বিদ্রোহী প্রার্থীদের নির্বাচন থেকে সরানোর চেষ্টায় বিএনপি

ধানের শীষ না পেয়ে শতাধিক আসনে বিএনপির নেতারা এখনো স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের মাঠে রয়েছেন। তবে বিএনপি চায় না, ধানের শীষ ও জোটের প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিতে দলের নেতারা অন্য কোনো ব্যানারে মাঠে থাকুক। এ জন্য তাদের নির্বাচনের মাঠ থেকে সরাতে নানা তৎপরতা শুরু করেছে দলটি। বিএনপির বিভিন্ন পর্যায় থেকে তাদের বুঝিয়ে নির্বাচন থেকে বসিয়ে দেয়ার উদ্যোগ চলমান রয়েছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

বিদ্রোহী প্রার্থীদের নানাভাবে বুঝিয়ে এবং ভবিষ্যতে মূল্যায়নের আশ্বাস দিয়ে নির্বাচনের মাঠ থেকে সরানোর চেষ্টা করছে বিএনপি। দলের চেয়ারম্যান নিজেই দলের মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাওয়া স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সাথে কথা বলা শুরু করেছেন। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন প্রার্থী নির্বাচনের মাঠ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণাও দিয়েছেন। তবে শতাধিক আসনে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকা প্রার্থীদের সবাইকে শেষ পর্যন্ত সরানো যাবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

শরিকদের সাথে আসন সমঝোতার ভিত্তিতে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে বিএনপি। ধানের শীষ না পেয়ে শতাধিক আসনে বিএনপির নেতারা এখনো স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের মাঠে রয়েছেন। তবে বিএনপি চায় না, ধানের শীষ ও জোটের প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিতে দলের নেতারা অন্য কোনো ব্যানারে মাঠে থাকুক। এ জন্য তাদের নির্বাচনের মাঠ থেকে সরাতে নানা তৎপরতা শুরু করেছে দলটি। বিএনপির বিভিন্ন পর্যায় থেকে তাদের বুঝিয়ে নির্বাচন থেকে বসিয়ে দেয়ার উদ্যোগ চলমান রয়েছে। এর অংশ হিসেবে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানও তাদের সাথে কথা বলছেন; বিশেষ করে যেসব আসন গুরুত্বপূর্ণ, সমঝোতার ভিত্তিতে জোট শরিকদের যেসব আসন ছেড়ে দেয়া হয়েছে, সেসব আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে থাকা দলের নেতাদের নির্বাচন থেকে সরে গিয়ে ধানের শীষ বা জোটের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার নির্দেশনা দিচ্ছেন। একই সাথে বিএনপি সরকার গঠন করলে তাদের মূল্যায়ন করা হবে বলেও দলের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেয়া হচ্ছে। আর বহিষ্কৃত হলে শিগগিরই বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের ব্যাপারেও আশ্বস্ত করা হচ্ছে।

জানা গেছে, তারেক রহমানের সাথে ইতোমধ্যে যারা সাক্ষাৎ করেছেন, তাদের সবাই নির্বাচন করবেন না বলে জানিয়েছেন। বিএনপি আশা করছে, দলের এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে বিষয়টির সমাধান হবে। এ জন্য মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন আগামী ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করবে দল।

দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া নেতাদের ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে দেখছে বিএনপি। অঞ্চলভিত্তিক বা কেন্দ্রীয়ভাবে আলোচনা বা বোঝানোর এই প্রক্রিয়াকে ‘বিদ্রোহীদের’ জন্য শেষ সুযোগ হিসেবে দেখছে দল। এরপরও নির্বাচনের মাঠে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এরই মধ্যে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হওয়ার অভিযোগে ১০ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বিএনপি মনে করছে, বিদ্রোহী প্রার্থীদের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে ভোটের মাঠে তাদের অবস্থান আরো শক্তিশালী হবে। তাই দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষাই এখন বিএনপির সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। কারণ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে অত্যন্ত কঠিন মনে করছে দলটি।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, আমরা মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন পর্যন্ত দেখব। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন- নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে আমরা তাদের বুঝাচ্ছি, এমনকি বিএনপির চেয়ারম্যানও তাদের বোঝাচ্ছেন। কারণ তারা তো আমাদের ত্যাগী নেতাকর্মী। আন্দোলন-সংগ্রামে তাদের ভূমিকা রয়েছে। তবে আগামী ২০ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন থেকে সরে না দাঁড়ালে, দল তখন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

আসন্ন নির্বাচনে শরিকদের সাথে ১৭টি আসনে সমঝোতা করেছে বিএনপি। ১২টি দলের মধ্যে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ছাড়া বাকি দলগুলো ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের শরিক। তাদের কেউ বিএনপিতে যোগদান করে ধানের শীষে, আবার কেউ নিজেদের দলীয় প্রতীকে ভোট করছেন। বগুড়া-২ আসনে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, ভোলা-১ আসনে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থ, সিলেট-৫ আসনে জমিয়তের মাওলানা মোহাম্মদ উবায়দুল্লাহ ফারুক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব, নীলফামারী-১ আসনে মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে মনির হোসেন কাসেমী, যশোর-৫ আসনে জমিয়তের (অনিবন্ধিত) রশিদ বিন ওয়াক্কাছ, নড়াইল-২ আসনে এনপিপির ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, পটুয়াখালী-৩ আসনে গণ-অধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর, ঝিনাইদহ-৪ আসনে রাশেদ খাঁন, ঢাকা-১২ আসনে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, ঢাকা-১৩ আসনে এনডিএমের ববি হাজ্জাজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, লক্ষ্মীপুর-১ আসনে বাংলাদেশ এলডিপির শাহাদাত হোসেন সেলিম, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির সৈয়দ এহসানুল হুদা, কুমিল্লা-৭ আসনে এলডিপির রেদওয়ান আহমদ এবং হবিগঞ্জ-১ আসনে আমজনতার দলের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক রেজা কিবরিয়াকে আসন ছেড়েছে বিএনপি। অবশ্য মান্না ঢাকা-১৮ আসনেও মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। তবে গতকাল নির্বাচন কমিশনে আপিল করে বগুড়া-২ আসনে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছেন তিনি।

জোটের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে রেদোয়ান আহমদ, ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, রাশেদ খান, শাহাদাত হোসেন সেলিম, এহসানুল হুদা, রেজা কিবরিয়া ও ববি হাজ্জাজ বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন। তবে ঢাকা-১২, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২, পটুয়াখালী-৩, ঝিনাইদহ-৪, নড়াইল-২সহ শতাধিক আসনে এখনো বিএনপির স্বতন্ত্র প্রার্থীরা নির্বাচনের মাঠে রয়েছেন। বিজয় নিশ্চিতে ‘কোনো ব্যানারেই’ যাতে বিএনপির প্রার্থীরা মাঠে না থাকেন, সেটাই জোট নেতাদের চাওয়া।

তাই এরই মধ্যে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, গণ-অধিকারের নুরুল হক নুর এবং জমিয়ত নেতারা পৃথকভাবে বিএনপি চেয়ারম্যানের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। নিজেদের নির্বাচনী এলাকার সমস্যাগুলো তারা জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, বিজয় নিশ্চিতে তাদের আসনগুলোতে কোনো ব্যানারেই বিএনপির প্রার্থীদের রাখা যাবে না।

এ বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে বিএনপি। কারণ, যেকোনো মূল্যে জোটের ঐক্য অটুট রাখতে চায় দলটি। তাই বিদ্রোহী প্রার্থীদের বোঝাতে অঞ্চলভিত্তিক সিনিয়র নেতাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তারা নিজ নিজ দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক এলাকায় বিদ্রোহী প্রার্থীদের সাথে যোগাযোগ করছেন, সরাসরি কথা বলছেন; আগামী নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের গুরুত্ব তুলে ধরছেন। একই সাথে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করলে সম্ভাব্য পরিণতি, সাংগঠনিক চিন্তা সম্পর্কেও ধারণা দেয়া হচ্ছে। সর্বশেষ প্রক্রিয়া হিসেবে তারেক রহমান তাদের কারো কারো সাথে কথা বলছেন।

এরই মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে জোনায়েদ সাকির বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে বহিষ্কৃত হওয়া দলের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল খালেককে গত ৮ জানুয়ারি ঢাকায় ডেকে কথা বলেছেন তারেক রহমান। এরপর নির্বাচন থেকে সরে যান আব্দুল খালেক। তিনি বলেন, দলের বাইরে গিয়ে তো আর পারা যাবে না। চেয়ারম্যান যখন ডেকেছেন, তাকে সম্মান করতেই হবে।

একই দিন তারেক রহমানের সাথে দেখা করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ এ কে একরামুজ্জামান। পরে এক ভিডিওবার্তায় প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তের কথা জানান আরএকে সিরামিকসের এই ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। একইভাবে আরো কয়েকজন প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জোট শরিকদের জন্য ছেড়ে দেয়া অন্য আসনগুলোতে থাকা স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরও শিগগিরই ডাকবেন তারেক রহমান।