নিজস্ব প্রতিবেদক
চোখের সামনেই গুলিবিদ্ধ হয়ে কাতরাচ্ছিলেন স্বজন। রক্তে ভেজা দেহটি বাঁচানোর শেষ আকুতি নিয়ে ছোটেন হাসপাতালের এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে। কিন্তু যে চিকিৎসালয় জীবনের আশ্বাস দেয়ার কথা, শামীম ওসমানের চোখরাঙানিতে সেখানে মেলে শুধুই অবহেলা ও দুয়ার বন্ধের নিষ্ঠুরতা। বিনা চিকিৎসায় একপর্যায়ে নিভে যায় একটি তাজা প্রাণ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সেই বিভীষিকাময় রক্তঝরা দিনের করুণ বাস্তবতার কথা বলতে গিয়ে এভাবেই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে স্মৃতির ঝাঁপি খুলে বসেন সাক্ষী এনআরবি মামুন।
গতকাল মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর সদস্য বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে এ জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে নারায়ণগঞ্জে ১০ জনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে হাজির হন ৪১ বছর বয়সী ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস ব্যবসায়ী ও যুবদল নেতা এনআরবি মামুন।
জবানবন্দীতে সাক্ষী জানান, ২০২৪ সালের ১২ জুলাই থেকে কোটাবিরোধী আন্দোলনে সংহতি জানান তারা। ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদ শহীদ হওয়ার পর নারায়ণগঞ্জে প্রতিবাদ তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯ জুলাই বিকেলে নারায়ণগঞ্জ লিংকরোডের জালকুড়ি এলাকায় অবস্থানকালে স্থানীয় সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান ও ভাতিজা আজমেরী ওসমানের নেতৃত্বে প্রায় একশত সশস্ত্র আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী অতর্কিত হামলা চালায়। এতে পাশে থাকা সহযোদ্ধা আদিল ও ইয়াসিন ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান এবং তিনি নিজেও গুলিবিদ্ধ হন।
প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ২১ জুলাই পুনর্গঠিত আন্দোলনে যোগ দেন বলে উল্লেখ করেন সাক্ষী। তিনি বলেন, সাইনবোর্ড থেকে চিটাগং রোডের দিকে যাওয়ার পথে মা হাসপাতালের সামনে শামীম ওসমান ও তার সহযোগী শাহ নিজাম, ফাইজুল ইসলাম, কমিশনার রুহুলসহ প্রায় ১৫০ জন সশস্ত্র ব্যক্তি তাদের ওপর হামলা চালায়। আক্রমণ থেকে বাঁচতে ডিএনডি খালে লাফিয়ে পড়লে তার মাড়ির দাঁত ভেঙে যায়।
ঘটনার শেষ অঙ্ক হিসেবে ৫ আগস্টের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে সাক্ষী মামুন বলেন, ৫ আগস্ট বেলা দেড়টায় চাষাড়া মোড়ে শামীম ওসমান, অয়ন ওসমান, আজমেরী ওসমান, ছাত্রলীগ নেতা টিপু সুলতান, রিয়াদ, শুভ, শুভ্র, সাংবাদিক রাজুসহ ১৫০ জনের একটি সশস্ত্র দল ধাওয়া দিলে তারা ল্যাবএইড হাসপাতালের গলিতে আশ্রয় নেন। ঠিক তখন তার চোখের সামনে অয়ন ওসমানের গুলিতে ‘স্বজন’ নামের এক তরুণ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
সঙ্কটাপন্ন অবস্থায় স্বজনকে উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলেও কোনো চিকিৎসা পাওয়া যায়নি বলে ট্রাইব্যুনালকে জানান সাক্ষী। তিনি অভিযোগ করেন, আন্দোলনকারীদের চিকিৎসা না দিতে শামীম ওসমানের পূর্ব নির্দেশনা থাকায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ চিকিৎসায় অপারগতা প্রকাশ করে। পরবর্তীতে ৬ আগস্ট বিজয় উদযাপনের আনন্দের মাঝেই স্বজনের মৃত্যুর খবর পান তারা।
স্বজনসহ নারায়ণগঞ্জের প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের সর্বোচ্চ বিচার দাবি করেন সাক্ষী এনআরবি মামুন। জবানবন্দী প্রদান শেষে তাকে জেরা করেন স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী আমির হোসেন, আলী হায়দার ও মুসতাভী হাসান রাতুল।
মামলাটিতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার পালোয়ান, সহিদুল ইসলাম সরদার ও আবদুল্লাহ আল নোমান। মামলায় সব আসামিই পলাতক রয়েছেন। শামীম ওসমান ছাড়া অন্যরা হলেন শামীম ওসমানের ছেলে ইমতিনান ওসমান অয়ন, ভাতিজা আজমেরী ওসমান, অয়নের শ্যালক মিনহাজ উদ্দিন আহমেদ ভিকি, নারায়ণগঞ্জ রাইফেলস ক্লাবের সাবেক সভাপতি তানভীর আহমেদ টিটু, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ডিবিসির নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি রাজু আহমেদ, ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আব্দুল করিম বাবু, ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর কামরুল হাসান মুন্না, নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজাম উদ্দিন আহমেদ, যুবলীগ নেতা শাহাদাত হোসেন সাজনু, ছাত্রলীগ নেতা হাবিবুর রহমান রিয়াদ ও সোহানুর রহমান শুভ্র।



