রায়গঞ্জ (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা
- বছরে ১৫ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি
- উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হাজারো কৃষক
সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি দীর্ঘ দিন ধরে স্থায়ী জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে কৃষি উৎপাদনের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। খাল-নালা ভরাট, অপর্যাপ্ত ব্রিজ-কালভার্ট, অপরিকল্পিত পুকুর খনন এবং দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে বছরের অধিকাংশ সময় জমিতে পানি জমে থাকছে। ফলে উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের অন্তত ২৪টি গ্রামের প্রায় ৮৩৩ হেক্টর কৃষিজমি অনাবাদি পড়েছে।
উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ধামাইনগর, ধুবিল, সোনাখাড়া, পাঙ্গাসী, নলকা, ঘুড়কা, ধানগড়া, চান্দাইকোনা ও ব্রহ্মগাছা ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় প্রতি বছরই জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। কোথাও খাল-নালার স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে, আবার কোথাও অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ, পুকুর খনন ও বসতবাড়ি তৈরির কারণে পানি চলাচলের পথ সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। ফলে বর্ষা মৌসুম শেষ হলেও মাঠে দীর্ঘ সময় পানি আটকে থাকে।
কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতি হেক্টর জমিতে গড়ে সাড়ে তিন থেকে চার টন ধান উৎপাদন সম্ভব। কিন্তু জলাবদ্ধতার কারণে ৮৩৩ হেক্টর জমিতে আবাদ ব্যাহত হওয়ায় বছরে প্রায় দুই হাজার ৯০০ থেকে তিন হাজার ৩০০ টন ধান উৎপাদন কমে যাচ্ছে। বর্তমান বাজারমূল্যে এর আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৯ থেকে ১১ কোটি টাকা। সার, বীজ, শ্রম ও অন্যান্য ব্যয় বিবেচনায় নিলে মোট ক্ষতির পরিমাণ বছরে ১২ থেকে ১৫ কোটি টাকারও বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সম্প্রতি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে স্থায়ী জলাবদ্ধতা বিরাজ করছে। কিছু এলাকায় সীমিত আকারে বোরো চাষ হলেও রোপা আমনের আবাদ প্রায় নেই বললেই চলে। বছরের পর বছর পানি জমে থাকায় অনেক জমি পুরোপুরি অনাবাদি হয়ে গেছে।
ধুবিল ইউনিয়নের চকদাদপুর গ্রামের কৃষক আব্দুর রহিম ও সালাম শেখ বলেন, বছরের পর বছর জলাবদ্ধতার সাথে লড়াই করতে করতে তারা এখন ক্লান্ত। সময়মতো জমিতে চাষ করতে না পারায় অনেককে ঋণ করে সংসার চালাতে হচ্ছে। ঘুড়কা ইউনিয়নের কৃষক মুজাম আলী ও হযরত আলী বলেন, জমি থাকলেও চাষাবাদ করা যাচ্ছে না। এতে সংসার চালানো এবং সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়ছে। সোনাখাড়া এলাকার কৃষক আব্দুল কুদ্দুস ও মতিন জানান, একসময় এসব জমিতে বছরে দুই মৌসুমে ফসল উৎপাদন হতো। এখন একটি ফসলও ঠিকমতো ফলানো যায় না। জমি থাকলেও উৎপাদন না হওয়াই তাদের সবচেয়ে বড় কষ্ট।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রাকৃতিক খাল-নালা ও জলাধার ভরাট হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি যত্রতত্র পুকুর খনন, পানি চলাচলের পথ দখল এবং অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের কারণে পরিস্থিতি দিন দিন আরো জটিল আকার ধারণ করছে। ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেও সেই পানি নিষ্কাশনে দীর্ঘ সময় গেলে যায়।
রায়গঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো: মমিনুল ইসলাম বলেন, জলাবদ্ধতা উপজেলার কয়েকটি এলাকার দীর্ঘ দিনের সমস্যা। এর ফলে কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়াটাই স্বাভাবিক। সমস্যার স্থায়ী সমাধানে খাল পুনঃখনন, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ জরুরি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: আবদুল খালেক পাটোয়ারী বলেন, জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ঘুড়কা ইউনিয়নের নতুনপাড়া এলাকায় উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় পাইপলাইন স্থাপনের মাধ্যমে প্রায় ২৫ বছরের জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান হয়েছে। এ ছাড়া যেসব এলাকায় খাল খনন, ড্রেন সংস্কার, পাইপলাইন ও কালভার্ট স্থাপন প্রয়োজন, সেসব বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
কৃষি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, জলাবদ্ধতা শুধু মৌসুমি ফসলহানির কারণ নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদে মাটির উর্বরতা কমিয়ে দিচ্ছে, খাদ্য উৎপাদনে ঘাটতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাদের মতে, খাল-নালা পুনঃখনন, দখলমুক্তকরণ, পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং প্রয়োজনীয় স্থানে পাইপলাইন ও কালভার্ট নির্মাণ ছাড়া এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেয়া না হলে প্রতিবছর আরো বেশি পরিমাণে কৃষিজমি অনাবাদি হয়ে পড়বে এবং কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলের অর্থনীতি আরো ক্ষতিগ্রস্ত হবে।



