নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- গাজায় দখল বজায় রাখতে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাজেট ৩৪ বিলিয়ন ডলার
- যুদ্ধবিরতি দ্বিতীয় ধাপ শুরুর ঘোষণা দিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র
গাজা উপত্যকা শাসন চালিয়ে যেতে চায় না হামাস। সংগঠনটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গতকাল শুক্রবার আল আরাবিয়াকে এ কথা জানিয়েছে। ওই কর্মকর্তা বলেন, গাজা পরিচালনার জন্য যুদ্ববিরতির পরবর্তী পর্যায়ে একটি টেকনোক্র্যাট কমিটি গঠনের প্রস্তাবে হামাস এরই মধ্যে সম্মতি দিয়েছে। তিনি বলেন, টেকনোক্র্যাট কমিটি জন্য প্রস্তাবিত সব নাম হামাস অনুমোদন করেছে এবং এ বিষয়ে অভ্যন্তরীণ ঐকমত্য রয়েছে। তবে তিনি অভিযোগ করেন, আলোচনায় অগ্রগতি হলেও ইসরাইল বাস্তবে পদক্ষেপ বাস্তবায়নে বাধা দিচ্ছে।
হামাসের কর্মকর্তা আরো বলেন, আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের ভূমিকা শুধু যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণে সীমিত থাকবে। তারা গাজা পরিচালনা বা অভ্যন্তরীণ শাসনে অংশ নেবে না। তাদের কাজ হবে পক্ষগুলোকে আলাদা রাখা এবং নতুন সঙ্ঘাত ঠেকানো। তিনি জানান, মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোও আন্তর্জাতিক বাহিনীকে কেবল পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব দেয়ার পক্ষে।
মার্কিন মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি ১০ অক্টোবর কার্যকর হয়। এতে দুই বছরের যুদ্ধ থেমে যায়, যা শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলের ওপর হামাসের প্রাণঘাতী আক্রমণের পর। এ যুদ্ধে গাজা উপত্যকা ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও উভয়পক্ষ একে অপরকে শর্ত ভঙ্গের অভিযোগ করে যাচ্ছে।
ইসরাইলের বড় প্রতিরক্ষা বাজেট :
এ দিকে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাজেট ২০২৬ সালের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১১২ বিলিয়ন শেকেল (৩৪.৬৩ বিলিয়ন ডলার)। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় গতকাল শুক্রবার এ তথ্য জানিয়েছে। আগের খসড়া বাজেটে এ পরিমাণ ছিল ৯০ বিলিয়ন শেকেল। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরাইল ক্যাটজ ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ বাজেট কাঠামোতে সম্মত হয়েছেন। আগামী বছরের বাজেট মার্চের মধ্যে অনুমোদন না হলে নতুন নির্বাচনের সম্ভাবনা রয়েছে। দেশটির মন্ত্রীপরিষদে বাজেট অনুমোদনে গতকাল শুক্রবার প্রাথমিক ভোট হওয়ার কথা। মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদন পেলে বাজেট সংসদে যাবে। ক্যাটজ বলেছেন, সেনাদের প্রয়োজন মেটানো এবং রিজার্ভ বাহিনীর ওপর চাপ কমানো অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, ‘আমরা ইসরাইলি সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করতে এবং যোদ্ধাদের প্রয়োজন পূরণে দৃঢ়ভাবে কাজ চালিয়ে যাবো, যাতে প্রতিটি ফ্রন্টে ইসরাইলের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়।’
দ্রুত যুদ্ধবিরতি দ্বিতীয় ধাপ ঘোষণা :
হামাস ও দখলদার ইসরাইলের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে ঘোষণা দিতে চায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরাইল গতকাল জানিয়েছে, দুই মাস আগে হওয়া ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি অক্ষুণœ রাখতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। এর অংশ হিসেবে পরবর্তী ধাপ ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা।
দ্বিতীয় ধাপ শুরু হলে হামাসের জায়গায় গাজা পরিচালনার দায়িত্ব নেবে একটি অন্তর্বর্তী সরকার। এ ছাড়া গাজার নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার ঘোষণার অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্য এবং নিরাপত্তা বাহিনী পাঠানো দেশগুলোর নাম ঘোষণা করবেন বলে জানিয়েছেন এক মার্কিন কর্মকর্তা। কারা কারা এতে যোগ দেবে এ নিয়ে এখনো কাজ চলছে।
ধারণা করা হচ্ছে এ বছরের শেষ দিকে নতুন সরকার গঠন নিয়ে ঘোষণা আসতে পারে। তবে এর আগে বিষয়টি চূড়ান্ত হবে না। কারণ হামাস কিভাবে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব হস্তান্তর ও অস্ত্র জমা দেবে এ ব্যাপারে এখনো কাতার, মিসর ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর সাথে তাদের আলোচনা চলছে।
হামাস স্পষ্ট করেছে ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটদের নিয়ে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে তারা ক্ষমতা ছাড়তে রাজি আছে। কিন্তু ট্রাম্পের ঘোষিত বোর্ড অব পিসের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। এই বোর্ড অব পিসে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারসহ বেশ কয়েকজন বিতর্কিত ব্যক্তির নাম শোনা গেছে। এ ছাড়া হামাস জানিয়েছে, তারা কখনো রক্ষণাত্মক অস্ত্র জমা দেবে না। কারণ যেহেতু ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি দখলদারিত্ব রয়েছে, তাই এ ধরনের অস্ত্র রাখা তাদের অধিকার।
বাস্তবায়নের আহ্বান মিসরের :
মিডল ইস্ট মনিটরের খবর অনুসারে, মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাদর আবদেল আতি গাজা উপত্যকা বিভক্ত করার যেকোনো আলোচনা প্রত্যাখ্যান করে যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা পূর্ণ আস্থা রাখি যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও যুক্তরাষ্ট্র এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অংশ নেবেন। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্যই তৈরি করা হয়েছে এবং আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে তা শক্তিশালী করছি।’
আবদেল আতি জোর দিয়ে বলেন, বিলম্ব না করে যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপ কার্যকর করা জরুরি। তিনি সতর্ক করেন, কোনো কারণেই এ পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত বা বিলম্বিত হওয়া উচিত নয়। গাজায় আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের আলোচনার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এর ক্ষমতা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি। এই বাহিনী যত দ্রুত সম্ভব গাজায় মোতায়েন করা উচিত, যাতে যুদ্ধবিরতির শর্ত মানা হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করা যায়।’
মন্ত্রী আরো জানান, মিসর গাজায় একটি বেসামরিক প্রশাসনিক কমিটি গঠনের চেষ্টা করছে, যা স্থানীয় বাসিন্দাদের মৌলিক সেবা দেবে। তিনি যোগ করেন, পরবর্তীতে ক্ষমতা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে হস্তান্তর করা উচিত এবং নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকবে কেবল ফিলিস্তিনি পুলিশ।
হামাস নেতাদের ওপর হামলার আশঙ্কা :
হামাস আশঙ্কা করছে, নন-আরব কিছু দেশে তাদের শীর্ষ নেতাদের লক্ষ্য করে ইসরাইল হামলা চালাতে পারে। এই সম্ভাব্য ঝুঁঁকির কারণে বিদেশে থাকা নেতাদের জন্য নতুন নিরাপত্তা নির্দেশনা দিয়েছে গোষ্ঠীটি। সৌদি আরবের সংবাদমাধ্যম আশরাক আল-আসওয়াতের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
হামাসের গোপন কয়েকটি সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত সেপ্টেম্বর কাতারের রাজধানী দোহায় হামাস নেতাদের ওপর ইসরাইল যেভাবে হামলা চালায়, ভবিষ্যতে সেই ধরনের হামলা নন-আরব দেশেও হতে পারে। দোহায় যে ভবনে হামাস নেতারা বৈঠক করছিলেন, সেখানে ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হলেও তারা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। সূত্রগুলো জানিয়েছে, এবার কোনো নন-আরব দেশকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে তা এখনো নিশ্চিত নয়।
তবে হামাস নেতারা এটিকে ‘গুরুতর সম্ভাবনা’ বলে মনে করছেন। এ কারণে বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের জন্য বেশ কিছু কঠোর নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে একই স্থানে একাধিকবার বৈঠক করা যাবে না, প্রতিটি বৈঠক ভিন্ন স্থানে আয়োজন করতে হবে, বৈঠকে অংশ নেয়া কেউই বৈঠকস্থলের ৭০ মিটারের মধ্যে মোবাইল ফোন রাখতে পারবেন না, কারণ মোবাইলের সিগন্যাল ট্র্যাক করে অবস্থান শনাক্ত করা যায়, যেসব ভবনে এসি, ইন্টারনেট রাউটার, টেলিভিশন বা ইন্টারকম রয়েছে সেসব ভবনে বৈঠক করা নিষেধ। এসব যন্ত্রের মাধ্যমেও অবস্থান শনাক্তের ঝুঁকি থাকে। হামাস মনে করছে, নেতাদের নিরাপদ রাখতে এখনই এ পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। সাম্প্রতিক দোহা হামলা দেখিয়েছে ইসরাইল বিদেশেও তাদের নেতাদের লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে।



