দেশের গণ্ডি পেরিয়ে নরসিংদীর লটকন বিদেশে

Printed Edition
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে নরসিংদীর লটকন বিদেশে
দেশের গণ্ডি পেরিয়ে নরসিংদীর লটকন বিদেশে

আমজাদ হোসেন বেলাব (নরসিংদী)

এক সময়ের জংলি ফল হিসেবে পরিচিত টক-মিষ্টি স্বাদের লটকন এখন নরসিংদী জেলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ফলটি স্থানীয় কৃষকদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। এনেছে পারিবারিক স্বচ্ছলতা। লাভজনক হওয়ায় প্রতি বছরই জেলায় বাণিজ্যিকভাবে লটকনের আবাদ ও নতুন নতুন বাগানের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

লটকনের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো- এর কোনো দৃশ্যমান ফুল বা পাপড়ি ঝরে না। সরাসরি গাছের কাণ্ড ও শাখা-প্রশাখা থেকে ছড়ায় ছড়ায় এই ফল বের হয়। স্থানীয়ভাবে এটি ‘বুগি’ নামেও পরিচিত। পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, লটকনে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘বি-টু’, ভিটামিন ‘সি’, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও লৌহসহ বিভিন্ন খনিজ উপাদান রয়েছে। মানবদেহের দৈনিক ভিটামিন ‘সি’র চাহিদার বেশিরভাগই মাত্র তিন-চারটি লটকন মেটাতে সক্ষম।

নরসিংদী জেলা কৃষি বিভাগ জানায়, জেলার শিবপুর, বেলাব, রায়পুরা ও মনোহরদী উপজেলার লাল রঙের উচুঁ মাটিতে প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়াম ও খনিজ উপাদান থাকায় এখানকার মাটি ও আবহাওয়া লটকন চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। চলতি মৌসুমে জেলায় মোট এক হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে লটকনের বাগান করা হয়েছে। প্রতি হেক্টরে ১৫ মেট্রিক টন হিসেবে মোট ৩০ হাজার মেট্রিক টন লটকনের ফলন পাওয়ার আশা করছে কৃষি বিভাগ। পাইকারি বাজারদর অনুযায়ী যার মোট বিক্রয়মূল্য প্রায় ২৪০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। জেলার শিবপুর উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নকে ‘লটকনের রাজা’ বলা হয়। কারণ এখানকার সমতল ও পাহাড়ি সব ধরনের জমিতেই লটকনের ব্যাপক আবাদ হয়।

স্থানীয় চাষিরা জানান, প্রায় ৩০ বছর আগে বেলাব উপজেলার লাখপুর গ্রামে মৃত হাছেন আলী ভূঁইয়া প্রথম এই ফলের চাষ শুরু করেন। এরপর থেকে বেলাব ও শিবপুরের লালমাটি এলাকায় এর ব্যাপক প্রসার ঘটে। লটকন চাষে জটিলতা ও খরচ দুই-ই কম। বেলে ও দো-আঁশ মাটিতে স্ত্রী গাছ রোপণের তিন বছরের মধ্যে ফলন আসে এবং তা টানা ২০ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত ফল দিয়ে থাকে। ফল সংগ্রহের ৬০ দিন আগে গাছপ্রতি ৫০ গ্রাম পটাশ পানির সাথে মিশিয়ে গোড়ায় দিলে ফলের মিষ্টতা ও আকার বৃদ্ধি পায়।

লটকনের বাজারজাতকরণ পদ্ধতিও বেশ চমৎকার। সাধারণত কাঁচা থাকা অবস্থাতেই মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বাগান মালিকদের কাছ থেকে পাইকারি দরে পুরো বাগান কিনে নেন। বর্তমানে বাজারে মানভেদে প্রতি মণ লটকন তিন হাজার থেকে তিন হাজার ৫০০ টাকা পাইকারি দরে বিক্রি হচ্ছে। যা খুচরা বাজারে প্রতি কেজি ১০০ থেকে ১২০ টাকা। নরসিংদীর লটকন খেতে সুস্বাদু হওয়ায় ২০০৮ সাল থেকে দেশের চাহিদা মিটিয়ে এটি ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকাররা এসে এখান থেকে লটকন কিনে ট্রাকযোগে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করছেন।

পাহাড় উজিলাব গ্রামের চাষি ইঞ্জিনিয়ার বাচ্চু মিয়া জানান, ৬০ বিঘা জমির বাগান থেকে ইতোমধ্যে তিনি ৪৯ লাখ টাকার লটকন বিক্রি করেছেন। লাখপুর গ্রামের নুরুল হাসান ভূঁইয়ার ৩০ বিঘা এবং শিবপুরের আ: সালাম মাস্টারের ১০ বিঘা জমির বাগান থেকে এবার লাখ লাখ টাকার লটকন বিক্রি হয়েছে। মরজাল বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিন জানান, এই অঞ্চলের লটকন মানসম্মত হওয়ায় ঢাকা হয়ে তা সরাসরি আন্তর্জাতিক বাজারেও পাঠানো হচ্ছে।