ডিএসইর বাজার মূলধনের ২০ হাজার কোটি টাকা হাওয়া

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে গত এক সপ্তাহে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মোট বাজার মূলধন থেকে ২০ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা হাওয়া হয়ে গেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর গত ১ মার্চ প্রথম কার্যদিবসে দেশের পুঁজিবাজারে বড় ধরনের দরপতনের ঘটনা ঘটলেও পর দিন ২ মার্চ হারানো সূচকের একটি অংশ ফিরে পায় বাজারটি। তখনো যুদ্ধের ভয়াবহতা বোঝা যায়নি। পরবর্তীতে এই যুদ্ধ ক্রমান্বয়ে দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে এমন ধারণা থেকে ৩ মার্চ আবার বড় দরপতনের শিকার হয় দেশের পুঁজিবাজার। ওই দিন ডিএসইর প্রধান সূচকটির অবনতি ঘটে ২০৮ পয়েন্টের বেশি। আর এভাবে ব্যাপক দরপতনের ফলে বাজার মূলধনের ২ দশমিক ৮৪ শতাংশ হারিয়ে বসে ডিএসই, যা টাকার অঙ্কে দাঁড়ায় ২০ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, সংবেদনশীল হওয়ার কারণে বিশে^ বড় কোনো দুর্ঘটনার প্রভাব পড়ে সারা বিশে^র পুঁজিবাজারে। আমাদের পুঁজিবাজারও তার ব্যতিক্রম নয়। তা ছাড়া বর্তমানে বিশ^ অর্থনীতির একটি বড় অংশজুড়ে আছে গোটা মধ্যপ্রাচ্য। তাই এ যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব সারা বিশে^র অর্থনীতিতে একটি বড় ধাক্কা। আর এর প্রভাব কতটুকু হবে তা নির্ভর করবে যুদ্ধ কত দীর্ঘমেয়াদি হচ্ছে। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন প্রচার মাধ্যম থেকে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে, দীর্ঘমেয়াদি সঙ্ঘাতের পথে এগুচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য। যদি তাই হয়, তা হলে এর প্রভাবও আরো বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে এ মুহূর্তে বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত না হয়ে খুবই সংযত আচরণ করা উচিত বলে মনে করেন তারা। কারণ যে কোনো ধরনের অসংযত আচরণ বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গত সপ্তাহে ৩৫৯ দশমিক ৪৩ পয়েন্ট তথা ৬ দশমিক ৪২ শতাংশ পতনের শিকার হয়। রোববার ৫ হাজার ৬০০ দশমিক ২৭ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি বৃহস্পতিবার দিনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ২৪০ দশমিক ৮৪ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি ঘটে যথাক্রমে ১৫৭ দশমিক ৯৫ তথা ৭ দশমিক ২৮ শতাংশ ও ৬৭ দশমিক ৪৭ পয়েন্ট তথা ৬ দশমিক ০৪ শতাংশ। ২০২২ সালের পর ডিএসইর সবগুলো সূচকের এক সপ্তাহে এ ধরনের পতন আর ঘটেনি। ওই সময় রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবেই এ ধরনের পতনের মুখে পড়েছিল পুঁজিবাজার। বছরেরও বেশি সময় জুড়ে এ যুদ্ধের প্রভাব ছিল পুঁজিবাজারে।

প্রসঙ্গত, গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ও নতুন গণতান্ত্রিক সরকার গঠনকে সামনে রেখে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের পুঁজিবাজার ইতিবাচক ধারায় ফেরা শুরু করেছিল। এরই অংশ হিসাবে গত ক’মাসে ডিএসই সূচকের উন্নতি ঘটে প্রায় হাজার পয়েন্ট। এর সুফল কমবেশি ঘরেও তুলেছেন বিনিয়োগকারীরা। নতুন সরকার গঠনের পর যখন বাজার আরো ভালো অবস্থানের দিকে যাচ্ছিল তখনই শুরু হলো যুদ্ধ। আর এ মুহূর্তে বিনিয়োগকারীদের মূল লক্ষ্য ছিল কিছু দিন থেকে পুঁজিবাজার থেকে অর্জিত মুনাফাকে ঝুঁকিমুক্ত রাখা। তাই যুদ্ধের শুরু থেকেই প্রতিনিয়তই বিক্রয়চাপে অস্থির ছিল বাজার। এটা এ কারণে ঘটেছিল যাতে যে যত কম লোকসান দিয়ে নিজের পুঁজিকে নিরাপদ রাখা যায়। এ কারণেই চলছিল কার আগে কে শেয়ার বিক্রি করতে পারে তার প্রতিযোগিতা। আর এভাবেই বাজারে সূচক যেমন পড়েছে তেমনি বাজার হারিয়েছে মূলধন।

সূচকের বড় ধরনের অবনতির কারণে গত সপ্তাহে ডিএসইর লেনদেনেও বড় ধরনের অবনতি ঘটে। এ সময় পুঁজিবাজারটি মোট তিন হাজার ৪৮২ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয়, যা আগের সপ্তাহ অপেক্ষা ৩ দমমিক ৯১ শতাংশ কম। আগের সপ্তাহে ডিএসইর মোট লেনদেন ছিল তিন হাজার ৬২৪ কোটি টাকা। একই হারে হ্রাস পেয়েছে বাজারটির গড় লেনদেনও। গত সপ্তাহে বাজারটির গড় লেনদেন দাঁড়ায় ৬৯৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, যা আগের সপ্তাহে ছিল ৭২৪ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।

গত সপ্তাহে ডিএসইর সূচক পতনে ব্যাংকিং খাতের বড় ভূমিকা ছিল। কারণ দীর্ঘ স্থবিরতা কাটিয়ে গত কিছু দিন থেকে ব্যাংকিং খাতে ব্যাপক মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। ফলে এ খাতের বিক্রয়চাপ ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি। আবার একইভাবে বড় মূলধনের কোম্পানি গ্রামীণ ফোন ও রবি অজিয়াটার মতো টেলিযোগাযোগ খাতের বহুজাতিক কোম্পানিগুলোরও ভূমিকা ছিল চোখে পড়ার মতো। এ ছাড়া ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বীমা খাতের দরপতনও এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। সপ্তাহান্তে ডিএসইতে লেনদেন হওয়া কোম্পানি ও ফান্ডের প্রায় ৯০ শতাংশই ছিল দরপতনের শিকার।

গত সপ্তাহে ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষে ছিল ওরিয়ন ইনফিউশন। গড়ে প্রতি দিন ৪১ কোটি ৬৬ লাখ টাকার শেয়ার হাতবদল হয়েছে কোম্পানিটির, যা ছিল ডিএসইর মোট লেনদেনের ৫ দশমিক ৯৮ শতাংশ। প্রতি দিন গড়ে ৪০ কোটি টাকার শেয়ার বেচাকেনা করে এ তালিকায় দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল ব্যাংকিং খাতের সিটি ব্যাংক। বাজারটির মোট লেনদেনের ৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ দখলে ছিল ব্যাংকটির। আর এভাবে সপ্তাহের লেনদেনের ১ শতাংশের বেশি দখলে রাখে এ দু’টি কোম্পানি। ডিএসইর সাপ্তাহিক লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, ব্র্যাক ব্যাংক, সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, ব্যাংক এশিয়া, বেক্সিমকো ফার্মা, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ ও ইস্টার্ন ব্যাংক লি.।

বিদায়ী সপ্তাহে ডিএসইতে মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষে ছিল বেশির ভাগ ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কোম্পানি। এ তালিকার প্রথমেই ছিল প্রিমিয়ার লিজিং। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছির ৪৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ। ৪১ দশমিক ১৮ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল ফার ইস্ট ফিন্যান্স। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে এফএএস ফিন্যান্স, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স, ফ্যামিলিটেক্স, তুং হাই নিটিং, নুরানি ডাইং, জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশন্স ও অ্যাপোলো ইস্পাত।

সপ্তাহটিতে ডিএসইর দরপতনের শীর্ষে ছিল রহিমা ফুড করপোরেশন। এ সময় ২৩ দশমিক ৯০ শতাংশ দর হারায় কোম্পানিটি। ১৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ দর হারিয়ে জীবন বীমা কোম্পানি প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স ছিল এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি। ডিএসইর দরপতনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে সোনারগাঁও টেক্সটাইলস, উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি, সায়হাম টেক্সটাইলস, বিডি ওয়েল্ডিং ইলেক্ট্রোড, আজিজ পাইপ, ওয়াটা কেমিক্যালস ও এপেক্স স্পিনিং।