রক্তরঞ্জিত জুলাই-২

গণপদযাত্রা শেষে ১ ঘণ্টা সড়ক অবরোধ শিক্ষার্থীদের

যেসব দিনের কর্মসূচি জুলাইকে গণ-অভ্যুত্থানের দিকে ধাবিত করেছে সেসব দিনের মধ্যে আজকের দিনটি অন্যতম। এই দিন কোটাবিরোধী শিক্ষার্থীদের পূর্বনির্ধারিত গণপদযাত্রা কর্মসূচি ছিল।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition
রক্তরঞ্জিত জুলাই-২
রক্তরঞ্জিত জুলাই-২

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শুরুর দিকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন ছিল গত বছরের জুলাইয়ের ২ তারিখ। যদিও তখন পর্যন্ত জুলাইয়ের কোটাবিরোধী আন্দোলন তার স্বরূপ থেকে গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়নি। তবে যেসব দিনের কর্মসূচি জুলাইকে গণ-অভ্যুত্থানের দিকে ধাবিত করেছে সেসব দিনের মধ্যে এই দিনটিও অন্যতম। এই দিন কোটাবিরোধী শিক্ষার্থীদের পূর্বনির্ধারিত গণপদযাত্রা কর্মসূচি ছিল। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটাসহ অযৌক্তিক সব কোটা বাতিল করে ২০১৮ সালে দেয়া প্রজ্ঞাপন পুনর্বহালের দাবিসহ ৪ দফা দাবিতে আগের দিন তথা সোমবারের ঘোষিত গণপদযাত্রাটি ২ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে থেকে শুরু হয়।

পদযাত্রাটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে হলপাড়া ঘুরে নীলক্ষেত দিয়ে নিউমার্কেট-সাইন্সল্যাব হয়ে শাহবাগে যায়। পদযাত্রাটি শাহবাগে পৌঁছানোর সাথে সাথেই শিক্ষার্থীরা সেখানে বসে পড়েন। পদযাত্রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি আশপাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেন। পদযাত্রায় শিক্ষার্থীরা ‘কোটা না মেধা-মেধা মেধা’, ‘আপস না সংগ্রাম-সংগ্রাম সংগ্রাম’, ‘আঠারোর পরিপত্র-পুনর্বহাল করতে হবে’, ‘কোটাপ্রথা নিপাত যাক-মেধাবীরা মুক্তি পাক’, ‘সারা বাংলায় খবর দে-কোটাপ্রথার কবর দে’, ‘আমার সোনার বাংলায়-বৈষম্যের ঠাই নাই’, ‘জেগেছে রে জেগেছে-ছাত্রসমাজ জেগেছে’, ইত্যাদি স্লোগান দেন।

শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধের আগেই শাহবাগে সাত দাবিতে মুক্তিযোদ্ধা সন্তান সংসদের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে সংগঠনটির নেতারা তাদের ভাষ্যমতে তথাকথিত কোটা নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী ‘বিএনপি’ ও ‘রাজাকারের সন্তানদের’ অপরাজনীতির প্রতিবাদ জানান। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান সোলায়মান মিয়া ওই সমাবেশে বলেন, কোটা নিয়ে শিক্ষার্থীদেরকে বিভ্রান্ত করে রাজনৈতিক সুবিধা দেয়ার হীন চক্রান্তে লিপ্ত হওয়া জামাত, বিএনপি ও রাজাকারের সন্তানদের কোনো অবস্থায় ছাড় দেয়া হবে না। প্রশাসনে বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের শূন্য করার লক্ষ্যে কোটা বাতিল এর ষড়যন্ত্র চলছে। কারণ তারা জানে যে বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা অফিস-আদালতে থাকলে দুর্নীতি করা খুবই কঠিন হবে। রাজাকার ও স্বাধীনতাবিরোধীদের কৌশলের কাছে কোটা সংস্কার আন্দোলনের নামে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল ছিল সরকারের চরম ভুল সিদ্ধান্ত, মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল করে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার নিজের ঘাড়ে, নিজেই কুড়াল মেরেছে, সরকারের হার মানা ছিল দুঃখজনক ও আত্মঘাতী।

সংগঠনটি সমাবেশ শেষে একটি বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সন্ত্রাসবিরোধী রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে যায়। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানরা সরকারের কাছে ৭ দফা দাবি জানান। দাবিগুলো হলো- মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংরক্ষণ করণসহ দেশের সব চাকরির নিয়োগে, সব পদে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহাল করতে হবে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও পরবর্তী প্রজন্মকে এই প্রাপ্য অধিকার দিতে হবে; বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের চাকরির অবসরের বয়স ৬১ বছর করতে হবে; বীর মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের ওপর হামলা, মামলা, নির্যাতন, জমি দখল বন্ধে সুরক্ষা আইন পাস এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রেণী ও মর্যাদা নির্ধারণসহ বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তানদের স্বল্প সুদে ঋণ, বীর মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী-সন্তানদের সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে চিকিৎসাসেবা দিতে হবে, সম্মানীভাতা বৃদ্ধিসহ রাজাকারের তালিকা প্রকাশ করতে হবে; মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তানদের জন্য জাতীয় সংসদে ৫০টি আসন ও জেলা পরিষদসহ সব পরিষদে, গভর্নিং কমিটি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা কমিটিতে দুইজন করে সদস্য নীতি নির্ধারক ফোরামে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলকভাবে নিশ্চিত করতে হবে; দুর্নীতি বন্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করতে হবে; বাজারে হঠাৎ মূল্য বৃদ্ধির সিন্ডিকেট, ঘুষ, দুর্নীতি ও মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে এবং বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তানের মৃত্যুর পর তার ভাতার অংশ তার স্ত্রী অথবা সন্তান, বা নাতি-নাতনীদের নামে চালু রাখতে হবে।

জুলাইয়ের এই দিনটিতেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সর্বাত্মক কর্মবিরতির কারণে অচলাবস্থায় ছিল। কোন বিশ্ববিদ্যালয়েই ক্লাস-পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। এই দিন শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে প্রত্যয় স্কিম নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় একটি ব্যাখ্যা দেয়। যা তারা প্রত্যাখ্যান করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করে সেটি না মানার এবং আন্দোলন ও কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।