশি।
জরিপের তথ্যানুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবায় হয়রানি সবচেয়ে প্রকট। সারা দেশের প্রায় ৪৯ ভাগ পরিবার এবং নগর এলাকায় ৫৬ শতাংশ পরিবার স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে নেতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। বাজারে হয়রানির শিকার হওয়ার হারও ব্যাপক, সারা দেশে ৪২ শতাংশ এবং নগর এলাকায় ৫২ শতাংশ পরিবার এ ধরনের অভিযোগ করেছে।
সরকারি সেবায় হয়রানির শিকার হওয়ার কথা জানান জাতীয়ভাবে ২২ শতাংশ উত্তরদাতা। যা নগর এলাকায় ৩০ শতাংশ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হয়রানি জাতীয়ভাবে ১৬ শতাংশ ও শহর এলাকায় ২৪ শতাংশ। এছাড়া সড়কপথে হয়রানির কথা জাতীয়ভাবে ১৮ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, এই হার নগর এলাকায় ২৮ শতাংশ। কর্মক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ উত্তরদাতা হয়রানির কথা জানান, এসব হয়রানিও অন্যতম উদ্বেগের কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। এসব ফলাফল ইঙ্গিত দেয়, হয়রানি কোনো একটি নির্দিষ্ট খাতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সমাজের বিভিন্ন স্তরে তা গভীরভাবে প্রোথিত।
হয়রানির ধরন : ৭৫ ভাগ পরিবার মন্তব্য করেছে ‘টাকা ছাড়া কোনো কাজ হয় না’। অন্যান্য সাধারণ সমস্যার মধ্যে রয়েছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা (৩৬ শতাংশ), পরিষেবা বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনার অভাব (২৩ শতাংশ), বিলম্ব (২২ শতাংশ), দায়িত্বজ্ঞানহীনতা বা কর্মকর্তার অনুপস্থিতি (২০.১৭ শতাংশ), দুর্ব্যবহার (১৪ শতাংশ) এবং কর্মকর্তাদের মধ্যে নৈতিকতা বা সহায়তার মনোভাবের অভাব (১২ শতাংশ)।
পিপিআরসির চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, হয়রানি সংজ্ঞায়িত করা কঠিন, তবে এটি আমাদের সমাজের জীবন্ত বাস্তবতা। এ নিয়ে আলোচনা খুব কমই হয়, অথচ এখনই এটি নিয়ে জাতীয়ভাবে আলাপ-আলোচনা জরুরি। পিপিআরসির গবেষণা প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, দুর্নীতির মতো হয়রানিও উৎপাদনশীলতা কমায়, জনগণের আস্থার ক্ষয় করে এবং সামাজিক জবাবদিহিতাকে দুর্বল করে। তাই হয়রানিকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে সুশাসন সংস্কারে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে পিপিআরসি।
দুর্নীতির প্রকৃতিতে রূপান্তর : গবেষণায় উঠে এসেছে এখন ঘুষ দেয়ার উদ্দেশ্যেও পরিবর্তন ঘটছে। দ্রুত সেবা পাওয়া বা সরাসরি দাবির কারণে ঘুষ দেয়ার হার কমলেও এখন বেশি পরিবার ঘুষ দিচ্ছে আইনি বা প্রক্রিয়াগত ঝামেলা এড়াতে, নিয়ম-কানুন নিয়ে বিভ্রান্তির কারণে অথবা প্রভাবশালী ব্যক্তির অভাবে। এটি এক গভীর কাঠামোগত সঙ্কটের ইঙ্গিত দেয়, আগে ঘুষ বা দুর্নীতি সরাসরি দাবি হিসেবে চাওয়া হলেও, সেটি এখন এক জটিল প্রশাসনিক কাঠামোর ফাঁদে পরিণত হচ্ছে, যেখানে নাগরিকরা কেবল প্রক্রিয়ার জটিলতা সামলাতে ঘুষ দিতে বাধ্য হচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে অবিশ্বাস বাড়ায়, অনৈতিক আচরণকে স্বাভাবিক করে তোলে এবং জবাবদিহিকে দুর্বল করে।
নীতিগত পদক্ষেপ জরুরি : প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হয়রানি ও দুর্নীতির পরিবর্তিত ধারা বাংলাদেশে সামাজিক বাস্তবতা ও শাসনব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ঘুষ প্রদানের হার কমা ইতিবাচক হলেও, মৌলিক সেবায় সর্বব্যাপী হয়রানি এখনই নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ দাবি করে। কেবল অপরাধীদের শাস্তি দিলেই হবে না; বরং নিয়ম সহজ করা, স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং জনসেবা আরো জবাবদিহিমূলক ও নাগরিকবান্ধব করার সংস্কার জরুরি। অন্যথায় হয়রানি ও দুর্নীতি মোকাবেলায় অর্জিত অগ্রগতি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, আর সামাজিক আস্থা পুনর্গঠন হবে আরো কঠিন।
হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারও সঙ্গত কারণে ক্ষুদ্র অর্থনীতির তুলনায় সামষ্টিক অর্থনীতিকেই গুরুত্ব দিচ্ছে। অর্থনীতির পরিকল্পনায় জনমুখী দৃষ্টি থাকা খুবই জরুরি। শুধু জিডিপির ওপর আলোচনাটা সীমাবদ্ধ না রেখে আমাদের সমতা, ন্যায়বিচার, বৈষম্যহীনতা ও নাগরিকের কল্যাণ নিয়ে আলোচনা বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় পাঁচটি নতুন ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র আমাদের বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। প্রথমত, আমাদের মাঝে দীর্ঘস্থায়ী রোগের বোঝা ক্রমেই বাড়ছে। ক্রনিক রোগ মোকাবেলার জন্য একটি নতুন ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, নারীপ্রধান পরিবারগুলো সমাজের সবচেয়ে নিচের স্তরে পড়ে আছে, তাই এদের বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, ঋণের বোঝা বাড়ছে, যা একটি বড় ধরনের সমস্যা হয়ে উঠছে। চতুর্থত, ক্রমবর্ধমান খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা। এটি এখনো ব্যাপক আকারে হয়নি, তবে ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং যা উদ্বেগজনক। পঞ্চমত, স্যানিটেশন সঙ্কট উত্তরণ করে এসডিজি অর্জনের জন্য আমাদের হাতে মাত্র পাঁচ বছর আছে, কিন্তু এখনো প্রায় ৩৬ শতাংশ মানুষ নন-স্যানিটারি টয়লেট ব্যবহার করছে। ফলে নিরাপদ স্যানিটেশন নিশ্চিত করাটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।



