পরমাশীষ ঘোষ রায় ভারতের কলকাতাভিত্তিক জনপ্রিয় ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম প্রথম কলকাতার ডেপুটি এডিটর, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সংবাদ উপস্থাপক। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক ইস্যুতে তিনি নিয়মিত বিশ্লেষণ করে থাকেন। নয়া দিগন্তকে দেয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, গণমাধ্যমের ভূমিকা ও বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে কথা বলেছেন।
প্রশ্ন : শেখ হাসিনা দেশে ফেরার কথা কেন বলছেন? এর রাজনৈতিক তাৎপর্য কী?
পরমাশীষ ঘোষ রায় : এটি মূলত একটি রাজনৈতিক বার্তা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে তিনি নিজের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা যাচাই করতে চাইছেন। এক দিকে এটি দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বার্তা, অন্য দিকে রাজনৈতিক সহানুভূতি অর্জনেরও একটি কৌশল। তিনি জানেন দেশে ফিরলে গ্রেফতার বা বিচার হতে পারে। তবুও ঝুঁকি নিয়ে ফেরার কথা বলায় রাজনৈতিকভাবে একটি ইতিবাচক আবহ তৈরির চেষ্টা রয়েছে। তবে এটি কতটা সফল হবে, তা বাংলাদেশের জনগণই নির্ধারণ করবেন।
প্রশ্ন : শেখ হাসিনার এই ঘোষণা কি বাস্তব রাজনৈতিক কর্মসূচি?
পরমাশীষ ঘোষ রায় : এখন পর্যন্ত আমি এটিকে রাজনৈতিক কর্মসূচি বলব না। তিনি নির্দিষ্ট করে বলেননি কবে ফিরবেন, কোথায় আত্মসমর্পণ করবেন বা কিভাবে ফিরবেন। তবে দুই বছর নির্বাসনের পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে নিজের রাজনৈতিক পুনর্গঠনের কথা বলছেন- এটিকে একেবারে গুরুত্বহীনও বলা যাবে না। এটি মূলত রাজনৈতিক আবহ তৈরির চেষ্টা।
প্রশ্ন : আওয়ামী লীগ কি আবার রাজনীতিতে ফিরতে পারবে?
পরমাশীষ ঘোষ রায় : সেটি সম্পূর্ণ নির্ভর করবে বাংলাদেশের জনগণের ওপর। আওয়ামী লীগকে আগে নিজেদের পরিশুদ্ধ করতে হবে। দল ও নেতাকর্মীদের আত্মসমালোচনা করতে হবে। কেন গণ-অভ্যুত্থান হলো, কোথায় ভুল ছিল- এসব উপলব্ধি করতে হবে। এরপর জনগণের কাছে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে। জনগণ যদি ক্ষমা করেন, তবেই তাদের প্রত্যাবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রশ্ন : আওয়ামী লীগের মধ্যে কি অনুশোচনা বা আত্মসমালোচনার লক্ষণ দেখছেন?
পরমাশীষ ঘোষ রায় : দলকে অবশ্যই আত্মসমালোচনার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের ভুলগুলো স্বীকার করতে হবে। যদি তারা সত্যিকার অর্থে সংশোধনের মানসিকতা নিয়ে জনগণের সাথে সংলাপে আসে, তাহলে হয়তো মানুষের মন জয় করতে পারবে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় তাদের সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর চেষ্টা অনেকটা ছাদহীন বাড়িতে এসি লাগানোর মতো। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব দেশ ছাড়ায় কর্মীদের আস্থার জায়গাও দুর্বল হয়েছে।
প্রশ্ন : শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
পরমাশীষ ঘোষ রায় : বাংলাদেশের মাটিতে তার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা থাকবে কি না, সেটি নির্ধারণ করবেন বাংলাদেশের মানুষ। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায় অনুযায়ী দেশে ফিরলে কী হতে পারে, সেটিও তিনি জানেন। তাই ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। তখন বোঝা যাবে জনগণ কিভাবে বিষয়টি গ্রহণ করছে।
প্রশ্ন : বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন কোন পর্যায়ে রয়েছে?
পরমাশীষ ঘোষ রায় : ভৌগোলিক বাস্তবতায় দুই দেশ একে অপরকে বাদ দিয়ে চলতে পারবে না। ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা, যোগাযোগ- সব ক্ষেত্রেই পারস্পরিক নির্ভরশীলতা রয়েছে। দিল্লিও এখন এই বাস্তবতা উপলব্ধি করছে। বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্ককে ইতিবাচক পথে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। নতুন ভারতীয় হাইকমিশনার বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের সমাজ সম্পর্কে ভালো জানেন, এটিও ইতিবাচক দিক।
প্রশ্ন : দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি কি কূটনৈতিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলছে?
পরমাশীষ ঘোষ রায় : অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিভিন্ন ধরনের বিভাজন থাকতেই পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক অন্য নিয়মে পরিচালিত হয়। সরকার বদলালেও কূটনৈতিক সম্পর্ক চলতে থাকে। তবে ভিসা প্রক্রিয়া সহজ ও দালালমুক্ত করা জরুরি।
প্রশ্ন : দুই দেশের সম্পর্কে গণমাধ্যম ও ইউটিউবারদের ভূমিকা কী?
পরমাশীষ ঘোষ রায় : ২০২৪ সালের পর দুই দেশের কিছু ইউটিউবার ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার ভিউ ও টিআরপির জন্য বিভেদ তৈরি করছেন। তারা ব্যক্তিগত লাভের জন্য দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষতি করছেন; অথচ সাধারণ মানুষ চিকিৎসা, ব্যবসা ও নানা প্রয়োজনে নিয়মিত দুই দেশে যাতায়াত করছে। সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব হওয়া উচিত বিভাজন নয়, বরং সম্পর্কের সেতুবন্ধন তৈরি করা।
প্রশ্ন : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকে কিভাবে দেখছেন?
পরমাশীষ ঘোষ রায় : এটি বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। ভারত চেয়েছিল তিনি আগে দিল্লি সফর করুন। কিন্তু তিনি আগে চীনে গেছেন, যা দিল্লিতে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি করেছে। সফরের মূল উদ্দেশ্য চীনা বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত সহযোগিতা বৃদ্ধি। তবে বাংলাদেশ কার সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলবে, সেটি তাদের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত। একই সাথে ভারতেরও নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থ রয়েছে। তাই শেষ পর্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিই সবচেয়ে কার্যকর হবে।
প্রশ্ন : বাংলাদেশ-চীন-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ আপনি কিভাবে দেখছেন?
পরমাশীষ ঘোষ রায় : চীনের বিনিয়োগ বাংলাদেশের প্রয়োজন, আবার ভারতের সাথে স্থিতিশীল সম্পর্কও বাস্তবতার দাবি। সীমান্ত বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা, ভিসা ও নদী ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের সহযোগিতা অপরিহার্য। তাই প্রতিযোগিতা নয়, ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে লাভজনক হবে।
প্রশ্ন : শেষ কথা হিসেবে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?
পরমাশীষ ঘোষ রায় : আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে তাদের আত্মসমালোচনা, সংশোধন ও জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের ওপর। তারা যদি সত্যিকার অর্থে নিজেদের ভুল স্বীকার করে জনগণের কাছে ফিরে আসতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু সেটি নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের জনগণ- গণমাধ্যম বা অন্য কেউ নয়।



