জনপ্রশাসনে স্থবিরতা, আটকে আছে শত শত ফাইল

প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনা উপেক্ষা

শামছুল ইসলাম
Printed Edition

  • অতিরিক্ত সচিবের ৪১৮ পদে কর্মরত ২৮৫
  • শৃঙ্খলায় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ৩৬ মামলা
  • সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগে অপেক্ষমাণ ১১০
  • পেনশনের ১৮০ আবেদন ফাইলবন্দী
  • অনুমোদনের অপেক্ষায় ৪৪ বিধিমালা

সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় সংশ্লিষ্ট শাখাগুলোতে আটকে আছে শত শত ফাইল। মন্ত্রণালয়ের সমন্বয় সভায় অধিশাখার প্রধানরা বারবার অপেক্ষমাণ ফাইলগুলোর সিদ্ধান্তের কথা বললেও কোনো কাজে আসছে না। মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা অধিশাখায় ৩৬টি বিভাগীয় মামলা চলমান। সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা অধিশাখায় ১১০ ফাইল সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়। অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের পেনশনের ১৮০টি সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন বিধি তৈরির শাখাটিতে ৪৪ বিধি অপেক্ষমাণ রয়েছে। অতিরিক্ত সচিবের ৪১৮ পদে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২৮৫ কর্মকর্তা। অতিরিক্ত সচিব পদোন্নতির জন্য প্রধান উপদেষ্টা নির্দেশনা দিলেও সেটি উপেক্ষা করা হচ্ছে। রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয়ে এ ধরনের ঘটনা নজিরবিহীন। অর্ন্তবর্তী সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অদক্ষতা নাকি সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণে কর্মকর্তাদের স্যাবোটাজ এমন সংশয় সংশ্লিষ্টদের।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, অর্ন্তবর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর জনপ্রশাসনে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী পদায়ন হওয়া কর্মকর্তাদের সাথে আগে থেকে জনপ্রশাসনে থাকা কর্মকর্তারাও সিন্ডিকেটে জড়িয়ে পড়েন। সিন্ডিকেটটি সুবিধা করতে না পেরে বিভিন্ন অভিযোগ এনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব মোখলেস উর রহমানকে সরিয়ে দেয়। তার স্থলাভিষিক্ত করা হয় তারই ব্যাচমেট মো: এহছানুল হককে। এরপর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নেয় সিন্ডিকেটটি।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, নতুন জনপ্রশাসন সচিব হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর তারই একজন ঘনিষ্ঠ ব্যাচমেটের মন্ত্রণালয়ে যাতায়াত বেড়ে যায়। তার ওই ব্যাচমেট আগামী নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার সম্ভাব্য দলটির ঘনিষ্ঠ। ওই ব্যাচমেটের পক্ষ থেকে নির্বাচনের পর তাকে আবারো দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হবে এমন প্রলোভন দেখানো হয়। ফলে ওই কর্মকর্তার বাইরে কোনো কাজ করছেন না তিনি। এমনকি প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনাও উপেক্ষা করা হচ্ছে। ফলে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে মন্ত্রণালয়ের কাজে।

প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনা উপেক্ষা : অতিরিক্ত সচিবের স্বল্পতার কারণে অনেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বিভিন্ন অনুবিভাগে পদায়ন করা যাচ্ছে না। একজন অতিরিক্ত সচিব দুই বা তার বেশি অনুবিভাগের দায়িত্ব পালন করছেন। অনেক সংস্থা ও করপোরেশনে চেয়ারম্যান, প্রধান নির্বাহী ও মহাপরিচালক পদ শূন্য থাকার পরেও কর্মকর্তা স্বল্পতায় পদায়ন করা যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে গত ৬ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং জনপ্রশাসন সচিবকে ডেকে নেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি অতিদ্রুত অতিরিক্ত সচিব পদোন্নতির নির্দেশনা দেন। এর পরেও অতিরিক্ত সচিব পদোন্নতি দেয়া সম্ভব হয়নি। এর পেছনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিন্ডিকেটকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের নিয়মিত ২০ ব্যাচের যুগ্ম সচিব পদোন্নতি হয় ২০২১ সালের ২৯ অক্টোবর। যুগ্ম সচিব হিসেবে দুই বছর সন্তোষজনক চাকরির পর তারা অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতিযোগ্য হন। অথচ নিয়মিত পদোন্নতি পাওয়া এসব যুগ্ম সচিবের পদোন্নতির চার বছর ইতোমধ্যে পার হলেও ২০তম ব্যাচের উপযুক্ত অফিসারদের পদোন্নতি হচ্ছে না।

পদোন্নতির জন্য গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত এক ডজনের বেশি সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতগুলো সভার পরেও পদোন্নতি দিতে পারেনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এমন ঘটনাও প্রশাসনে নজিরবিহীন।

এটি না হওয়ার পেছনে জনপ্রশাসনের সিন্ডিকেটকেই দুষছেন সংশ্লিষ্টরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, পালিয়ে যাওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আস্থাভাজন আমলা এইচ টি ইমামের মতো নতুন একজন প্রভাবশালী আমলা বর্তমান প্রশাসনে তৈরি হয়েছেন। তিনি ব্যাচমেট বন্ধুর মাধ্যমে জনপ্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন। তার কথার বাইরে কোনো ধরনের পদোন্নতি-পদায়ন হচ্ছে না।

অর্ন্তবর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে বিগত সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীদের পিএস ছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর পিএস, এপিএস, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিচালক, মহাপরিচালক, ২০১৮ সালের রাতের ভোটে ডিসি হিসেবে রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বিভিন্নভাবে বিগত সরকারের প্রতি অন্ধ আনুগত্য দেখিয়েছেন তাদের পদোন্নতি না দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের পর দলীয় সরকারকে ম্যানেজ করে এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে অর্থের বিনিময়ে হাসিনাঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের পদোন্নতি নিশ্চিত করা যাবে। এ জন্য প্রভাবশালী ওই কর্মকর্তা অতিরিক্ত সচিব পদোন্নতি দিতে চান না বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়াও অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বঞ্চিত দাবি করে বেশকিছু কর্মকর্তা ভূতাপেক্ষ সচিব পদোন্নতি নিয়েছেন। তারা আগামীতে চুক্তিভিত্তিক সচিব নিয়োগ পেতে ক্ষমতায় আসতে যাওয়া একটি রাজনৈতিক দলের আস্থাভাজন হওয়ার চেষ্টা করছেন। অতিরিক্ত সচিব পদোন্নতি দিলে এসব কর্মকর্তার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া কঠিন হতে পারে এমন আশঙ্কায় ওই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পদোন্নতি আটকে রাখার চেষ্টা করছেন।

আটকে আছে পেনশনের ১৮০ আবেদন : তিন দশকের কর্মজীবন শেষে নিজেদের প্রাপ্য বুঝে নিতে গিয়ে পদে পদে হয়রানির শিকার হচ্ছেন সরকারি কর্মচারীরা। টাকা না পেয়ে দিনের পর দিন জনপ্রশাসনে ধরনা দিচ্ছেন। গত সোমবার পর্যন্ত ১৮০টি আবেদন মন্ত্রণালয়ে আটকে থাকার খবর পাওয়া গেছে। এই ঘটনা নজিরবিহীন বলছেন সংশ্লিষ্টরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনপ্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানান, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পেনশনের কোনো ফাইল পেন্ডিং কখনোই থাকেনি; কিন্তু বর্তমান সচিব দায়িত্ব নেয়ার পর এমন অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তিনি ফাইল দেখার সময় পান না। বয়স্ক কর্মকর্তা হওয়ায় তিনি বেশির ভাগ সময়ই রেস্টে থাকেন। ফাইল দেখে তিনি সিদ্ধান্ত দিতে পারেন না। প্রতিটি ফাইল সংশ্লিষ্ট ডেস্ক অফিসারকে ব্রিফ করতে হয়। শতাধিক ফাইল পেন্ডিং রয়েছে।

অনুমোদনের অপেক্ষায় ৪৪টি বিধিমালা : গত বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় বস্ত্র অধিদফতরের (কর্মকর্তা ও কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালা, ২০২৫ চূড়ান্তকরণ। প্রায় এক বছর হয়ে গেলেও এটি চূড়ান্ত করতে পারেনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। গত বছরের ২৭ অক্টোবর পাঠানো হয় বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫-এর খসড়ার ওপর মতামত প্রদান। এখন পর্যন্ত এটি দিতে পারেনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। গত বছরের নভেম্বর থেকে আটকে আছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদফতরের নিয়োগ বিধিমালা, ২০২৫ তথ্য অধিদফতর (ক্যাডার-বহির্ভূত গেজেটেড কর্মকর্তা ও নন গেজেটেড কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালা-২০২৫ প্রণয়ন। এমন ৪৪টি বিধিমালা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। এমন বিপুলসংখ্যক বিধিমালা পেন্ডিং থাকা জনপ্রশাসনে আগে কখনো হয়নি বলছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

৩৬ বিভাগীয় মামলা চলমান : জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ৩৬টি বিভাগীয় মামলা সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে। একই সময়ে গত বছরে এই মামলার সংখ্যা ছিল ১৯টি। বর্তমান সচিব দায়িত্ব নেয়ার পর অনিষ্পন্ন বিভাগীয় মামলার সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। অনিষ্পন্ন মামলার মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শৃঙ্খলা শাখায় ২৩টি, বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের দু’টি, বিয়াম ফাউন্ডেশনের তিনটি, মুদ্রণ ও প্রকাশনা অধিদফতরের পাঁচটি, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস প্রশাসন একাডেমির একটি, সরকারি যানবাহন অধিদফতরের একটি, সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের একটি মামলা অনিষ্পন্ন রয়েছে।

সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগে অপেক্ষমাণ ১১০ ফাইল : সরকারের রাজস্ব খাতের পদ সৃজন, অস্থায়ীভাবে সৃজিত পদের মেয়াদ সংরক্ষণ, অস্থায়ীভাবে সৃজিত পদের মেয়াদ সংরক্ষণ, অস্থায়ীভাবে সৃজিত পদ স্থায়ীকরণ, পদবি/পদমান পরিবর্তন এবং পদমর্যাদা/ বেতনস্কেল উন্নীতকরণ, পদ বিলুপ্তিকরণ, টিওঅ্যান্ডইতে যানবাহন ও অফিস সরঞ্জামাদি অন্তর্ভুক্তকরণ, সাংগঠনিক কাঠামো অনুমোদন, সমাপ্ত উন্নয়ন প্রকল্পের পদগুলো রাজস্ব বাজেটে স্থানান্তর, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, প্রশাসনিক বিভাগ ও জেলাগুলেঅর নন-ক্যাডার ৯ম গ্রেড এবং ১০ গ্রেড থেকে ২০ গ্রেডের রাজস্ব বাজেটের সরাসরি নিয়োগযোগ্য শূন্যপদ পূরণের ছাড়পত্র প্রদানসহ গুরুত্বপূর্ণ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংগঠন ও ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগের। গুরুত্বপূর্ণ এই অনুবিভাগে বর্তমানে ১১০টি ফাইল আটকে আছে। এতে সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় কয়েক হাজার সরকারি কর্মচারী হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

এসব বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো: এহসানুল হক কোনো কথা বলতে রাজি হননি।