বিশেষ সংবাদদাতা
শিশুদের জন্ম নিবন্ধন শতভাগ নিশ্চিত করতে এবং মৃত্যু নিবন্ধনকে কার্যকর করতে দেশের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে দায়িত্ব দেয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উত্তরাধিকার এবং ভোটাধিকারের মতো মৌলিক নাগরিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন অপরিহার্য। রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, সুশাসন এবং বাজেট প্রণয়নেও নিবন্ধন তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন হার যথাক্রমে ৫০ শতাংশ ও ৪৭ শতাংশ। যা বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক গড় হারের তুলনায় অনেক কম। অথচ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার শতভাগে উন্নীত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন আইন, ২০০৪’ সংশোধন করে নিবন্ধনের আইনি দায়িত্ব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দেয়া হলে এই লক্ষ্য অর্জন দ্রুততর হবে। এখনো বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৫ কোটি শিশু অনিবন্ধিত অবস্থায় রয়েছে। যা দুঃখজনক। আইনের বেশ কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা নিবন্ধন কার্যক্রমে কাক্সিক্ষত সফলতা পাচ্ছে না। গতকাল রাজধানীর বিএমএ ভবনে ‘বাংলাদেশে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন : অগ্রগতি, প্রতিবন্ধকতা ও করণীয়’ শীর্ষক গণমাধ্যমকর্মীদের এক কর্মশালায় এসব বিষয় তুলে ধরেন বিশেষজ্ঞরা। গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের (জিএইচএআই) সহযোগিতায় প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) এই কর্মশালার আয়োজন করে। কর্মশালায় প্রিন্ট, টেলিভিশন এবং অনলাইন মিডিয়ার ৩০ জন সাংবাদিক অংশ নেন। অনুষ্ঠানে গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনা তুলে ধরেন প্রজ্ঞার কোঅর্ডিনেটর মাশিয়াত আবেদিন। কর্মশালায় আলোচক হিসেবে আরো উপস্থিত ছিলেন প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের।
কর্মশালায় বলা হয়, বর্তমান আইনে জন্ম ও মৃত্যুর তথ্য দেয়ার মূল দায়িত্ব কেবল স্বাস্থ্য বিভাগের নয়। তবে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোকে জন্ম নিবন্ধনের দায়িত্ব দেয়া হলে এগুলোর আওতায় জন্ম নেয়া দেশের প্রায় ৬৭ শতাংশ শিশুকে সহজেই নিবন্ধনের আওতায় আনা সম্ভব। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বহু দেশ এই পদ্ধতি অনুসরণ করেই শতভাগ নিবন্ধনের লক্ষ্য পূরণ করেছে।
জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক চিত্র : বিশ্বজুড়ে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ইউনিসেফের ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে বিশ্বে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্ম নিবন্ধনের হার ছিল ৬০ শতাংশ। যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৭ শতাংশে। তবে, এখনো বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৫ কোটি শিশু অনিবন্ধিত অবস্থায় রয়েছে। যা দুঃখজনক। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া নিউজিল্যান্ডে প্রায় শতভাগ শিশু জন্ম নিবন্ধনের আওতায় এসেছে। ইউএনএসকাপের তথ্য অনুযায়ী, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলেও গত এক দশকে জন্ম নিবন্ধনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ২০১২ সালে যেখানে পাঁচ বছরের নিচে অনিবন্ধিত শিশুর সংখ্যা ছিল ১৩.৫ কোটি। বর্তমানে তা কমে ৫.১ কোটিতে নেমে এসেছে। তারপরও এখনো প্রতি বছর প্রায় ১.৪ কোটি শিশু জন্মের এক বছরের মধ্যে নিবন্ধিত হয় না। যা হতাশাজনক। অন্য দিকে, মৃত্যু নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বৈশ্বিক গড় হার ৭৪ শতাংশে (২০২৩ সালে) পৌঁছেছে। এই অগ্রগতি ইতিবাচক, তবে এখনো প্রতি বছর প্রায় ৬৯ লাখ মৃত্যুর তথ্য রেকর্ডবহির্ভূত থেকে যায়। যার বেশির ভাগ ঘটে নিজ বাড়িতে বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে। স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের আওতার বাইরে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো জন্ম নিবন্ধনে দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করছে। ২০০৮ সালে এই অঞ্চলে জন্ম নিবন্ধনের গড় হার ছিল মাত্র ৩৯ শতাংশ। যা ২০২৪ সালে দ্বিগুণ হয়ে ৭৬ শতাংশে পৌঁছেছে। মালদ্বীপ, ভুটান ও শ্রীলঙ্কায় জন্ম নিবন্ধনের হার প্রায় ১০০ শতাংশে পৌঁছেছে, ভারত ৮৯.১ শতাংশ, নেপাল ৭৭ শতাংশ এবং মিয়ানমার ৮১.৩০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
বাংলাদেশের চিত্র : এক তথ্যে জানা গেছে, জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনে বাংলাদেশের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য, তবে সন্তোষজনক নয়। বর্তমানে বাংলাদেশে জন্ম নিবন্ধনের হার ৫০ শতাংশ এবং মৃত্যু নিবন্ধনের হার ৪৭ শতাংশ। যা বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অগ্রগতির তুলনায় অনেক কম।
জিএইচআইর বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রূহুল কুদ্দুস বলেন, শতভাগ নিবন্ধন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোকে আইনগতভাবে নিবন্ধনের দায়িত্ব দেয়ার কোনো বিকল্প নেই।



