স্থানীয় সরকারের সর্বত্র দলীয় প্রশাসকদের কর্তৃত্ব

রাজনৈতিক প্রভাবে প্রান্তিক জনগণ সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত

অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় দলীয় প্রশাসকদের একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে প্রান্তিক জনগণ সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সরকারি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষিঋণ, টিসিবি বা ত্রাণসুবিধা বিতরণে চরম পক্ষপতীত্বের অভিযোগ উঠছে, সেখানে প্রকৃত অভাবীদের বদলে দলীয় নেতাকর্মীরাই বেশি লাভবান হচ্ছেন। এমনকি দলীয় সম্পদশালীরাও এই সুবিধা নিচ্ছেন। স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় দায়িত্ব বণ্টন করায় তৃণমূলের সাধারণ মানুষ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
Printed Edition

নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন বিএনপি তাদের দলের ৩১ দফার নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছে, ‘স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে জনগণের সরাসরি ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সরকারে জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করা হবে। এসব প্রতিষ্ঠানকে এমনভাবে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে, যেন তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন পরিষেবা প্রদান ও উন্নয়ন কার্যক্রমে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন ও অন্য কোনো জনপ্রতিনিধির খবরদারিমুক্ত স্বাধীন স্থানীয় সরকার নিশ্চিত করা হইবে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাস্তবতা হলো স্থানীয় সরকারব্যবস্থা নিয়ে সরকারের পদক্ষেপ সেই ইশতেহারকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। আইনের দৃষ্টিতে এই প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু গণতান্ত্রিক সরকার দ্বারা নতুন বাস্তবতায় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ একটি ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, এটি কি কেবল প্রশাসনিক শূন্যতা পূরণের প্রচেষ্টা, নাকি এর পেছনে আরো গভীর রাজনৈতিক অর্থনীতি কাজ করছে?

অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় দলীয় প্রশাসকদের একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে প্রান্তিক জনগণ সরকারি সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সরকারি ফ্যামিলি কার্ড, কৃষিঋণ, টিসিবি বা ত্রাণসুবিধা বিতরণে চরম পক্ষপতীত্বের অভিযোগ উঠছে, সেখানে প্রকৃত অভাবীদের বদলে দলীয় নেতাকর্মীরাই বেশি লাভবান হচ্ছেন। এমনকি দলীয় সম্পদশালীরাও এই সুবিধা নিচ্ছেন। স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকায় এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় দায়িত্ব বণ্টন করায় তৃণমূলের সাধারণ মানুষ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রত্যন্ত অঞ্চলের হতদরিদ্র, বিধবা ও নি¤œবিত্ত নারী, যারা প্রকৃতপক্ষে এই কার্ডগুলোর মূল দাবিদার, তারা সঠিক তদারকির অভাবে এবং রাজনৈতিক প্রভাব না থাকায় তালিকা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছেন। মাঠপর্যায়ে নিরপেক্ষ ও পেশাদার কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ডেটাবেজ বা তথ্য যাচাই না করে স্থানীয় রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে পাঠানো তালিকা ব্যবহার করায় এই অনিয়ম আরো বাড়ছে।

সূত্র মতে, বাংলাদেশের সংবিধানে স্থানীয় সরকার ধারণাকে ‘স্থানীয় শাসন’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সংবিধানের চতুর্থ ভাগের তৃতীয় পরিচ্ছদে স্থানীয় শাসন শিরোনামে ৫৯(১) ধারায় বলা হয়েছে ‘আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক এককাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা।’ রাষ্ট্রের বিদ্যমান ব্যবস্থা অনুযায়ী স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে পরিচালিত করা হচ্ছে, যা প্রশাসনিক একাংশ তো দূরের কথা জনপ্রতিনিধিত্বশীলও হতে পারছে না। অন্তর্বর্তী অবস্থা বা সাময়িক বিচ্যুতি বাদ দিলে দেশ চলে সংসদীয় ব্যবস্থায়। অথচ স্থানীয় সরকারগুলো অনেকাংশে রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থার মতো।

সূত্র মতে, দেশের রাজনৈতিক দল বা নীতি নির্ধারণী মহল সকলেই স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করার কথা বলে। অথচ নানা বিধি বা প্রজ্ঞাপন বা ক্ষমতার দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অকার্যকর করে রাখা হয়। দেশের বিভিন্ন জায়গায় কিছু প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর ও সক্রিয় দেখানোর চেষ্টা থাকলেও বেশিরভাগ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক দলের প্রতীক দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন পদ্ধতি চালু করে স্থানীয় সরকারগুলোকে দলীয়করণ করা হয়েছে। যেখানে সাধারণ মানুষের সেবাপ্রাপ্তির চেয়ে দলীয় কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে নষ্ট হয়েছে স্থানীয় সম্প্রীতির বন্ধনও। এখন প্রতীক দ্বারা নির্বাচিতরা না থাকলেও অনির্বাচিত দলীয় লোকজনই স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি।

২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর প্রথমে অন্তর্বর্তী এবং এখন নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব পালন করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিভিন্ন সংস্কার কমিশনের মতো স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনও করা হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক স্থানীয় সরকারে দায়িত্ব পালনকারী কোনো জনপ্রতিনিধিকে সংস্কার কমিশনে রাখা হয়নি। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর নির্বাচনের পরিবর্তে দলীয় লোকদের দিয়ে স্থানীয় প্রশাসন পরিচালনা করা হচ্ছে। যদিও অক্টোবর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ার কথা বলছে সরকার। এরই মধ্যে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের যে সমস্ত প্রতিনিধি ছিল তাদের জায়গায় এখন বিএনপি দলীয়রা নেতৃত্ব দিচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থা এক অনিশ্চিত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছিল। এই প্রেক্ষাপটে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন একধরনের স্বস্তি ও রাজনৈতিক স্থিতি এনে দেয়। একটি তুলনামূলকভাবে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। নাগরিকদের প্রত্যাশা ছিল, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠিত হবে, জবাবদিহি বাড়বে এবং ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন কমবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো স্থানীয় সরকারব্যবস্থা নিয়ে সরকারের সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ সেই প্রত্যাশাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। সিটি করপোরেশন এবং বেশির ভাগ জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত তারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। গণতান্ত্রিক সরকার দ্বারা নতুন বাস্তবতায় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ একটি ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, এটি কি কেবল প্রশাসনিক শূন্যতা পূরণের প্রচেষ্টা নাকি এর পেছনে আরো গভীর রাজনৈতিক অর্থনীতি কাজ করছে?

স্থানীয় সরকার বিশ্লেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহারের প্রবণতা নতুন নয়। বর্তমান উদ্যোগ সেই ধারাবাহিকতারই একটি নতুন সংস্করণ কিনা তা নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে সংশয় সৃষ্টি হওয়াটা স্বাভাবিক। এর ফলে দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রের ওপর নাগরিকদের আস্থা আরো ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে।

নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এদের একটি বড় অংশ সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে পরাজিত হয়েছেন অথবা মনোনয়ন প্রত্যাশা করেও বঞ্চিত হয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা এই নিয়োগকে একটি ‘রাজনৈতিক ক্ষতিপূরণ’ অথবা ‘রাজনৈতিক পুনর্বাসন’ হিসেবে উল্লেখ করে বলছেন, এটি দলীয় নেতাদের সন্তুষ্ট রাখার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে তাদের প্রভাব ধরে রাখার একটি কৌশল হতে পারে। তারা বলছেন, প্রশাসক হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা স্থানীয় প্রশাসন, উন্নয়ন প্রকল্প এবং সম্পদ বণ্টনের ওপর সরাসরি প্রভাব রাখার কারণে এতে শুধু তাদেরই রাজনৈতিক ভিত্তি সুসংহত হবে, জনগণের কোনো কল্যাণ হবে না।

এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন এমপি নয়া দিগন্তকে বলেন, বিএনপি বহুদলীয় গণতন্ত্রের ক্রেডিট নিতে চায় কিন্তু স্থানীয় সরকারে দলীয় প্রতিনিধি বসানোর মধ্য দিয়ে তারা বহুদলীয় গণতন্ত্র থেকে সরে গিয়ে একদলীয় শাসনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। দেশের সব জায়গার প্রশাসক বিএনপির পদধারীরা। যে নিয়মকানুনের মধ্য দিয়ে হাসিনা দেশটা পরিচালনা করত, সেই নিয়মকানুন এখনো বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে।

সর্বত্র দলীয়করণের বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা দলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এর প্রতিবাদ জানিয়েছি। স্থানীয় সরকারে দলীয় প্রশাসক নিয়োগকে ইতিবাচকভাবে দেখার সুযোগ নেই। আমরা মনে করি সরকারের এমন পদক্ষেপ স্থানীয় সরকার নির্বাচন পিছিয়ে দেয়ার গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ এবং একই সাথে আরেকটি পাতানো নির্বাচনের প্রাথমিক ধাপ। তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী প্রশাসনের সর্বস্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকবেন। কিন্তু প্রশাসক নির্বাচিত প্রতিনিধি নন। নির্বাচিত সরকার কেন অনির্বাচিত সরকারের মতো আচরণ করছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার নয়া দিগন্তকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দ্রুত সম্পন্ন এবং সার্বিক সংস্কার কার্যকর করতে হলে একটি যুগোপযোগী আইনি কাঠামো প্রয়োজন। সাংবিধানিক নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে জনগণের অংশগ্রহণে পরিকল্পনা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা উচিত। তিনি বলেন, বর্তমানে স্থানীয় সরকার আমলাতন্ত্রনির্ভর কেন্দ্রীয় সরকারের একটি বর্ধিত অংশে পরিণত হয়েছে। এই অবস্থার পরিবর্তন জরুরি। তিনি বলেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে আমাদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালনার ব্যাপারে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা এবং উচ্চ আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। তথাপি নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর অধিকাংশ ক্ষেত্রে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। দলীয় নেতাদের পুনর্বাসনের এ সিদ্ধান্ত সংবিধান ও আদালতের নির্দেশের সম্পূর্ণ পরিপন্থী বিষয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে দেশে স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি বলতে কিছু নেই। সর্বত্র প্রশাসক ও সমন্বয়কদের কর্তৃত্ব ও খবরদারি। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছাড়া দায়বদ্ধ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান পরিচালনা সম্ভব নয়। প্রকৃত অর্থে জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছতে হলে স্বশাসিত, কার্যকর, গতিশীল স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই। এজন্য প্রয়োজনে স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের অবশ্যই জনগণ দ্বারা নির্বাচিত হতে হবে। তারা আরো বলেছেন, একসময় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ অংশ নিতেন। মানুষ স্থানীয় আবেগ ও স্থানীয় প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে তার প্রতিনিধি নির্বাচিত করতেন। এখন মনোনয়ন বাণিজ্য, কালোটাকা ও পেশিশক্তির দাপটে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ মানুষজন নির্বাচনের চিন্তাও মাথায় আনেন না।