শফিকুল আলম টিটন
বসে বসে গোয়েন্দা কাহিনী পড়ছে ইমন। পরীক্ষা শেষ তাই গল্পের বই পড়ে টাইম পাস করা। গল্পের নায়ক মুহূর্তের মধ্যে খুনিকে ধরে ফেলবে। চরম উত্তেজনা চলছে। টানটান অবস্থা। এমন সময় পাশের রুমের হইচই কানে ভেসে এলো। গল্পের বই পড়ার মুড অফ হয়ে গেল। কি আর করা? অগত্যা পৃষ্ঠা ভাঁজ দিয়ে বন্ধ করে পাশের ঘরে পা বাড়ায়।
চোখে চোখ পড়তেই দেখে লণ্ডভণ্ড মামা বসে আছে। আমাদের দস্যিমামা। নানা-নানু অনেক শখ করে নাম রেখেছে পটল। খুলনা থেকে আসতে না আসতেই সাদুন আর তুবাকে ধমকাচ্ছে। বেশ জোরেশোরেই। এই সুবাদে ওরাও হি হি হি হি করে দাঁত কেলিয়ে যাচ্ছে।
অবস্থা বেগতিক দেখে ইমন বলে, কি গো পটলা মামা কি হলো? এসেই গরম গরম হচ্ছে।
পটল মামা ল্যাগেজটা তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, ধমকাচ্ছি কি আর সাধে? মামা তুই দ্যাখ। রাতের জার্নির ধকল সয়ে রিকশাওয়ালাকে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে ঘরে ঢুকতে যাবো!
হুম! তারপর তারপর?
এক বজ্জাত কাক কোত্থেকে এসে আমার চকচকে টাকের ওপর ইয়ে করে দিয়েছে।
ইমন মামার টাকের ওপর তাকাতেই হেসে কুটিকুটি। পটল মামার ঈষৎ উন্মোচিত স্টেডিয়ামে একগাদা ময়লা উঁকিঝুঁকি মারছে। ততক্ষণে মা ও চলে এসেছে। ফ্লাড লাইট জ্বালিয়ে ভাইয়ের স্টেডিয়ামে তাকাতেই একগাল হেসে বলে, ওমা! ভাই পটলা ময়লা মাথায় এখানে বসে আছিস কেন রে? যা বাথরুমে যা। গা গোসল দিয়ে আয় তারপর গল্প করা যাবে।
দাঁড়াও বুবু। পুঁচকে দুই বিচ্ছুকে পানি আনতে বলি। মাথার দিকে তাকিয়ে অনর্গল হেসেই চলেছে।
এতক্ষণে ইমন বুঝল কেন মামা এত চটে গেছেন। পটল মামার দিকে তাকিয়ে ইমন বলে, মামা, একটা জিনিস একদম পরিষ্কার হয়ে গেল!
সেটি কি? চোখ বড় বড় করে ইমনের দিকে তাকিয়ে জানতে চায়। পাড়ার কাকেরা তোমাকে খুব লাইক করেছে! আই মিন তোমাকে পছন্দ করে। কথাটি শোনামাত্রই সবাই সমস্বরে হেসে ওঠে। মা এক মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ওমা তাই! তুই বুঝলি কেমন করে ইমন! এ পাড়ায় এত লোক থাকতে পটল মামাকে কেন বেছে নেবে! আর যায় কোথায়? কথা শুনে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল মামা। শুনলে বুবু, তোমার বুইড়া কি বলল। মনে হয়, এক চড় দিয়ে বত্রিশটা...
থাক। ওর দাঁত ফেলতে হবে না। তুই বাথরুমে গিয়ে গোসল সেরে নে। আমি নাশতা রেডি করে নিই। পটল মামা রাগে গজ গজ করতে করতে বাথরুমের দিকে পা বাড়াল। ইমন চলে আসে ওর পড়ার ঘরে। গল্পের শেষাংশটুকু শেষ করতে। সাদুন আর তুবা পেছন পেছন বাথরুম পর্যন্ত যায়। হাত ইশারায় বলে-
মামু ওটা কি?
পেছন ফিরে তাকিয়ে মামা জানতে চায় কোনটা মামু। ওই যে ওইটা! বলেই হাসতে হাসতে এক দৌড় দেয়। মামা দাঁত কিড়মিড় করতে করতে ঢুকে পড়ে গোসলখানায়।
আচমকা বাথরুম থেকে মামার চিৎকার। ঝটপট ছুটে যায় ইমন বাথরুমের দিকে। মামা সারা গায়ে সাবান মেখে চিৎকার করছে।
ব্যাপারটা আর কিছুই না। মামা যখন সাবান মেখে সাওয়ার খুলে দেখে পানি পড়ছে না। তাই দেখে ইমন পাশের ঘরে গিয়ে ড্রামের থেকে ঝট করে এক বালতি পানি এনে দেয়। মামা তাই দিয়ে কোনোরকম গোসল সেরে বেরিয়ে আসে।
পড়ন্ত বিকেল। ফুটবল খেলা দেখে ঘরে ঢুকতেই তুবা এসে সুখবরটা শুনিয়ে দিয়ে যায়।
জানো ভাইয়া মামু না আজ সুন্দরবনের গল্প শোনাবে।
সুন্দরবনের গল্প! অবাক হয় ইমন। ফিসফাস করে বলে, কেন রে, মামা কি সুন্দরবনে গিয়েছিল? হুম। জানো ভাইয়া মামু না বন্ধুদের সাথে জঙ্গলে গিয়েছিল বাঘ শিকারে।
তাই! হুম ভাইয়া। সেখানে কি ঘটেছিল তাই শোনাবে আমাদের। রাতের বেলা।
ইমন মনে মনে হাসে। অসাধারণ এক গল্প শোনার প্রতীক্ষায় থাকতে হবে আজ।
প্রচণ্ড ঠাণ্ডা পড়েছে। ঘরে ঢুকে দেখি মামা জবুথবু হয়ে চেয়ারের ওপর পা তুলে বসে আছে। মুখমণ্ডল বাদে আপাদমস্তক চাদরে ঢাকা। সামনের দু’টি চেয়ারে সাদুন আর তুবা বসে আছে। মামার মুখের দিকে হা করে চেয়ে আছে। গল্প শোনার জন্য। মা ততক্ষণে চা নাশতা নিয়ে ঘরে ঢুকে পড়েছে। মাকে দেখে বলে, সবাই তো এলো। বুইড়া আসেনি। গোয়েন্দা বাবু।
এই তো মামা আমি চলে এসেছি। ইমন বলতে বলতে ঘরের ভেতরে ঢুকে বিছানায় আয়েশ করে বসে পড়ে।
সবাই পটল মামার আষাঢ়ে গল্প শোনার জন্য মনোযোগী হয়। মামা মুখে ঝালমুড়ি দিয়ে চিবুতে চিবুতে শুরু করল।
গেল বছর জানুয়ারিতে আমরা কয়েক বন্ধু সুন্দরবনের গভীর অরণ্যে ঢুকে পড়ি। সাথে কয়েকজন বাওয়ালিকে নিয়ে নিলাম।
মামা বাওয়ালি কী? তুবা জানতে চায়।
বাওয়ালি এক শ্রেণীর মানুষ যারা বনের গভীর অরণ্যে পর্যন্ত ঢুকে পড়ে গাছ কাটার জন্য। বনের রাস্তাঘাট ওদের সব চেনাজানা।
বন্ধুরা তো ভয়েই অস্থির। যদিও নিরাপদ রাস্তা ধরেই জঙ্গলের ভেতর হেঁটে যাচ্ছি।
মামা তুমি ভয় পাওনি? সাদুন জানতে চায় মামার কাছে। আমি কি ভয় পাওয়ার ছেলে রে মামু। বনের ভেতর ঢুকে সব লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছি। হঠাৎ বাওয়ালি একজন সাবধান করে দিলো। বলল-
সর্বনাশ হয়ে গেছে। আমাদের আশপাশে রয়েল বেঙ্গল টাইগার আছে! তাই শুনে বন্ধুরা তো কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছে। কেউ অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। ভয়েতে বন্ধুদের চোখ বড় বড় হয়ে গেছে। সবাই চুপ মেরে একটা ঝোপের আড়ালে গিয়ে বসে পড়ে। গাছের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারতেই দেখি, ইয়া বড় লেজওয়ালা একটা বাঘ! আমাদের আসার পথের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। আমি চুপি চুপি ছোট ব্যাগ থেকে বাঘের গায়ের রঙের ডোরাকাটা হুডি বের করে নিয়ে পরে ফেলি। আমাকে আর পায় কে ? মাথা ঢাকতেই আমাকেও ছোটখাটো একটা বাঘের মতো দেখাচ্ছিল। আমি সবাইকে সাহস দিয়ে বললাম, তোরা এখানে ঘাপটি মেরে বসে থাক। আমি বাঘ মামার সাথে দেখা করে আসি। যেমন কথা তেমন কাজ! সাইডে গিয়ে বাঘ মামার পেছনে গিয়ে দাঁড়াই। তারপর লেজটা ধরে এমন হ্যাঁচকা টান দেই, ওমনি বাঘ মামার কম্মসারা। লেজ ধরে এমনভাবে ঘুরাতে লাগলাম যে পড়িমড়ি করে দে ছুট বাঘমামা।
বোয়াল মাছের মতো হা করে সাদুন আর তুবা শুনছিল। মা মুখ টিপে টিপে হাসছিল।
ইমন বেফাঁস বলেই ফেলল,
মামা কয় নম্বর? মানে কি? মামা বলে।
মানে কয় নম্বর বানানো গল্প এটা!
পটল মামা এবার ভীষণ ক্ষেপে গেলেন। তোর শুনতে ভালো না লাগলে পাশের ঘরে চলে যা। পরিবেশ ঘোলাটে করবি না বুইড়া!
বলতে না বলতে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। ঘর অন্ধকার। মা চার্জার লাইট আনতে পাশের ঘরে চলে যায়। অন্ধকারেই মামা গল্প আবার শুরু করলেন। সেদিনের দস্যিপনা নিজে চোখে দেখলে পাগল হয়ে যেতি। ইমন বলে, মামা তোমার এত্ত সাহস তাতো জানতাম না।
সাহসের আর কি দেখেছিস? এটা তো নস্যি! হঠাৎ করে কালো লম্বা কি যেন মামার কাঁধে এসে পড়তেই চিৎকার দিয়ে ওঠে।
সাদুন আর তুবা চিৎকার দিয়ে ওঠে মামু, সা-প! সা-প! যেই না সাপের কথা শুনেছে, অমনি হুড়মুড় করে চেয়ার থেকে পড়ল মেঝেতে।
ততক্ষণে মা চার্জার লাইট জ্বালিয়ে ঘরে আসতেই দেখে পটল মেঝেতে পড়ে আছে।
সবাই ধরাধরি করে উঠে বসাল বিছানায়। রাজ্যের ভয় যেন দুই বিচ্ছুর চোখেমুখে।
মেঝেতে তাকাতেই দেখে একটি রাবারের সাপ পড়ে আছে। তাই দেখে সাদুন আর তুবা হেসেই কুটোকুটি। খলখল, খিলখিল!
ইমন হাসতে হাসতে বলে, এটি পটল মামার বানানো গল্পের খেসারত। রাগে ক্ষোভে লজ্জায় পটল মামার চোখ মুখ লাল হয়ে ওঠে।


