কাবু করা যাচ্ছে না ইরানকে

Printed Edition
ইসরাইলের রাজধানী তেলআবিবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর আগুন ও ধোঁয়ার দৃশ্য : ইন্টারনেট
ইসরাইলের রাজধানী তেলআবিবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর আগুন ও ধোঁয়ার দৃশ্য : ইন্টারনেট

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • এবার আমিরাতে মার্কিন ঘাঁটি তছনছের লক্ষ্য

  • তিন আরব দেশে একের পর এক হামলা ইরানের

  • ইরানের স্পর্শকাতর খার্গ দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা

  • সৌদিতে পাঁচ মার্কিন রিফুয়েলিং উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত

মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধ ক্রমেই বিস্তৃত আঞ্চলিক সঙ্ঘাতে রূপ নিচ্ছে। ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র যৌথ বাহিনীর সর্বাত্মক তাণ্ডবেও কাবু করা যাচ্ছে না অদম্য ইরানকে। মধ্যপ্রাচ্যে সব শক্তি জড়ো করেও মুসলিম প্রজাতন্ত্রটিকে নত করতে ব্যর্থ হয়েছে তারা। অন্য দিকে টানা বিমান হামলার পরও প্রত্যুত্তরে ইসরাইলসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে তেহরান। গতকাল নতুন করে তিন আরব দেশে মার্কিন লক্ষ্যবস্তু ঘিরে আক্রমণ করেছে দেশটি। আরব আমিরাতের বাসিন্দাদের আবুধাবি ও দুবাইয়ের বন্দর এলাকা খালি করার আহ্বান জানিয়েছে তেহরান। এর মধ্যে ইরানের তেল রফতানির বড় কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে মার্কিন হামলা, ইসরাইলের ওপর ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ, ইরাক ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থে অব্যাহত আক্রমণ এবং হরমুজ প্রণালির কার্যত অচল হয়ে পড়া- সব মিলিয়ে পরিস্থিতি নতুন এক বৈশ্বিক সঙ্কটের দিকে যাচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা- সব কিছুই এখন এই যুদ্ধের প্রভাবের মধ্যে চলে এসেছে।

তিন দেশে একের পর এক হামলা ইরানের : মধ্যপ্রাচ্যের তিন দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত তিনটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে কয়েক দফায় হামলা চালানোর দাবি জানিয়েছে ইরান। গতকাল শনিবার ইরানের নৌবাহিনী ওই অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে এসব হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে।

ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌপ্রধান অ্যাডমিরাল আলিরেজা তাংসিরির বরাত দিয়ে দেশটির সংবাদমাধ্যমের খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ওই অঞ্চলের তিনটি সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন বাহিনীর ওপর পরপর কয়েক দফায় হামলা চালিয়েছে ইরানের নৌবাহিনী। আবুধাবির আল-ধাফরা, কুয়েতের আল-আদিরি ও বাহরাইনের শেখ ঈসা ঘাঁটিতে ওই হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

খার্গ দ্বীপে মার্কিন হামলা ও ট্রাম্পের সতর্কবার্তা : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের কাছে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ তেল রফতানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপে ইরানের সামরিক স্থাপনাগুলো ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করে দেয়া হয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ করার পদক্ষেপ চালিয়ে যায়, তবে দ্বীপটির তেল অবকাঠামোও হামলার লক্ষ্য হতে পারে।

খার্গ দ্বীপ ইরানের জ্বালানি অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির মোট তেল রফতানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের টার্মিনাল দিয়ে বিশ্ববাজারে যায়। ফলে এখানে হামলা ইরানের অর্থনীতির ওপর বড় আঘাত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে ইরানের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, দ্বীপে তেল রফতানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে এবং মার্কিন হামলা তেল পরিবহনকে থামাতে পারেনি।

আমিরাতে মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি : খার্গ দ্বীপে হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরানের এলিট বাহিনী ইসলামিক রেভোলুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সংযুক্ত আরব আমিরাতকে বার্তা দিয়ে বলেছে- দেশটিতে অবস্থান করা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্বার্থ তাদের ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’।

আইআরজিসির এই সতর্কবার্তা উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি অনেক পুরনো এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহর ঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য সামরিক উপস্থিতির অন্যতম কেন্দ্র।

ইসরাইলের দিকে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র : ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে দেশটির দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে এবং সেগুলো প্রতিহত করার চেষ্টা চলছে। যুদ্ধের এই নতুন ধাপ সরাসরি ইরান-ইসরাইল সংঘর্ষকে আরো তীব্র করে তুলছে। ইসরাইলের দাবি, ইরান ও তাদের মিত্রবাহিনী সমন্বিতভাবে আঞ্চলিক হামলার কৌশল গ্রহণ করেছে। অন্যদিকে ইরান বলছে, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে এসব পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসে হামলা : ইরাকের রাজধানী বাগদাদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস কমপ্লেক্সে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দূতাবাসে স্থাপিত সি-র‌্যাম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার একটি ইউনিট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। এ হামলার দায় এখনো কেউ স্বীকার না করলেও, ইরানপন্থী সশস্ত্র জোট ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’ আগে থেকেই মার্কিন স্বার্থে হামলার হুমকি দিয়ে আসছিল। এই জোটটি ইরানের প্রভাবাধীন বিভিন্ন ইরাকি মিলিশিয়া সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত। তারা সম্প্রতি ঘোষণা করেছে যে কেউ মার্কিন সামরিক বা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিলে তাকে এক লাখ ডলার পুরস্কার দেয়া হবে।

সৌদি আরবে ইরানের হামলায় ৫টি মার্কিন রিফুয়েলিং উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত : সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে মার্কিন বিমানবাহিনীর পাঁচটি রিফুয়েলিং (জ্বালানি সরবরাহকারী) উড়োজাহাজ ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুইজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে গত শুক্রবার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এ তথ্য জানিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি সৌদি আরবের ওই ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময় উড়োজাহাজগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে সেগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়নি। বর্তমানে উড়োজাহাজগুলোর মেরামতের কাজ চলছে। এই হামলায় কেউ নিহত হয়নি বলেও জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যমটি।

ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে কোনো দেশকে সৌদি আরবের আকাশসীমা ও ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না দেয়ার কথা বলে আসছে রিয়াদ। এর মধ্যেই ইরানের হামলায় সৌদির বিমানঘাঁটিতে মার্কিন সামরিক উড়োজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর এলো।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাতে ইরাকে একটি মার্কিন রিফুয়েলিং উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়। এতে উড়োজাহাজে থাকা ছয়জন ক্রুর সবাই নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) পরদিন বিষয়টি জানিয়ে দাবি করেছে, ‘শত্রুপক্ষ বা মিত্রপক্ষের গুলিতে’ উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয়নি। তবে ইরাকের ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স নামের একটি গোষ্ঠী দাবি করেছে, তারা উড়োজাহাজটি ভূপাতিত করেছে।

হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ : বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো হরমুজ প্রণালির কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়া। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুদ্ধের কারণে এখানে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইরাক বিকল্প তেল রফতানি পথ খুঁজছে। দেশটির তেল মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কিরকুক থেকে তুরস্কের জেইহান তেল টার্মিনাল পর্যন্ত পাইপলাইন পুনরুদ্ধারের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেয়া হচ্ছে।

তেলআবিবে আতঙ্ক : তুরস্কের সিনিয়র সাংবাদিক ইব্রাহিম কারাগুল গতকাল সোশ্যাল মিডিয়ায় তার এক্স অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে জানিয়েছেন, ইরান চলমান যুদ্ধে ইসরাইলি নেতা, মন্ত্রী, কমান্ডার, পাইলট এবং গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বাড়ি, ঠিকানা এবং গোপন স্থানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা শুরু করেছে। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু, নির্দিষ্ট ঠিকানা, সঠিক আক্রমণ...। ইসরাইলের ভেতরে অভিযান শুরু করেছে।

তেলআবিবে প্রচণ্ড আতঙ্ক বিরাজ করছে। কেউ কেউ তাদের জীবনের জন্য লড়াই করছে। তারা সবাই লুকিয়ে আছে। তারা জানত না যে ইরানের এত ক্ষমতা আছে। তারা তাদের ইচ্ছামতো কাজ করছিল, নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তারা হতবাক হয়ে গিয়েছিল।

আমাদের বিবেচনা করা উচিত কে ইরানকে এই ক্ষমতা দিয়েছে, কে নেভিগেশন এবং ডিজিটাল গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করেছে।

তখনই আরেকটি যুদ্ধ শুরু হয়।

এটা যেন কেউ ইসরাইলকে নির্মূল করতে যাচ্ছে, ইরানকে নয়...।

আরব দেশগুলোতে হামলা বন্ধে ইরানকে হামাসের আহ্বান : ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এক বিবৃতিতে প্রতিবেশী আরব দেশগুলোতে হামলা বন্ধের অনুরোধ জানিয়েছে ফিলিস্তিনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস। একই সাথে এই অঞ্চলে ইরানকে লক্ষ্য করে মার্কিন ও ইসরাইলি হামলা রুখতে আঞ্চলিক দেশগুলোকে সহযোগিতা ও ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে গোষ্ঠীটি।

গতকাল শনিবার দেয়া এক বিবৃতিতে হামাস এই আহ্বান জানায়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এটিই হামাসের পক্ষ থেকে দেয়া প্রথম আনুষ্ঠানিক বিবৃতি। এতে হামাস বলেছে, আন্তর্জাতিক রীতি ও আইন অনুযায়ী যেকোনো উপায়ে এই আগ্রাসনের জবাব দেয়ার অধিকার ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের রয়েছে। তবে আমরা ইরানের ভাইদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, তারা যেন প্রতিবেশী দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা থেকে বিরত থাকে।

ইরান ও কাতারের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা এই গোষ্ঠীটি আরো উল্লেখ করেছে যে, এই যুদ্ধ বন্ধ হওয়া বর্তমান অঞ্চলের সামগ্রিক স্বার্থে অত্যন্ত জরুরি। উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর জোট অক্ষশক্তির প্রধান অংশীদার হলো হামাস।

বাহরাইনের প্রতিরক্ষা প্রতিরোধ : উপসাগরীয় ছোট রাষ্ট্র বাহরাইন জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তারা ১২৪টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২০৩টি ড্রোন প্রতিহত করেছে। বাহরাইন যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের ঘাঁটি হওয়ায় ইরানের হামলার অন্যতম লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। ফলে দেশটি এখন উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে।

কাতারের গ্যাস উৎপাদন বন্ধ : সঙ্ঘাতের কারণে জ্বালানি বাজারেও বড় ধাক্কা লেগেছে। বিশ্বের অন্যতম বড় গ্যাস রফতানিকারক কাতার নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে সাময়িকভাবে গ্যাস উৎপাদন বন্ধ করেছে। কাতারের জ্বালানি মন্ত্রী জানিয়েছেন, স্বাভাবিক সরবরাহ ফিরে আসতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। এর ফলে বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এখন বন্ধ রয়েছে।

জাপানের জ্বালানি উদ্বেগ : মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে এশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তাতেও। জাপান অস্ট্রেলিয়ার কাছে এলএনজি উৎপাদন বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে। জাপানের শিল্পমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই সঙ্কটকালে অস্ট্রেলিয়ার স্থিতিশীল এলএনজি সরবরাহ জাপান ও এশিয়ার জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ‘লাইফলাইন’। বর্তমানে জাপানের মোট এলএনজি আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশই অস্ট্রেলিয়া থেকে আসে।

লেবানন-ইসরাইল যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ : এই সঙ্ঘাতের বিস্তার ঠেকাতে কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো জানিয়েছেন, তিনি প্যারিসে লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে সরাসরি আলোচনার আয়োজন করতে প্রস্তুত। তিনি উভয় পক্ষকে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন এবং বলেছেন-আঞ্চলিক সঙ্ঘাত থামাতে এখনই রাজনৈতিক সমাধানের উদ্যোগ নেয়া জরুরি।

লেবাননের আকাশে যুদ্ধের মধ্যেও ফ্লাইট : এদিকে লেবাননের জাতীয় বিমান সংস্থা যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও ফ্লাইট চালু রেখেছে। রাজধানী বৈরুতের বিমানবন্দরের আশপাশে প্রতিদিন ইসরাইলি বিমান হামলা হলেও সংস্থাটি নিরাপত্তা মূল্যায়ন করে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। এর উদ্দেশ্য হলো যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যেও দেশটিকে আন্তর্জাতিক বিশ্বের সাথে সংযুক্ত রাখা।

আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে পরিস্থিতি : মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি অনেক বিশ্লেষকের মতে একটি পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। এরই মধ্যে এই সঙ্ঘাতে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, ইসরাইল, ইরাকের বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠী এবং উপসাগরীয় কয়েকটি রাষ্ট্র। যদি হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে বা খার্গ দ্বীপের তেল অবকাঠামোতে বড় ধরনের হামলা হয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা খেতে পারে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম এরই মধ্যে অস্থির হয়ে উঠেছে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলো নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করছে।

বৈশ্বিক প্রভাব : এই যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকেই নয়, বিশ্ব অর্থনীতি ও নিরাপত্তা কাঠামোকেও প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে তিনটি বিষয় এখন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের নজরে-

১. হরমুজ প্রণালি দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ থাকলে জ্বালানি সঙ্কট কতটা তীব্র হবে। ২. ইরান-ইসরাইল সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে আঞ্চলিক সঙ্ঘাত কতটা বিস্তৃত হবে। ৩. যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি বাড়লে রাশিয়া ও চীনের প্রতিক্রিয়া কী হবে।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখন এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে যেকোনো নতুন হামলা বা পাল্টা হামলা পুরো অঞ্চলকে আরো বড় সঙ্ঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। বিশ্ব এখন নজর রাখছে- এই সঙ্ঘাত কি কূটনৈতিক সমাধানের দিকে যাবে, নাকি আরো বিস্তৃত এক যুদ্ধের দিকে।