কূটনৈতিক প্রতিবেদক
জাতিসঙ্ঘকে ভবিষ্যৎ উপযোগী করে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) সভাপতি ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, বর্তমানে আমরা এমন এক পরিস্থিতিতে আছি যেখানে আস্থার ঘাটতি রয়েছে। এটি ১৯৪৫ সাল নয়। পৃথিবী অনেক এগিয়ে গেছে। এই সংস্থাকেও এগিয়ে যেতে হবে। আমি এগিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করব।
ইউএনজিএর ৮১তম অধিবেশনের প্রথম প্ল্যানারি সেশনের সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় নিউ ইয়র্কে এই প্ল্যানারি সেশন শুরু হয়। এর আগে জাতিসঙ্ঘ সদর দফতরে ইউএনজিএর ৮০তম অধিবেশনের সমাপ্তি পর্ব এবং ৮১তম অধিবেশনের নবনির্বাচিত সভাপতি ড. খলিলুর রহমানের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেজ এবং বিদায়ী সভাপতি অ্যানালেসা বেয়ারবক বক্তব্য রাখেন।
জাতিসঙ্ঘ সদর দতফরে গত ২ জুন ইউএনজিএর ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বাংলাদেশের প্রার্থী খলিলুর রহমান সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস এস কাকুরিসকে পরাজিত করে আগামী এক বছরের জন্য সভাপতির দায়িত্ব পান। ফিলিস্তিন এই প্রতিযোগিতা থেকে আগেই সরে গিয়েছিল।
প্রথম প্ল্যানারি সেশনে খলিলুর রহমান চলতি বছরের জন্য ইউএনজিএর মূল প্রতিপাদ্য তুলে ধরেন। তা হলো, ‘আস্থা পুনরুদ্ধার ও রূপান্তর ব্যবস্থাপনা- এমন একটি জাতিসঙ্ঘ যা সবার জন্য কার্যকর ফলাফল বয়ে আনবে।’ তিনি ইউএনজিএর সভাপতি হিসাবে দায়িত্বপালনকালে অগ্রাধিকারগুলো তুলে ধরেন। এগুলো হলো, সবার জন্য শান্তি, নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নের গতি ত্বরান্বিত করা, জলবায়ু সহনশীলতা ও পরিবেশগত স্থায়িত্ব, মানবাধিকার, মানবিক কার্যক্রম এবং শরণার্থী ও অভিবাসীদের সুরক্ষা, ডিজিটাল শাসনব্যবস্থা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষা এবং বহুপাক্ষিকতা, জাতিসঙ্ঘের সংস্কার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থা।
জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ইউএনজিএর বিদায়ী সভাপতি অ্যানালেসা বেয়ারবকের অর্জনের প্রশংসা করেন এবং খলিলুর রহমানের নতুন মেয়াদের সূচনাকে স্বাগত জানান। তিনি উল্লেখ করেন, সঙ্ঘাত, ভূ-রাজনৈতিক বিভাজন, পারমাণবিক সঙ্ঘাতের ঝুঁকি, অব্যাহত দারিদ্র্য ও বৈষম্য এবং জলবায়ু বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্যেই ইউএনজিএর সভাপতির নতুন মেয়াদের সূচনা হচ্ছে। ইউএনজিএর সভাপতির আরেকটি জরুরি অগ্রাধিকার হলো পরবর্তী জাতিসঙ্ঘ প্রধানকে নির্বাচন করা, যিনি ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে আমার দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন।
জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব বলেন, বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধার করাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই অস্থির সময়ে বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানের ব্যবস্থাটি আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ইউএনজিএর বিদায়ী সভাপতি বেয়ারবক বলেন, আমি জাতিসঙ্ঘের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আগের চেয়ে অনেক বেশি নিশ্চিত। নানাবিধ সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জাতিসঙ্ঘ ছাড়া কোনো দেশেরই কোনো লাভ হতো না।
শপথ গ্রহণের পর সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ড. খলিলুর রহমান বলেন, জাতিসঙ্ঘ ও সামগ্রিক বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা এমন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, যা আমি দীর্ঘ চার দশকের অভিজ্ঞতায় আগে কখনো দেখিনি। তবে এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো ক্ষেত্রে জাতিসঙ্ঘের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা ও সুযোগ কাজে লাগাতে সহযোগিতা ও সংলাপকে আমি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেব। তিনি বলেন, সব সমস্যার দ্রুত ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাধান সম্ভব নয়। কিছু বিষয়ে সমাধান পেতে সময় লাগবে। তবে অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে- এমন ক্ষেত্রগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
নিজের সভাপতিত্বে জাতিসঙ্ঘ সনদ এবং সদস্যরাষ্ট্রগুলোর দেয়া ম্যান্ডেটের প্রতি পুরোপুরি বিশ্বস্ত থাকার কথা জানান ড. খলিলুর রহমান। তার মতে, সদস্যরাষ্ট্রগুলো একসাথে কাজ করলে গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক সঙ্কটগুলো সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ বাড়বে।
জাতিসঙ্ঘের সংস্কারপ্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার কথাও জানান ইউএনজিএর নতুন সভাপতি। একই সাথে তিনি নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, শিল্প ও ব্যবসায়িক নেতৃত্ব, উদ্ভাবন খাত এবং শিক্ষাবিদদের জাতিসঙ্ঘের কার্যক্রমে আরো কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেন।



