আগে কখনো শ্রীলঙ্কার মাটিতে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জেতেনি বাংলাদেশ। ২০১৩ এবং ২০১৭ সালে দু’টি সিরিজ ড্র করেছিল বাংলাদেশ। এবার সুযোগ এসেছে নতুন ইতিহাস লেখার। সিরিজের ‘অলিখিত ফাইনাল’ লড়াইয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জে মেহেদী হাসান মিরাজ বাহিনী। ক্যান্ডির পাল্লেকেলেতে টস জিতে প্রথমে ব্যাট করে কুসাল মেন্ডিসের সেঞ্চুরি ও অধিনায়ক আসালাঙ্কার দৃঢ় ব্যাটিংয়ে ৭ উইকেটে ২৮৫ রান করে লঙ্কানরা। জবাবে ৩৯.৪ ওভারে সবক’টি উইকেট হারিয়ে ১৮৬ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ। তাতে ৯৯ রানে জয়ের পাশাপাশি তিন ম্যাচ সিরিজ ২-১ এ জিতে নিলো স্বাগতিক শ্রীলঙ্কা। আগামীকাল থেকে শুরু হবে তিন ম্যাচের টি-২০ সিরিজ।
সিরিজের প্রথম ম্যাচে ৭৭ রানে হারে বাংলাদেশ। তবে দ্বিতীয় ম্যাচে দুর্দান্তভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ১৬ রানে জয় পায় টাইগাররা। প্রথম ওয়ানডেতে ভালো অবস্থানে থেকেও হার বাংলাদেশের। দ্বিতীয় ওয়ানডেতে পেন্ডুলামের মতো দুলতে থাকা ম্যাচে শেষমেশ জিতে ১-১ এ সমতায় ফিরে বাংলাদেশ। টাইগারদের ইতিহাস গড়তে চ্যালেঞ্জ ছিল তৃতীয় ম্যাচে।
জবাবে ব্যাট করতে নেমে চার ওভারের মধ্যে দলীয় ১৯ ও ২০ রানে তানজিদ হাসান তামিম (১৭) ও নাজমুল হোসেন শান্তর (০) উইটেক হারায় বাংলাদেশ। ১৪তম ওভারে ফের ধাক্কা টাইগার শিবিরে। ওপেনার পারভেজ ইমনকে (২৮) ফার্নান্দের ক্যাচ বানান ওয়েল্লালাগে। তৌহিদ হৃদয় একপ্রান্ত আগলে রাখলেও অপর প্রান্তে থিতু হয়েও আউট হন অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ। এবার তাকে লিয়ানাগের ক্যাচ বানান ওয়েল্লালাগে। ২৫ বলে ৪ চারে ও এক ছক্কায় ২৮ রান করেন অধিনায়ক। হাসারাঙ্গার বল এগিয়ে এসে মারতে গিয়ে স্টাম্পড হন শামীম পাটোয়ারি (১২)। এরই মাঝে ৭৫ বলে ৩ চার ও এক ছক্কায় হাফ সেঞ্চুরি পূূর্ণ করেন তৌহিদ হৃদয়। এরপর আর এক রান করতেই চামিরার বলে বোল্ড হয়ে সাজঘরে ফিরেন তৌহিদ। বাংলাদেশের জয়ের আশা মূলত তখনই শেষ হয়ে যায়। ৩৪ ওভারে দলীয় সংগ্রহ ৬ উইকেটে ১৫৯।
আগের ম্যাচে দলকে আশার আলো দেখানো তানজিম হাসান সাকিব এসে সঙ্গ দেন জাকের আলীকে। দু’জনে দেখেশুনে খেলতে থাকেন। স্ট্রাইক রেটে নজর রাখার চেয়ে ক্রিজে টিকে থাকাটাকেই শ্রেয় মনে করেছেন দু’জন। তবে চামিরার বল তাদের স্বস্তি দেয়নি। আগে দুই উইকেট নেয়া দুশমন্থ চামিরা তানজিমকে আউট করে তিন উইকেট পূর্ণ করেন। অবশ্য চামিরার কৃতিত্ব থেকে তানজিমের আত্মহুতি দেয়াটাই শ্রেয় মনে হয়েছে। খোঁচা মেরে উইকেট কিপারকে ক্যাচ দিয়ে ফিরেন ৫ রানে। ৩৪.৪ ওভারে ৭ উইকেট হারিয়ে হারের প্রহর গুনছে মিরাজ বাহিনী। তাসকিন এসে তিনটি বল খেলে এক রান করেই বোল্ড হলেন ফার্নান্দোর বলে। এক ওভার পরই ফার্নান্দোর বলে বোল্ড হলেন ৩৫ বলে দুই চার ও এক ছক্কায় ২৭ রান করা জাকের আলি। তাতে বাংলাদেশী ৫ ব্যাটারই ক্রিজ ছাড়লেন বোল্ড হয়ে। আর আসিথা ফার্নান্দো নিজের ঝুলিতে পুরলেন তিন উইকেট। শেষ ব্যাটার হিসেবে হাসারাঙ্গা ফেরালেন তানভীরকে (৮)। তাতে বাংলাদেশ গুটিয়ে যায় ৩৯.৪ ওভারে ১৮৬ রানে। স্বাগতিকদের জয় ৯৯ রানে। সাথে ২-১ এ সিরিজ জয়। ফার্নান্দো ও চামিরা তিনটি করে, ওয়েল্লালাগে ও হাসারাঙ্গা দু’টি করে উইকেট নেন।
এর আগে গতকাল পাল্লেকেলেতে টস জিতে ব্যাটিং নেয় শ্রীলঙ্কা। দলীয় সংগ্রহের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রাখেন কুশাল মেন্ডিস। ১১৪ বল মোকাবেলায় ১৮টি চারের সাহায্যে ১২৪ রানের ঝকঝকে ইনিংস খেলেন। ক্যারিয়ারের ৬ষ্ঠ ওয়ানডে সেঞ্চুরি তুলে নিতে কুসাল খেলেন ৯৫ বল, হাঁকান ১৬টি বাউন্ডারি। সাত চারে ফিফটি করেন ৫৭ বলে। ইনিংসের মাঝপথে তার সঙ্গী ছিলেন অধিনায়ক চারিথ আসালাঙ্কা। ৬৮ বলে ৫৮ রান করেন। এ রান তাড়া করে বাংলাদেশকে গড়তে হবে নতুন রেকর্ড। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে এখন পর্যন্ত তাদের সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয় ২০২৩ সালের বিশ্বকাপে- যেখানে ২৮০ রান টপকে জিতেছিল টাইগাররা। সে রেকর্ড ভাঙার চ্যালেঞ্জ নিয়েই ব্যাট করছে মিরাজের দল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আশা সফল হয়নি; বরং বাজেভাবে হার।
একাদশে ফিরছিলেন তাসকিন আহমেদ। ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্টের কথা ভেবে তাকে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে খেলায়নি টিম ম্যানেজমেন্ট। তৃতীয় ম্যাচে তাকে জায়গা করে দিতে একাদশের বাইরে চলে যেতে হয় হাসান মাহমুদকে। এ ছাড়া নাজমুল হোসেন শান্ত কিছুটা চোটে ভুগলেও তাকে একাদশে রেখেছিল টিম ম্যানেজমেন্ট। বোলিং বড় শক্তি টাইগারদের। তবে লঙ্কান ব্যাটারদের পরীক্ষায় ফেলতে পারেননি। শ্রীলঙ্কার ইনিংসের শুরুটা ছিল সতর্ক। ওপেনার নিশান মাদুশকা মাত্র ১ রানে ফিরলেও পাথুম নিশাঙ্কা ৪৭ বলে ৩৫ রানের ইনিংস খেলেন। কিন্তু ইনিংসের ভরকেন্দ্র তৈরি হয় কুসাল মেন্ডিস ও আসালাঙ্কার ১২৪ রানের জুটিতে। এ জুটিকে ভাঙেন পেসার তাসকিন। আসালাঙ্কাকে ফেরানোর পর দ্রুতই পড়ে আরও কয়েকটি উইকেট, যার মধ্যে ছিল মেন্ডিসের উইকেটও। তাকে ফেরান শামীম পাটোয়ারী। শেষ দিকে লঙ্কানরা ৩০০ ছাড়ানোর আভাস দিচ্ছিল, তখন টাইগার বোলাররা ম্যাচে ফিরে আসেন। হাসারাঙ্গা ও চামিরার ছোট ছোট অবদান মিলিয়ে ৭ উইকেট হারিয়ে থামে ২৮৫-এ। মিরাজ ও তাসকিন দু’টি করে উইকেট নেন। পাশাপাশি তানজিম, তানভীর এবং শামীম একটি করে উইকেট নেন। প্রথম ম্যাচের মতো এদিনও উইকেটশূন্য থাকেন মোস্তাফিজুর রহমান।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
শ্রীলঙ্কা : ২৮৫/৭ (নিসাঙ্কা ৩৫, মাদুশকা ১, কুসাল ১২৪, কামিন্দু ১৬, আসালাঙ্কা ৫৮, লিয়ানাগে ১২, ওয়েল্লালাগে ৬, হাসারাঙ্গা ১৮*, চামিরা ১০*, তাসকিন ২/৫১, তানজিম ২/৪১, তানভির ১/৬১, মোস্তাফিজ ০/৫২, মিরাজ ২/৪৮, শামীম ১/৩০)।
বাংলাদেশ : ৩৯.৪ ওভারে ১৮৬/১০ (পারভেজ ২৮, তানজিদ ১৭, শান্ত ০, মিরাজ ২৮, শামীম ১২, তৌহিদ ৫১, তানজিম ৫, তাসকিন ১, জাকের ২৭, তানভীর ৮, মোস্তাফিজ ০*, ফার্নান্দো ৩/৩৩, চামিরা ৩/৫১, ওয়েল্লালাগে ২/৩৩, হাসারাঙ্গা ২/৩৫)।
ফল : শ্রীলঙ্কা ৯৯ রানে জয়ী।
সিরিজ : ৩ ম্যাচে ২-১ এ জয়ী শ্রীলঙ্কা।
ম্যাচ সেরা : কুসাল মেন্ডিস।



