সুমন আহমেদ মতলব (উত্তর)
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ছেংগারচর পৌর এলাকার বাসিন্দা মো: গিয়াসউদ্দিন কাজী। টানা ৫০ বছর ধরে হেঁটে মানুষের দোরগোড়ায় সংবাদপত্র পৌঁছে দিচ্ছেন তিনি। রোদ, বৃষ্টি কিংবা দুর্যোগ কোনো কিছুই তাকে দায়িত্ব পালনে বিরত রাখতে পারেনি। একসময় প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ গ্রাহকের কাছে সংবাদপত্র পৌঁছে দিলেও প্রযুক্তির প্রসারে কাগজের পত্রিকার চাহিদা কমে যাওয়ায় এখন আর সেই আয়ের সুযোগ নেই। তবুও তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই পেশায় থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলেও এখনো প্রতিদিন হেঁটেই কাজ করেন। একসময় সাইকেলে পত্রিকা বিতরণ করলেও শারীরিক অসুস্থতার কারণে এখন আর সাইকেল চালাতে পারেন না। গিয়াসউদ্দিন জানান, ছোটবেলায় মাকে হারানোর পর অভাবের কারণে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় গিয়ে কিছুদিন চকোলেট বিক্রি করেন। পরে মতলবে ফিরে ১৯৭৫ সালের দিকে নারায়ণগঞ্জ রেলস্টেশনের একটি উন্মুক্ত এজেন্সি থেকে মাত্র পাঁচ কপি দৈনিক ইত্তেফাক এনে পত্রিকা বিক্রি শুরু করেন। তখন এলাকায় সংবাদপত্রের পাঠক ছিল খুবই কম। পরে মতলব দক্ষিণ ও বর্তমানে দাউদকান্দির একটি এজেন্সি থেকে পত্রিকা এনে বিক্রি করছেন।
আশির দশকে সংবাদপত্রের চাহিদা বাড়তে শুরু করলে তিনি সাইকেল কিনে পেছনে বিশেষ বক্স তৈরি করে বিভিন্ন এলাকায় পত্রিকা সরবরাহ করতেন। সেই কিশোর বয়সে শুরু হওয়া পেশাই আজ বার্ধক্য পর্যন্ত তার জীবনের অবলম্বন হয়ে আছে। বর্তমানে মতলব উত্তরে তিনিই একমাত্র নিয়মিত পত্রিকা হকার। অন্যরা অনেক আগেই পেশা পরিবর্তন করেছেন। গিয়াসউদ্দিন দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জনক। সীমিত আয়ের মধ্যেও সন্তানদের লেখাপড়া করিয়েছেন। বড় মেয়েকে এইচএসসি পাস করিয়ে বিয়ে দিয়েছেন এবং অন্য সন্তানরাও পড়াশোনা শেষে কর্মজীবনে যুক্ত হয়েছেন। স্ত্রী রাজিয়া খাতুন দীর্ঘদিন ধরে সংসারের সব দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তাকে সহযোগিতা করে আসছেন। তবে বর্তমান আয়ে সংসার চালানো অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, গত বছর অসুস্থতা ও করোনার কারণে কিছুদিন পত্রিকা বিক্রি করতে পারিনি। এখন বয়স হয়েছে, সাইকেলও চালাতে পারি না। তারপরও হেঁটেই মানুষের কাছে পত্রিকা পৌঁছে দিচ্ছি। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এ কাজ করতে চাই। তিনি আরো জানান, মতলব উত্তর উপজেলার সাবেক ইউএনও শারমিনের উদ্যোগে সরকারি সহায়তায় একটি ছোট ঘর পেয়েছেন। বর্তমানে সেই ঘরেই স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করছেন। তবে সংসারের ব্যয় মেটাতে তিনি সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয় মানুষের সহযোগিতা কামনা করেছেন। মতলব উত্তর প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি শামসুজ্জামান ডলার বলেন, ছোটবেলা থেকেই গিয়াসউদ্দিন ভাইকে ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে রিকশা, সাইকেল ও হেঁটে পত্রিকা বিক্রি করতে দেখছি। তিনি অত্যন্ত সৎ ও পরিশ্রমী মানুষ। কিন্তু পত্রিকা বিক্রির সামান্য আয় দিয়ে তার সংসার চালানো খুবই কঠিন। সমাজের দায়িত্বশীল ও বিত্তবান মানুষের উচিত তার পাশে দাঁড়ানো।



